কাজী শামসুল হক

প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ , ০৬:৩০ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

আত্মার জাগরণ আর শিক্ষার প্রাধান্য

রাত্রি মানুষের জীবনে কেবল বিশ্রামের সময় নয়। কুরআনের দৃষ্টিতে এটি আত্মার জাগরণের সময়। সূরা আয্‌-যুমারের আল্লাহ এক অনন্য দৃশ্য এঁকেছেন “اَمَّنۡ هُوَ قَانِتٌ اٰنَآءَ الَّيۡلِ…”। এখানে প্রশ্নের ভঙ্গি ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু এটি প্রকৃত প্রশ্ন নয়, এটি একটি নৈতিক তুলনা, একটি আধ্যাত্মিক মাপকাঠি। অর্থাৎ, মানুষকে তার নিজের ভেতরে দাঁড় করিয়ে বিচার করানো, সে কেমন মানুষ হতে চায়?

'কানিত' শব্দটি শুধু ইবাদতকারী বোঝায় না, এটি সেই মানুষকে বুঝায় যার অন্তর বিনীত, স্থির এবং আল্লাহর সামনে নত। আয়াতের শুরুতেই মানুষের বাহ্যিক আচরণ নয়, তার অভ্যন্তরীণ অবস্থা আলোচনায় এসেছে। সে রাতের বিভিন্ন প্রহরে দাঁড়ায়—“اٰنَآءَ الَّيۡلِ”—রাতের টুকরো টুকরো অংশে। অর্থাৎ তার ইবাদত কোনো আকস্মিক আবেগ নয় এটি ধারাবাহিকতা, অভ্যাস, আত্ম শিক্ষা। দিনের কোলাহলে মানুষ সমাজের সামনে থাকে, কিন্তু রাতের নির্জনতায় সে নিজের সামনে দাঁড়ায়। সেখানে অভিনয় নেই, দর্শক নেই, প্রশংসা নেই। ফলে এই ইবাদত আসলে আত্মার সত্যতার পরীক্ষা।

এরপর আল্লাহ তার ইবাদতের দুটি অভ্যন্তরীণ চালিকাশক্তি উল্লেখ করেছেন “يَحۡذَرُ الۡاٰخِرَةَ وَيَرۡجُوۡا رَحۡمَةَ رَبِّهٖ”। সে আখিরাতকে ভয় করে এবং রবের রহমত আশা করে। ইসলামের নৈতিক দর্শনে ভয় ও আশা এই দু’টি পরস্পরবিরোধী নয় বরং ভারসাম্য। শুধু ভয় মানুষকে হতাশ করে, শুধু আশা মানুষকে বেপরোয়া করে, কিন্তু ভয় ও আশার যুগল উপস্থিতি মানুষকে দায়িত্বশীল করে। তাই রাতের ইবাদত কেবল আচার নয়, এটি নৈতিক মনোবিজ্ঞান। মানুষ নিজের ভুল উপলব্ধি করে বলে ভয় পায়, আর আল্লাহর করুণা উপলব্ধি করে আশাবাদী থাকে। এই দুই অনুভূতির সমন্বয়েই চরিত্র গঠিত হয়।

আয়াতের পরবর্তী অংশে হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে যায়—“قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِى الَّذِيۡنَ يَعۡلَمُوۡنَ وَالَّذِيۡنَ لَا يَعۡلَمُوۡنَ”। এখানে রাতের ইবাদতকারী ব্যক্তির কথা থেকে জ্ঞানের আলোচনায় প্রবেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ কুরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃত জ্ঞান কেবল তথ্য নয়, জ্ঞান হচ্ছে চেতনা। যে মানুষ রাতের নীরবতায় দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব, পরিণতি, এবং দায়িত্ব উপলব্ধি করে সে-ই ‘জানার’ মানুষ। আর যে শুধু তথ্য সঞ্চয় করে কিন্তু তার জীবনে কোনো নৈতিক পরিবর্তন আসে না, সে প্রকৃত জ্ঞানী নয়। কুরআনের ভাষায় ‘জানা’ মানে বাস্তবতা উপলব্ধি করা, আর বাস্তবতা হচ্ছে মানুষের সীমাবদ্ধতা ও আল্লাহর অসীমতা।

এই আয়াতে জ্ঞানকে ইবাদতের ফল হিসেবে দেখানো হয়েছে। কারণ রাতের নির্জনতা মানুষের চিন্তাকে গভীর করে। দিন মানুষকে বহির্মুখী করে, রাত মানুষকে অন্তর্মুখী করে। অন্তর্মুখিতা ছাড়া জ্ঞান জন্মায় না। তাই ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে ‘ইলম’ শুধু মস্তিষ্কের নয়, হৃদয়েরও গুণ। যে আল্লাহকে স্মরণ করে না, তার জ্ঞান অনেক সময় ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে যায়; আর যে আল্লাহকে স্মরণ করে, তার জ্ঞান নৈতিকতার উৎস হয়ে ওঠে।

শেষ বাক্যে বলা হয়েছে—“اِنَّمَا يَتَذَكَّرُ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ”। ‘উলুল আলবাব’ মানে কেবল বুদ্ধিমান নয়, সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ। অর্থাৎ কুরআন জ্ঞানকে মেধার বিষয় নয়, বিবেকের বিষয় করেছে। অনেক শিক্ষিত মানুষও উপদেশ গ্রহণ করে না, কারণ তার বিবেক জাগ্রত নয়। আবার একজন সাধারণ মানুষও সত্য উপলব্ধি করতে পারে, কারণ তার হৃদয় জীবিত। এখানে কুরআন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করেছে ডিগ্রি দিয়ে নয়, অন্তরের জাগরণ দিয়ে।

এই আয়াত তাই একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ গঠনের সূত্র দিয়েছে। প্রথমে আত্মিক শুদ্ধি রাত্রির ইবাদত। তারপর নৈতিক ভারসাম্য ভয় ও আশা। এরপর বৌদ্ধিক জাগরণ: প্রকৃত জ্ঞান এবং শেষে নৈতিক পরিণতি: উপদেশ গ্রহণের ক্ষমতা। আধুনিক সভ্যতায় তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে, কিন্তু প্রজ্ঞার সংকট বেড়েছে। কারণ জ্ঞানকে তথ্য বানানো হয়েছে, কিন্তু আত্মাকে শিক্ষিত করা হয়নি। কুরআন এই সমস্যার সমাধান দিয়েছে, আত্মিক শুদ্ধি ছাড়া জ্ঞান আলোকিত হয় না।

রাত্রির নির্জনতায় দাঁড়ানো মানুষ আসলে সমাজেরও কল্যাণকারী। কারণ যে ব্যক্তি অদৃশ্য আল্লাহকে ভয় করে, সে দৃশ্যমান মানুষের ওপর অন্যায় করতে পারে না। তাই তাহাজ্জুদ কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত। মানবসভ্যতার নৈতিক শক্তি জন্ম নেয় সেই অদৃশ্য মুহূর্তগুলোতে, যখন একজন মানুষ একা দাঁড়িয়ে আল্লাহর সামনে নিজের হিসাব নেয়।

অতএব, আয়াতটি আমাদের শেখায়—মানুষের প্রকৃত পার্থক্য সম্পদ, ক্ষমতা বা পরিচয়ে নয়, পার্থক্য তার জ্ঞান ও সচেতনতায়। আর সেই জ্ঞানের সূচনা হয় রাতের নীরবতায়, যখন মানুষ প্রথমবার নিজের আত্মাকে শোনে। তখন সে বুঝতে পারে, সে কেবল পৃথিবীর নাগরিক নয়, সে আখিরাতের যাত্রী। তখনই তার জ্ঞান আলোকিত হয়, তার বিবেক জাগে, এবং তার জীবন অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।