এখন সময় | রাজনৈতিক প্রতিবেদন
প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবার ২০২৬ , ১০:৪৯ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে জামায়াতের চিঠির পরও নিষ্পত্তি নেই। সংসদীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ ঘিরেও বিতর্ক। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা নাকি রাজনৈতিক সমীকরণ?
৮ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অবস্থান নিয়ে এমন এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত, সংসদীয় দায়িত্ব, ফৌজদারি অভিযোগ এবং সাংবিধানিক বিধান পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। দলটি জাতীয় সংসদের স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানিয়ে তাঁর সংসদ সদস্যপদ শূন্য ঘোষণার ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছে।
কিন্তু প্রায় আড়াই মাস পরও তাঁর সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি দলের পক্ষ থেকে তাঁকে একটি সংসদীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিরোধী দলের আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তাব সংশোধন করা হয়।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়, গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত তাঁকে রিমান্ডেও পাঠিয়েছেন। সর্বশেষ প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, জামিন না পাওয়ায় তিনি কারাগারে রয়েছেন।
ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু একজন সংসদ সদস্যকে তাঁর দল বহিষ্কার করেছে কি না, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কৃত এবং গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগে বিচারাধীন একজন সংসদ সদস্যের অবস্থান নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকার আইনগত সুযোগ থাকলেও তাঁকে নতুন সংসদীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগের পেছনে কী বিবেচনা কাজ করেছিল?
জামায়াতের সিদ্ধান্ত এবং সংসদের অবস্থান
গত ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে দলীয়ভাবে তদন্ত করা হয়।
জামায়াতের দাবি, তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্বাক্ষরিত চিঠিতে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। ২৩ জুলাই জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে পৃথক চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে দলটি সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বিধান উল্লেখ করে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ শূন্য ঘোষণার ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জামায়াত কেবল তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেই থেমে থাকেনি। সংসদ সদস্যপদ নিয়েও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত চেয়েছে।
কিন্তু সাংবিধানিক প্রশ্নটি এত সরল নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের দল থেকে পদত্যাগ এবং সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার পরিণতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
কোনো রাজনৈতিক দল তার সদস্যকে বহিষ্কার করলে সেই বহিষ্কার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্যপদ বাতিল করে কি না, সেটি পৃথক সাংবিধানিক ব্যাখ্যার বিষয়। অতীতে এ ধরনের বিরোধ দেখা দিয়েছে। ফলে দলীয় সিদ্ধান্তকে সরাসরি সংসদ সদস্যপদ বাতিলের সমতুল্য মনে করার সুযোগ নেই। কিন্তু সাংবিধানিক জটিলতা থাকার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিষয়টি অনির্দিষ্টকাল অনিষ্পন্ন রেখে দিতে পারে।
সংসদীয় কমিটিতে রাখার উদ্যোগ কেন?
গাজী নজরুলকে নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনাটি ঘটে ৭ সেপ্টেম্বর। সেদিন জাতীয় সংসদে সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাবে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান আপত্তি জানিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যে ব্যক্তিকে জামায়াতে ইসলামী দল থেকে বহিষ্কার করেছে, তাঁকে কোন বিবেচনায় সংসদীয় কমিটিতে রাখা হচ্ছে?
সংসদে এ নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যুক্তি দেন, দল থেকে বহিষ্কার করলেই একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না।
শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের আপত্তির পর গাজী নজরুলের নাম বাদ দিয়ে কমিটি গঠন করা হয়।
এই ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তাঁকে নতুন কমিটিতে স্থায়ীভাবে বহাল রাখা হয়নি। কিন্তু তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করার সরকারি প্রস্তাবটি বাস্তব ঘটনা। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, সরকারপক্ষ যখন তাঁর দলীয় বহিষ্কারের বিষয়টি জানত, তখন নতুন সংসদীয় দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়েছিল? এটি কি কেবল তাঁর সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকার কারণে? নাকি সংসদীয় কমিটি গঠনের সময় তাঁর দলীয় অবস্থানের পরিবর্তন যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
একটি পুরোনো কমিটিতেও সদস্য, কিন্তু বৈঠকে ডাক নেই
বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। গাজী নজরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু ১৮ আগস্ট ওই কমিটির বৈঠকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কমিটির সভাপতি বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল ইসলাম চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, জামায়াত না চাওয়ায় তাঁকে বৈঠকে ডাকা হয়নি।
এখানে সংসদীয় কার্যক্রমের একটি অসংগতি সামনে আসে। একদিকে একজন সংসদ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন। অন্যদিকে তাঁর সাবেক রাজনৈতিক দলের আপত্তির কারণে তাঁকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না। আবার কয়েক সপ্তাহ পর অন্য একটি কমিটিতে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এই দুই ঘটনার মধ্যে সংসদীয় নীতির সামঞ্জস্য কোথায়?
সংসদীয় কমিটির সদস্যপদ কি নির্বাচিত সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সাংবিধানিক অবস্থানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, নাকি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে?
প্রশ্নটি কেবল গাজী নজরুলের জন্য নয়, ভবিষ্যতের সংসদীয় কার্যক্রমের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন মাত্রা, দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যু ও ফৌজদারি মামলা
গাজী নজরুলকে ঘিরে বিতর্ক নতুন পর্যায়ে পৌঁছায় তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায়। মরিয়মের মৃত্যুর পর আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়। মামলায় গাজী নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমও মামলায় জড়িয়ে পড়েন।
২১ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি আদালত গাজী নজরুলকে চার দিনের এবং তাঁর প্রথম স্ত্রীকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জ ুর করেন। সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজী নজরুল জামিন না পাওয়ায় কারাগারে রয়েছেন।
তবে এখানে একটি মৌলিক আইনি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হওয়া, গ্রেপ্তার হওয়া কিংবা কারাগারে থাকা মানেই তিনি অপরাধী প্রমাণিত হয়েছেন, এমন নয়। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। একইভাবে কোনো ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার কারণে সংসদ সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট ধরনের অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পর সংসদ সদস্যপদের অযোগ্যতা সৃষ্টি হওয়ার বিধান রয়েছে।
অতএব দলীয় বহিষ্কার, ফৌজদারি অভিযোগ এবং সাংবিধানিক অযোগ্যতা, এই তিনটি বিষয়কে আলাদাভাবে বিচার করতে হবে।
স্পিকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় নির্বাচন কমিশন
২১ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, গাজী নজরুলের বিষয়ে স্পিকারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়া যায়নি।
জামায়াতে ইসলামী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে কমিশনে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদ সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছাড়া কমিশন নিজ উদ্যোগে তাঁর সংসদ সদস্যপদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, সংসদ সচিবালয় বিষয়টি নিয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে? স্পিকারের কাছে জামায়াতের আবেদন কী অবস্থায় রয়েছে? সংবিধানের ৬৬ ও ৭০ অনুচ্ছেদের আলোকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিরোধ নির্ধারণ করা হয়েছে কি? এবং প্রয়োজন হলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কি? এসব প্রশ্নের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক উত্তর প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, নাকি সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা?
গাজী নজরুলকে ঘিরে সরকারি দলের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রশ্ন উঠলেও এর পেছনে কোনো গোপন সমঝোতা বা বিশেষ রাজনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে, এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকটি ঘটনা একসঙ্গে বিবেচনা করলে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রথমত, বিরোধী দলের নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যকে তাঁর নিজের দল বহিষ্কার করেছে।
দ্বিতীয়ত, দলটি তাঁর সংসদ সদস্যপদ বাতিলের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে।
তৃতীয়ত, সেই আবেদন নিষ্পত্তির আগেই সরকারি দলের পক্ষ থেকে তাঁকে নতুন সংসদীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চতুর্থত, বিরোধী দলের আপত্তিতে সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পঞ্চমত, তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
তবে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য সরকারি দলের সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য এবং সংসদীয় নথি পর্যালোচনা অপরিহার্য।
অতীতের নজির কী বলছে?
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে দল থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্যের পদ বহাল থাকার নজির রয়েছে। বিএনপি থেকে নির্বাচিত আবু হেনাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তাঁর সংসদ সদস্যপদ বহাল ছিল।
জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এইচ এম গোলাম রেজার ক্ষেত্রেও দলীয় বহিষ্কার এবং সংসদ সদস্যপদ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছিল।
আবার আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্যপদের বিষয়টি নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত গড়িয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই পদত্যাগ করেন।
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দলীয় বহিষ্কার এবং সংসদ সদস্যপদ বাতিলের মধ্যে সাংবিধানিক ও প্রক্রিয়াগত পার্থক্য রয়েছে। তবে প্রতিটি ঘটনার আইনগত পরিস্থিতি অভিন্ন নয়। ফলে অতীতের নজির বিবেচনা করলেও বর্তমান বিরোধের নিষ্পত্তি প্রযোজ্য সাংবিধানিক বিধানের ভিত্তিতেই করতে হবে।
জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন
গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁকে ভোট দিয়েছেন একটি নির্বাচনী এলাকার মানুষ। নির্বাচনে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ছিল জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। এখন সেই দল তাঁকে বহিষ্কার করেছে। কিন্তু সংসদ সদস্যপদ বহাল রয়েছে। এই অবস্থায় নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
(১) তাঁর দলীয় পরিচয় সংসদীয় নথিতে কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে? (২) তিনি কি দলনিরপেক্ষ সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন? (৩) তাঁর সংসদীয় কমিটির সদস্যপদ এবং দায়িত্ব পালনের বর্তমান অবস্থা কী? (৪) কারাগারে থাকার কারণে তাঁর নির্বাচনী এলাকার সংসদীয় কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।
গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনাটি বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। একটি রাজনৈতিক দল তার নির্বাচিত প্রতিনিধিকে বহিষ্কার করতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক পরিণতি নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের।
আবার একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে তাঁকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না। এই দুই নীতির কোনোটিই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে আইনের শাসনের অর্থ কেবল কোনো পদ বহাল রাখা বা বাতিল করা নয়। আইনের শাসনের অন্যতম শর্ত হলো, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত এবং জবাবদিহিমূলক হওয়া।
গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকার আইনগত ভিত্তি থাকতে পারে। কিন্তু তাঁকে নতুন সংসদীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যুক্তি কী ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে তাঁর সংসদ সদস্যপদ নিয়ে জামায়াতের আনুষ্ঠানিক আবেদনের নিষ্পত্তি কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। গাজী নজরুলের ঘটনায় তাই শেষ পর্যন্ত একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সংসদীয় জবাবদিহি, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন।