
সাজেদুল হক : তিন দশকের পুরনো হলেও ছবিটি এখনও নতুন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কফিনের ওপর কান্নায় ভেঙে পড়া খালেদা জিয়া। পাশে পুত্র তারেক রহমান। হৃদয় এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়া সে ছবি আজও পাওয়া যাবে পুরনো সংবাদপত্রের ফাইলে। স্বামীকে হারিয়ে দু’ সন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন খালেদা। সংসার জীবনে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি বাস্তবতার অপরিহার্যতায় রাজনীতিতেও অভিষেক হয় খালেদা জিয়ার। শুরুতে দলের ভেতরেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন তিনি। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসা খালেদা সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন কঠোর অনমনীয়তায়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সাহসী ভূমিকা তার জন্য বয়ে নিয়ে আসে আপসহীন নেত্রীর খেতাব। ’৯১’র নির্বাচনে তিনি চমকে দেন সবাইকে। নিজে পাঁচটি আসনে জয়ী হওয়ার পাশাপাশি তার দল বিএনপিও জয়লাভ করে নির্বাচনে। প্রধানমন্ত্রীর আসন অলঙ্কৃত করেন বেগম জিয়া। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ’৯৬’র ভোটারবিহীন নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। তবে দিনকয়েক দায়িত্ব পালন করেই পদত্যাগে বাধ্য হন। একই বছর অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে বিরোধীদলীয় নেত্রীর আসনে বসেন খালেদা জিয়া। ২০০১’র অষ্টম সংসদ নির্বাচনে আবারও বিপুল গৌরবে জয়লাভ করে তার নেতৃত্বাধীন জোট। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন খালেদা জিয়া। তবে ২০০৬ সালে ক্ষমতা থেকে বিদায়ের পরই নতুন করে বিপর্যয় নেমে আসে তার জীবনে। ক্ষমতার শেষ দিকে রাজপথে সহিংস বিক্ষোভ মোকাবিলা করতে হয় তাকে। ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেনে ক্ষমতায় আসে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। খালেদা জিয়ার পুরো পরিবারকেই কারাগারে বন্দি করা হয়। তার আগেই গ্রেপ্তার করা হয় তার বড় ছেলে তারেক রহমানকে। পরে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় তাকেও। দুঃসহ এই সময়ে দলের বেশির ভাগ নেতা আবারও বিশ্বাসঘাতকতা করেন তার সঙ্গে। সংস্কারপন্থি সাজেন তারা। তবে প্রয়াত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে বেশির ভাগ কর্মী খালেদা জিয়ার সঙ্গেই ছিলেন। জরুরি জমানায় এক বছরের কারাজীবনে নানা দুঃসংবাদ শুনতে হয় তাকে। কারাগারে বসেই মা তৈয়বা মজুমদারের মৃত্যুর খবর পান তিনি। মা’কে শেষবার দেখার জন্য সে সময় প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়েছিল তাকে। কারাগারে থাকা অবস্থায়ই নির্মম নির্যাতনের শিকার হন তারেক রহমান। অসুস্থ হয়ে পড়েন আরাফাত রহমান কোকো। অসুস্থ কোকোকে পরে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে কয়েকদিনের ব্যবধানে মুক্তি পান খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। নির্যাতনে গুরুতর আহত তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় লন্ডন। সন্তানের বিদায়ের দিনে এক সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন খালেদা। দীর্ঘ রাজনীতির ক্যারিয়ারে সেবারই প্রথম প্রকাশ্য তাকে এভাবে কাঁদতে দেখা যায়। শুরুতে নবম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি ছিলেন না খালেদা জিয়া। পরে নানামুখী চাপে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য হন তিনি। নির্বাচনী প্রচারণায় সারাদেশ চষে বেড়ান খালেদা। তবে এতে কোন সুফল মিলেনি। নিজে পাঁচ আসনে জয়ী হলেও তার দল বিএনপি মুখোমুখি হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের। নির্বাচনের পরও ভাগ্য বিপর্যয় অব্যাহত থাকে তার। স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয় তাকে। বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার সময় তার কান্নার দৃশ্য অনেকেরই হৃদয় ছুঁয়ে যায়। খালেদা জিয়ার দু’ ছেলে সপরিবারে এখনও দেশের বাইরে। অসুস্থতা আর মামলার রাজনীতির কারণে বর্তমান মহাজোট জমানায় তাদের দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই। ঢাকায় একাকী জীবন যাপন করা খালেদা রোববার পান আরও বড় দুঃসংবাদ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে খবর আসে মারা গেছেন তার ছোট ভাই অবসরপ্রাপ্ত মেজর সাঈদ এস্কান্দার। গতকাল তার মরদেহ ঢাকায় আসে। ছোট ভাইয়ের মরদেহ দেখে নিজেকে সামলাতে পারেননি খালেদা জিয়া। তার অঝোর কান্নায় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত বিএনপির নেতা-কর্মীরাও। রাজনীতি এবং ব্যক্তিজীবনে একের পর এক দুঃসংবাদে বিপর্যস্ত খালেদা জিয়া। সামনের দিনগুলো তার জন্য কি সংবাদ নিয়ে আসে তা-ই এখন দেখার বিষয়।
ফুলেল শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় সমাহিত হলেন সাঈদ এস্কান্দার
স্টাফ রিপোর্টার জানিয়েছেন, ফুলেল শ্রদ্ধা আর নেতাকর্মীদের ভালবাসায় সমাহিত হলেন মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দার। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, ফেনী জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এ এমপিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে নয়াপল্টনে নেমেছিল নেতাকর্মীদের ঢল। দলের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের নিয়ে নয়াপল্টনে ছোট ভাইয়ের কফিনে ফুল দিয়েছেন খালেদা জিয়া। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শেষ শ্রদ্ধা জানান স্পিকার, সরকারি দল আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। সশস্ত্র লড়াইয়ে অংশ নেয়া এ মুক্তিযোদ্ধাকে সেখানে দেয়া হয় গার্ড অব অনার। সকালে মরদেহ দেশে আসার পর তিন দফা জানাজা শেষে সন্ধ্যায় বনানীর সামরিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
লাশ গ্রহণ করলেন মির্জা আলমগীর ও শামীম এস্কান্দার
গতকাল সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে সাঈদ এস্কান্দারের মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছে। এ সময় আনুষ্ঠানিকভাবে লাশ গ্রহণ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মরহুমের ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার ও বিরোধী নেতা খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব সালেহ আহমেদ। আগে থেকেই লাশ গ্রহণের জন্য বিমানবন্দরের ভিআইপি গেটে উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফজলুর রহমান পটল, মীর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন, ডা. জাহিদ হোসেন, দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ, ফেনী-২ আসনের এমপি ভিপি জয়নাল, ফেনী-৩ আসনের এমপি মোশাররফ হোসেন, রেহানা আকতার রানু এমপি প্রমুখ। এছাড়া যুবদল, ছাত্রদলসহ বিএনপির সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সাঈদ এস্কান্দারের আত্মীয়-স্বজনরা বিমানবন্দরে উপস্থিত হন।
ভাইয়ের কফিনের পাশে
কাঁদলেন খালেদা
সকাল ১০টায় বিমানবন্দর থেকে আলিফ মেডিকেল সার্ভিসের একটি এম্বুলেন্সে করে বারিধারার পার্ক রোডের নিজ বাসভবনে নেয়া হয় সাঈদ এস্কান্দারের মরদেহ। সোয়া ১০টায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছোটভাইয়ের লাশ শেষবারের মতো দেখতে পার্ক রোডের বাসভবনে যান। সেখানে ভাইয়ের লাশ দেখে ভাইপোকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এ সময় সাঈদ এস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন এস্কান্দার, দুই ছেলে শামস, সাফিন ও মেয়ে সুমাইয়াসহ আত্মীয়স্বজনরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। এরপর সাঈদ এস্কান্দারের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই মরহুমের বাসভবনে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। এরপর সর্বসাধারণের দেখার জন্য সাঈদ এস্কান্দারের লাশ বাসভবনের সামনে রাখা হয়। এসময় বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
গার্ড অব অনার, এমপিদের শ্রদ্ধা
বারিধারার বাড়ি থেকে দুপুরে তার মরদেহ নেয়া হয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। সেখানে সংসদ ভবন মসজিদের ইমাম মাওলানা ইবরাহিমের পরিচালনায় প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী, সরকারদলীয় চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহিদ, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম, বিরোধীদলীয় এমপি এমকে আনোয়ার, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, বরকত উল্লাহ বুলু, নিজামউদ্দিন আহমেদ, মে. জে. (অব.) মাহমুদুল হাসান, ভিপি জয়নাল, আশরাফ উদ্দিন নিজান, মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, হারুনুর রশিদ, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, জামায়াতের হামিদুর রহমান আজাদ, ড. ওসমান ফারুক, মোসাদ্দেক আলী ফালু, এসএ খালেক, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ, একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বদরুদ্দোজা বাদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। জানাজা শেষে জাতীয় সংসদের স্পিকারের পক্ষে ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী, আওয়ামী লীগের পক্ষে সরকারদলীয় চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ, বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ারের নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় এমপিরা এবং জামায়াতের পক্ষে হামিদুর রহমান আযাদ এমপি সাঈদ এস্কান্দারের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে তাকে গার্ড অব অনার দেয়া হয়।
নয়াপল্টনে নেতাকর্মীদের ঢল
নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সামনে সাঈদ এস্কান্দারের দ্বিতীয় জানাজায় নেমেছিল নেতাকর্মীদের ঢল। বিকাল ৩টায় নয়াপল্টনে নেয়া হয় তার মরদেহ। সেখানে বিএনপির পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। অশ্রুসিক্ত নয়নে ছোটভাই ও দলীয় এ নেতার কফিনে ফুল দিয়েই বাসায় ফিরে যান তিনি। এরপর নেতাকর্মীদের বিপুল অংশগ্রহণে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ওলামা দলের সভাপতি হাফেজ মাওলানা আবদুল মালেক জানাজার নামাজ পরিচালনা করেন। নয়াপল্টনের জানাজায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আরএ গণি, ড. খন্দকার মোশররফ হোসেন, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, তরিকুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, এম. মোরশেদ খান, সাদেক হোসেন খোকা, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও চট্টগ্রামের মেয়র এম. মঞ্জুর আলম, শামসুজ্জামান দুদু, এডভোকেট হারুন আর রশিদ, রিজভী আহমেদ, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন এমপি, আবদুস সালাম, ফজলুল হক মিলন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাইফুল আলম নীরব, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, মীর সরাফত আলী সপু, ছাত্রদল সভাপতি আবদুল কাদের ভূঁঁইয়া জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিবসহ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা জানাজায় অংশ নেন। জানাজা শেষে বিএনপিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ফুল দিয়ে কফিনে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সাঈদ এস্কান্দারের মতো একজন নেতাকে হারিয়ে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। দলে তার অবদানের কারণে দল তাকে আজীবন স্মরণ রাখবে। নয়াপল্টন থেকে সাঈদ এস্কান্দারের মরদেহ নেয়া হয় গুলশান আজাদ মসজিদে। বাদে আসর সেখানে তৃতীয় জানাজায় রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন। শেষে বনানীর সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। উল্লেখ্য, ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত সাঈদ এস্কান্দার গত ২৩শে সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
সৌজন্যে মানবযমিন