সাম্প্রতিক লেখালেখি

শাহবাগের আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক বিভক্তি বাড়ছে

  • PDF

খোমেনী ইহসান

‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগে জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ফাঁসির দাবিতে গেলো মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শাহবাগে শুরু হওয়া সরকার সমর্থকদের সড়ক অবরোধ কর্মসূচি রোববার সপ্তম দিনে গড়িয়েছে। এই কর্মসূচিকে তরুণ প্রজন্মের গণজাগরণ হিসেবে আখ্যায়িত করে সাতদিন ধরে অভূতপূর্ব সংবাদমূল্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের গণমাধ্যম। বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মীসহ সুশীল সমাজও সর্বস্তরের তরুণদের আন্দোলন দাবি করে এই কর্মসূচি ঘিরে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলে কথা বলে যাচ্ছেন।

কিন্তু দিন যত গড়াচ্ছে শাহবাগের কর্মসূচি ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভেদ আরো প্রকট হয়ে ওঠছে। আর এই বিভেদ শুধু দলীয় রাজনীতিই নয়; রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধকেও প্রকট করে তুলেছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের শহুরে নাগরিকদের যে অংশটি আদর্শ ও সংস্কৃতি হিসেবে সেক্যুলারিজমের বাংলাদেশি সংস্করণ ধর্মনিরপেক্ষতা ধারণ করেন, তাদের সঙ্গে আদর্শ ও সংস্কৃতি হিসেবে ইসলামও ধারণ করেন-এমন শহুরে ও গ্রামীণ নাগরিকদের মধ্যে বিভেদ ও নিষ্ঠুরতার অভিজ্ঞতা অনেক পুরনো।

৭০ দশক থেকে শুরু হওয়া দুই গোষ্ঠীর বিভেদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের শহরগুলোতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজপথে এ পর্যন্ত তিনশতেরও বেশি নিষ্ঠুরতা ঘটেছে। যার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন হাজরেরও বেশি বাংলাদেশি।

এই নিষ্ঠুরতা একুশ শতকে বাংলাদেশের সৌম্য চেহারাকে অনেকখানিই মলিন করে দিয়েছে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার পল্টন এলাকায় ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর ৫ জন কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করে ধর্মনিরপেক্ষতাপন্থীরা। অন্যদিকে ইসলামপন্থীরা একই সময়ে পল্টনে হত্যা করে একজন সেক্যুলারপন্থীকে।

২০০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিন চতুর্থাংশ সংসদীয় আসনে বিজয়ী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ সরকার কায়েম হয়। এই সরকার ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামীর ছয় শীর্ষ নেতাকে ‘মানবতা বিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে প্রায় আড়াই বছর ধরে কারাবন্দি করে রেখেছে।

জামায়াতের দাবি, গত চার বছরে জামায়াত-শিবিরের ১৬ নেতা-কর্মী নিহত, দুজন গুম, দুইশ’ পঙ্গু ও ৩০ হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ১৭৩ জনই নারী। চার বছরে জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১৬ হাজার।

ইতোমধ্যে জামায়াতের ডাকা হরতালে পুলিশকে গ্রেনেড ও গুলি ছুঁড়তে দেখা গেছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে থানা চত্বরে গুলির পর চোখ তোলার কারণে শিবিরের কর্মী কিশোর আবিদ বিন ইসলাম নিহত হন।

শনিবার রাত সাড়ে ৩টায় শাহবাগের অবরোধস্থলে ১৫ বছর বয়সী কিশোর এমদাদুল হককে শিবির অভিযোগে গণপিটুনি দিয়ে শাহবাগ থানা পুলিশের হাতে তুলে দেয় ছাত্রলীগ কর্মীরা। রোববার রাত সাড়ে ৮টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসিন হলে প্রীতম, রকিব ও নকিব নামের তিন শিবির কর্মীকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয় ছাত্রলীগ।

শাহবাগের সড়ক অবরোধ

গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মানবতা বিরোধী অপরাধের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যবিহীন মামলায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

মোল্লার এই দণ্ডের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থক কিছু ব্লগার মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শাহবাগের সড়ক অবরোধ করে। তারা মোল্লার ফাঁসির দাবি জানাতে থাকেন। সড়ক অবরোধ করার পরপরই আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্রমৈত্রী এবং সরকারপন্থী বাম ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট ও ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরাও অংশগ্রহণ করতে থাকেন।

মঙ্গলবার রাত থেকেই অবরোধ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকি নাজমুল আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক ওমর শরিফ, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি হোসাইন আহমেদ তফছির, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান তারেক ও সমাজ কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক লাকী আখতার, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি মেহেদী হাসান তমাল, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি আব্দুর রউফ ও ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি প্রবীর সাহা।

বুধবার থেকেই অবরোধ কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছেন মহাজোট সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মীসহ সুশীল সমাজের সদস্যরা।

বুধবার যোগ দেন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া,  আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য কে এম শফিউল্লাহ, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম, সাংবাদিক আবেদ খান, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের গোলাম কুদ্দুস, জাসদনেত্রী শিরিন আখতার প্রমুখ।

বৃহস্পতিবার যোগ দেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী সাহারা খাতুন, তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রমুখ।

শুক্রবার যোগ দেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নুরন্নবী চৌধুরী শাওন ও তারানা হালিম, যুবলীগের মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, সাবেক ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স ও  বাসদ নেতা বজলুর রশিদ ফিরোজ। সুশীল সমাজের আওয়ামী লীগপন্থী সদস্য ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল,  ড. আনোয়ার হোসেন, সংস্কৃতি কর্মী সৈয়দ হাসান ইমাম ও নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু , আওয়ামী লীগপন্থী চিকিত্সক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত প্রমুখ।

শনিবার যোগ দেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী।

রোববার যোগ দেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ও সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ, সংসদ সদস্য ও রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের ছেলে নাজমুল আহসান পাপন ও সংসদ সদস্য মমতাজ, আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক ও মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রমুখ।

রোববার জাতীয় সংসদে শেখ হাসিন শাহবাগে অবরোধ কর্মসূচির সঙ্গে তার একাত্মতার কথা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমার মনও শাহবাগের আন্দোলনে ছুটে যেতে চায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি তরুণ প্রজন্মকে বলতে চাই, তোমাদের সঙ্গে আমরাও একমত। তোমাদের শপথ বাস্তবায়নে যা যা করা দরকার আমরা করব।’

বদলেছে দাবি, ছড়াচ্ছে আদর্শিক সহিংসতা

শাহবাগের অবরোধ কমর্সূচিতে প্রথমে মোল্লার ফাঁসির দাবি জানানো হলেও সরকারি দল ও জোটের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, নেতৃবৃন্দ এবং বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মীসহ সুশীল সমাজের সদস্যদের ভূমিকার কারণে এ দাবির গন্তব্য শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে সব দিক দিয়ে দমন করায় পর্যবসিত হয়েছে।

শুধু জামায়াত ও শিবিরই নয়, ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ, ভিন্নমতের গণমাধ্যম বন্ধ ও সরকার বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চিকিত্সা ও শিক্ষা সেবা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে শাহবাগের অবরোধ কর্মসূচি থেকে।

বুধবার রাতে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে ও রোববার খুলনার শিববাড়ি মোড়ে ইসলামী ব্যাংকের দুটি এটিএম বুথে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

শুক্রবার শাহবাগের অবরোধস্থলে অনুষ্ঠিত ছাত্র-যুব মহাসমাবেশ থেকে আগের মতই জামায়াত সমর্থক দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক নয়াদিগন্ত, টেলিভিশন চ্যানেল দিগন্ত টিভি ও সোনারবাংলা ব্লগের পাশাপাশি বিএনপি সমর্থক দৈনিক আমার দেশ-এর প্রতি বিষেদগার করে এগুলো নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়।

সরকার সমালোচক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিকদের মহা সমাবেশস্থলের প্রতিবেদন করা থেকেও বিরত থাকতে বাধ্য করার চেষ্টা চলে। সমাবেশস্থল থেকে তাদের চলে যেতে বলা হয়।

শুক্রবার রাত থেকে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে দিগন্ত টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। শনিবার শাহবাগে দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক নয়াদিগন্ত ও দৈনিক সংগ্রামে আগুন দেওয়া হয়। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল, বগুড়া ও গোপালগঞ্জে আমার দেশ পত্রিকায় আগুন দেওয়া হয়।

রোববার বিকালে সরকার বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা প্রকাশ করে সেগুলো দখলের আহ্বান জানানো হয়।

তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিন্নমতের চারটি গণমাধ্যম: দৈনিক আমার দেশ, নয়াদিগন্ত, সংগ্রাম ও দিগন্ত টেলিভিশন।

চিকিত্সা সেবা প্রতিষ্ঠান: ইবনে সিনা, ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইবনে সিনা ফার্মসহ ইবনে সিনা ট্রাস্ট পরিচালিত সব প্রতিষ্ঠান।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি (আইআইইউসি), মানারাত স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় ও লাইসিয়াম কিন্ডার গার্টেন।

শিক্ষা সেবা প্রতিষ্ঠান: ফোকাস (বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি), রেটিনা মেডিকেল ভর্তি), কনক্রিট, কনসেপ্ট ও অ্যাক্সিলেন্ট (ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি) কোচিং সেন্টার।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান: ইসলামী ব্যাংক, ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ও তাকাফুল লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

অবকাঠামো নির্মাণ প্রতিষ্ঠান: কোরাল রিফ মিশন ডেভেলপারস, আবাসন সিটি, লালমাটিয়া হাউজিং ও ওয়ান সিটি।

প্রকাশনা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান: প্রফেসর’স, কারেন্ট নিউজ, আধুনিক, কিশোর কণ্ঠ, ফুলকুঁড়ি ও মদিনা পাবলিকেশন।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন: শহীদ মালেক ফাউন্ডেশন, কিশোর কণ্ঠ ফাউন্ডেশন, ফুলকুঁড়ি সাহিত্য পরিষদ, সাইমুম, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, সিএনসি ও স্বদেশ সাংস্কৃতিক পরিষদ।

আন্দোলনে রাজনৈতিক বিরোধ কমেনি

মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় ঘোষণার পরে বিএনপি কোন ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে। শাহবাগের সমাবেশকেও ‘গণতন্ত্রের জন্য জনগণ জেগেছে’ বলে মন্তব্য করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ।

শাহবাগের কর্মসূচি ব্যাহত না হওয়ার স্বার্থে দলটির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সহাবস্থানের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয় শনিবার স্মারকলিপি পেশ ও সোমবারের বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করে।

শনিবার দেখা যায়, শাহবাগের কর্মসূচির ব্যাপার অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপি। পুলিশ দলটির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের শনিবারের বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচির অনুমতি না দিলে ওই দিনই এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করে বিএনপি।

বিক্ষোভ মিছিল পূর্ব সমাবেশে শাহবাগে সড়ক অবরোধ করে সরকারি দল আওয়ামী লীগ কর্মসূচি পালনে করছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

ফখরুলের দাবি, ব্যর্থ ও দুর্নীতিতে লিপ্ত সরকার পিঠ বাঁচাতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে । তিনি বলেন, ধুম্রজাল সৃষ্টি করে সরকার নিজেদের কর্মসূচিগুলো বিভিন্নভাবে পালন করছে।

অন্যদিকে, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান শনিবার রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে আরক ধাপ এগিয়ে বলেন, জয় বাংলা স্লোগানের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে শাহবাগে সরকারি দলের সমাবেশ চলছে।

তিনি দাবি করেন, পদ্মাসেতু দুর্নীতি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, শেয়ারবাজার লুট ইস্যু ধামাচাপা দিতে ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্ববহাল ইস্যুর আন্দোলন বানচাল করতে সরকার শাহবাগের সমাবেশকে ব্যবহার করছে।

রোববার, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে টাকা ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে শাহবাগের আন্দোলনকে দলীয়করণ করা হয়েছে অভিযোগ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য আ স ম হান্নান শাহ।

সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে এক বিবৃতিতে বিএনপি অভিযোগ করে, ‘শাহবাগ চত্বরের সমাবেশ স্থলে আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবী ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা আমার দেশ, নয়াদিগন্ত, সংগ্রাম পত্রিকায় অগ্নিসংযোগ করেছে এবং পত্রিকাগুলো বন্ধ করে দেয়ার জন্য প্রতিদিন হুমকি দিচ্ছে।’

‘পাশাপাশি মানুষের মত-প্রকাশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে নির্ভীক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও গণতন্ত্রের স্বপক্ষে আপোষহীন উচ্চকণ্ঠ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ড. পিয়াস করিমকেও নানাভাবে হুমকি দেয়া হয়েছে’ অভিযোগ বিএনপির।

বিএনপির দাবি, ‘এই সমস্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে ’৭৫-এর একদলীয় ফ্যাসিবাদের সুস্পষ্ট প্রতিধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার ৪০ বছর ধরেই বিরাজমান রাজনৈতিক বিভক্তি বাংলাদেশের জনগণের কাছে গা সওয়া ব্যাপার। কিন্তু অতীতের ভয়ঙ্কর ও ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতায় দেখা যায় রাজনৈতিক বিভক্তি নিষ্ঠুরতায় পর্যবসিত হয়।

এ কারণে জনমনে এবারও শঙ্কা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের আবারো নিষ্ঠুরতার জমিনে পরিণত হওয়া নিয়ে। এই শঙ্কা বাংলাদেশের মানুষ কিভাবে মোকাবেলা করে তা সামনের দিনগুলোতে আরো পষ্ট হবে নানা ঘটনাঘটনে।

 

শাহবাগের স্বাধীনতা: শাহবাগের অরাজনীতি

  • PDF

সেলিম রেজা নিউটন

এ তো রীতিমতো অরাজকতা। খোদ রাজধানী থেকে রাজনীতি/রাজ-তন্ত্র উঠে গেল নাকি? রাজার অনুমতি, রাজার পুলিশ-পেয়াদা-বরকন্দাজদের লিখিত পারমিশন ছাড়া সমাবেশ হচ্ছে দিব্যি। রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশ।

 

রবীন্দ্রনাথ যদি আইরিশ ড্রিংকিং সং থেকে সুর নকল করতে পারেন, তাহলে আমি কেন করতে পারবো না? : সোহিনী

  • PDF

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত `আমার সোনার বাংলা` গানের নতুন একটি মিউজিক ভিডিও নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই সোশ্যাল মিডিয়া জগতে ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে ইংল্যান্ড`ক্ষ` ব্যান্ড দল। তবে শুধু রবীন্দ্রনাথ বা অন্য কোনো শিল্পী নয়, এক সময় নিজের রচনা ও সুরেও বাংলা গান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ‘ক্ষ’ ব্যান্ডের ভোকালিস্ট সোহিনী আলম।

তিনি বলেছেন, হয়তো এক সময় নিজেরও মৌলিক বাংলা গান হবে। হয়তো শ্রোতাপ্রিয়তা অর্জন করবে, আবার হয়তো করবে না।

 

সার্বভৌম বন্ড : ঝুঁকি ও সম্ভাব্য পরিণতি বিশ্লেষণ

  • PDF

মোশাহিদা সুলতানা ঋতু

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি খবর প্রায়ই আসছে পত্রিকায় আর তা হলো আমাদের অর্থমন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার পূর্ব প্রস্তুতি নিচ্ছে | এরই মধ্যে সরকার সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে যারা যাচাই করে দেখছেন সম্ভাব্য কী উপায়ে ও কী পরিমাণে এই সার্বভৌম বন্ড বাজারে ছাড়া সম্ভব | কয়েকটি উত্স থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, মোট ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সার্বভৌম বন্ড ছাড়তে পারে বাংলাদেশ সরকার। এর পক্ষে এবং বিপক্ষে অনেকেই অনেক ধরণের যুক্তি দিচ্ছেন | এর পক্ষে যারা যুক্তি দেখাচ্ছেন তাদের মতে দাতা সংস্থার ঋণের শর্তের চাপ বহন করার চাইতে সার্বভৌম ঋণ নিয়ে দেখা যেতে পারে কী হয় | আর এর বিপক্ষে যারা বলছেন তারা মনে করছেন সার্বভৌম ঋণ নেয়া যেতেই পারে কিন্তু এই মুহূর্তে যখন সুদের হার বেশী তখন বন্ড ছাড়া আদৌ জরুরী কিনা | আজকে আমি লিখছি এই পক্ষে বিপক্ষের মতামতগুলিকে পর্যালোচনা করে, বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দেশের সরকার কীভাবে বন্ড বিক্রির মাধ্যমে নিজের দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে এবং আমাদের দেশের জন্য এর সম্ভাব্য ঝুঁকি বা পরিণতি কী হতে পারে তার উপর আলোকপাত করতে |

প্রথমেই বাংলাদেশের জন্য এই নতুন ধরণের বন্ড সম্পর্কে একটু বলে নেই | সার্বভৌম বন্ড একটি বিশেষ ধরণের বন্ড যা সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারে বিক্রি করার অধিকার রাখে এবং এর মধ্যে দিয়ে সেই রাষ্ট্র অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট ঘাটতি মোকাবেলা করতে কাজে লাগায় | সরকারের আয়ের চাইতে ব্যয় বেশি হয়ে গেলে অনেক দেশ সার্বভৌম বন্ড চালু করে সাধারণত এর মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ যোগায় | যদিও বাংলাদেশে সব বন্ডকেই সার্বভৌম বন্ড বলার প্রচলন আছে তবুও সরকারের ইস্যু করা অন্যান্য বন্ডের সাথে এই নতুন ধরনের সার্বভৌম বন্ডের পার্থক্য আছে | আর এই পার্থক্যটি হলো সরকারী বন্ড কেনা বেচা হয় টাকায় এবং দেশের অভ্যন্তরে আর সার্বভৌম বন্ড কেনা বেচা হয় বৈদেশিক মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাজারে এবং এর ক্রেতা হতে পারে যে কেউ – কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দেশ, এবং আন্তর্জাতিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যান্কগুলিও | পৃথিবীর অনেক দেশ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সার্বভৌম বন্ড আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারে ছেড়ে তার ব্যয়ের জন্য অর্থ যুগিয়েছে | এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আর্জেন্টিনা, গ্রীস, এবং সম্প্রতি দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে শ্রীলংকা ও পাকিস্তান | বাংলাদেশ এর আগে কখনো সার্বভৌম বন্ড আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারে ছাড়েনি | সম্প্রতি কুইক রেন্টালের বাড়তি তেলের চাহিদা মেটাতে গিয়ে আমদানী খরচ বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স হ্রাস, এবং টাকার অবমুল্যায়নের কারণে একদিকে যেমন ব্যালান্স অফ পেমেন্ট ঘাটতি তৈরি হয়েছে অন্যদিকে দেশীয় ব্যান্ক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়ার কারণে ব্যাঙ্কের তারল্য হ্রাস পেয়েছে | যদিও জানুয়ারী মাসে রেমিটেন্সের প্রবাহ বেড়েছে এবং যদিও রেমিটেন্স ও গার্মেন্টস রপ্তানির আয়ের তুলনায় সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে বৈদেশিক ঋণের/বিনিয়োগের অবদান সামান্যই, তবু এক দিকে বিনিয়োগ হ্রাস এবং অন্যদিকে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাঙ্কের সৃষ্ট জটিলতার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের গতি ব্যাহত হওয়ার কারণ দেখিয়ে নীতি নির্ধারকমহল বিকল্প অর্থায়নের উৎস হিসেবে উচ্চ সুদে সার্বভৌম ঋণের কথা ভাবছে |

বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে শ্রীলংকা সার্বভৌম বন্ড আন্তর্জাতিক বাজারে ছেড়ে বিপুল সারা পেয়েছে | ক্রেডিট রেটিং এ শ্রীলংকা বাংলাদেশের কাছাকাছি, কাজেই বাংলাদেশ এই সময় বন্ড ছাড়লে বাংলাদেশের বন্ডেরও চাহিদা তৈরি হতে পারে | এবং তা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এই মুহূর্তের বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি মেটাতে পারে | কিন্তু আমরা যদি পিছন ফিরে দেখি যে শ্রীলংকা কোন পরিস্থিতিতে পরে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করেছে তাহলে শ্রীলংকাকে ভালো উদাহরণ হিসাবে দাড় করানোর পিছনে ভ্রান্তিটা কিছুটা হলেও পরিস্কার হবে| ২০০৪ সনে সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শ্রীলংকা আশা করেছিল দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্নির্মাণের জন্য বিদেশী সাহায্য পাবে | কিন্তু এক বছরের মধ্যে শ্রীলংকা বুঝতে পারে যে যেই হারে বিদেশী সাহায্য প্রথম দিকে এসেছিল তা ছিল সাময়িক এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল পরিমান অর্থের | তখন শ্রীলংকা বন্ডের শরণাপন্ন হয়, ২০০৫ এ প্রথম দেশের বাজারে ডেভেলপমেন্ট বন্ড হিসাবে ছেড়ে, শেষে ২০০৭ সালে প্রথম সার্বভৌম বন্ড আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারে ছাড়ে | ২০০৭ সনে শ্রীলংকা ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বন্ড ছেড়ে প্রায় তিনগুণ অর্থাৎ দেড় বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বন্ড ক্রেতা পায়| তারপর যথাক্রমে ২০০৯ সালে, ২০১০ সালে, এবং ২০১১ সালে শ্রীলংকা যথাক্রমে ৫০০ মিলিয়ন, ১ বিলিয়ন ও ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বন্ড বাজারে ছাড়ে। যদিও বলা হয় শ্রীলংকা উন্নতি করছে কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় ২০০৫ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত শ্রীলংকার বাহ্যিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৬৫% (১০.৮৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৭.৯৭ বিলিয়ন ডলার )| অথচ ২০০০ সাল থেকে ২০০৪ পর্যন্ত ঋণের বৃদ্ধি ছিল মাত্র ২৪% | এবং লক্ষনীয় এই যে প্রথম এক দফা বন্ড ছেড়েই শ্রীলংকা থেমে যায়নি | তাকে বার বার পুঁজিবাজারে বন্ড ছেড়ে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে যেমন ২০০৯ সালে বন্ড ছেড়ে পাওয়া ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ৩০০ মিলিয়নই ব্যায় করতে হয়েছে ২০০৭ সালের বন্ডের ঋণ শোধ করতে |অনেকেই বলে থাকবেন যে এটাই তো স্বাভাবিক যে ঋণ নিলে শোধ করতে হবে, এবং সেজন্য ঋণের বোঝা বাড়তে থাকবে | কিন্তু ঋণের বোঝা বাড়লে কি পরিণতি হয় তার প্রমান দেখতে অতীতের উদাহরণ ইন্দোনেশিয়া, আর্জেন্টিনা বা রাশিয়া পর্যন্ত না যেয়ে যদি সাম্প্রতিক গ্রীসের অবস্থার দিকেই তাকাই তাহলে দেখা যাবে গ্রীস কিভাবে ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে এখন দেশের জনগনকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে |

এবার আসা যাক ক্রেডিট রেটিং এর অর্থনৈতিক রাজনীতি প্রসঙ্গে | যেকোনো দেশ সার্বভৌম বন্ড বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রথমে যাচাই করে আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারে এর রেটিং কেমন | বর্তমান অর্থনৈতিক নীতি এবং ঋণ পরিশোধের পূর্ববর্তী রেকর্ড (ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ) দেখে যদি দেখা যায় যে সেই দেশের ঋণ পরিশোধের রেকর্ড ভালো তাহলে সেই দেশ ভালো রেটিং পায় | আর তার পূর্বের রেকর্ড খারাপ থাকলে তার রেটিং আসে কম | এভাবে পৃথিবীর তিনটি বড় বড় ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি প্রতি বছর বিভিন্ন দেশেকে ক্রেডিট রেটিং দিয়ে থাকে | এই ধরনের সেবা দিয়ে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো যেমন দেশগুলো থেকে বিপুল আয় করে, তেমনি দেশগুলো তাদের নিজস্ব প্রয়োজন অনুসারে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সীগুলোর শরণাপন্ন হয় | যদি কোনো দেশের বাণিজ্যিক ঘাটতি বা বাজেট ঘাটতি হয় এবং অর্য়নের অনিশ্চয়তা দেখা দেয় তখন দেশগুলো বন্ড ছাড়তে উদ্যোগী হয় | ক্রেডিট রেটিং বেশী দেখালে দেশগুলোর জন্য বন্ড বিক্রি সহজ হয় কারণ তখন বেশী বিনিয়োগকারী পাওয়া যায় | ধরলাম এই সব কিছুই ঠিক আছে | কিন্তু ক্রেডিটরেটিং ঠিক ভাবে দেওয়া হচ্ছে কি হচ্ছে না তা এখন আর নিশ্চিত করে বলা যায় না | কারণ গ্রীসের ক্রেডিট রেটিং ২০০০ এর প্রথম দিক থেকে A , A -, এবং A + এর মধ্যে ছিল | এর কারণ গ্রীস সহজ শর্তে ঋণ নেওয়ার জন্য ভুল তথ্য দিয়েছিল, এবং এর উপর ভিত্তি করে যখন ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো পুঁজি বাজারে রেটিং দেয় তখন কেউ জানত না যে গ্রীসের বাজেট ঘাটতি, বাহ্যিক ঋণ দিনকে দিন বেড়েই চলেছিল | ২০০৯ এর ডিসেম্বরে যখন গ্রীসের রেটিং A – থেকে নেমে BBB + এ নেমে যায় তখন বোঝা গেল বাইরে থেকে দেখা রেটিং এর সাথে গ্রীসের আসল অর্থনীতির অবস্থার তফাত কোথায় | গত কয়েক বছর ধরে গ্রীস অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে | এর ফলে কারো কিছু না হলেও গ্রীসের সাধারণ মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায় | কারণ এত দিন তারা বসবাস করছিল ঋণ করে দাড়ানো অর্থনীতির উপর | যেই মুহূর্তে তাদের পায়ের নীচে থেকে মাটি সরে গেলো তখন তারা উপলব্ধি করা শুরু করলো এতদিন কী ফাঁপার উপর দাড়িয়ে ছিল গ্রীস |

এবার দেখা যাক বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং নিয়ে কী হচ্ছে | Standard and Poor’s বাংলাদেশকে দিয়েছে BB- গ্রেডিং এবং Moody’s দিয়েছে Ba3 গ্রেডিং | উভয় রেটিং অনুযায়ী বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ‘সন্তোষজনক’ ও ‘স্থিতিশীল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে | শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশের রেটিং এখন শ্রীলংকা ও পাকিস্তানেরও উপরে | এবং এই তুলনা টেনে বলা হচ্ছে যদি শ্রীলংকা ও পাকিস্তান পারে তাহলে বাংলাদেশও বন্ড বাজারে ছেড়ে অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করতে পারবে না কেন | এখন দেখা যাক অন্য একটি রিপোর্ট কী বলে | সম্প্রতি ইউকে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বিভাগের ‘বাংলাদেশ কোয়ার্টারলি ম্যাক্রো-ইকোনমিক আপডেট (অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১১)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে যেসব ব্যাংক ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে বেশি সংশ্লিষ্ট ছিল, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এবং ব্যাংক রক্ষায় সরকারের সহায়তা (বেইলআউট) লাগতে পারে | বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বলা হয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা, সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া, দুই অঙ্কের ঘরে সুদের হার এবং মূল্যস্ফীতি, শেয়ারবাজারের বিপর্যয়, চাহিদা মেটাতে টাকার অভাব অর্থনীতির ঝুঁকিগুলোকে আরও বাড়িয়ে অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে গেছে | এদিকে আমাদের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা এমন নয় যে, তাদের জন্য বেইল আউট কর্মসূচির দরকার হতে পারে। শেয়ারবাজারে মোট কত টাকা বিনিয়োগ আছে ব্যাংকগুলোর? এ ধরনের প্রতিবেদন আমাদের অর্থনীতি এবং ব্যাংকিং সম্পর্কে ভুল বার্তা দিচ্ছে।” এই দুই ধরণের বিশ্লেষণ স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে, জনগণের পক্ষে বোঝা মুশকিল কোন পক্ষের কথা ঠিক| গ্রীসের সাম্প্রতিক ঘটনা যেমন জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে, তেমনি সন্দেহ তৈরি করেছে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাঙ্কের অবস্থান| এই সব বিশ্লেষণের পর এটাই প্রতীয়মান হয় যে এই দ্বিধাগ্রস্ততার মধ্যে রাখাটাই এক ধরণের আন্তর্জাতিক রাজনীতির কুটনৈতিক কৌশল | এথেকে আরো প্রতীয়মান হয় যে উন্নত বিশ্বের বাজার সব দিকে বাধা প্রাপ্ত হয়ে অর্থাৎ অর্থনৈতিক বিপর্যয় একে একে রাশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা, ইস্ট এশিয়া, আমেরিকা, ইউরোপে আঘাত করে এখন দক্ষিন এশিয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে | ১৯৯৮এ রাশিয়া, ১৯৯৯ থেকে ২০০২ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা, আশির দশকে ইন্দোনেশিয়া, এবং সাম্প্রতিক সময়ে গ্রীস যখন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় তখন হার ভাঙ্গা পরিশ্রম করা মানুষকেই তার খেসারত দিতে হয়েছে | বেসরকারীকরণ, মূল্যস্ফীতি, বর্ধিত ট্যাক্স, সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট খর্ব করা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও সেবা খাত বাণিজ্যিকীকরণ এই সব কিছু আঘাত করেছে সবচাইতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে |

এই দিক থেকে যারা বলছেন যে বিশ্ব ব্যাঙ্কের দেওয়া শর্তের থেকে রেহাই পেয়ে বাংলাদেশ সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতে পারে তাদের কাছে গ্রীসকে একটি উদাহরণ হিসাবে দেখানো যেতে পারে|বন্ড বিক্রি করার সময় শর্ত লেখা না থাকলেও নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রায় উচ্চসুদে নেয়া ঋণের সুদাসল পরিশোধের চাপ এবং ক্রেডিট রেটিং এর ওঠানামা সেই একই শর্ত পূরণের ক্ষেত্রই তৈরি করবে| যেমন: ঋণের টাকায় বাংলাদেশ যদি এমন কোন প্রজেক্ট হাতে নেয় যার থেকে আয় সরকারী কোষাগারে জমা হতে সময় লাগবে পাঁচ বছর, তখন বাংলাদেশের জন্য এই টাকা প্রথম বছর থেকে নিয়মিত পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়বে এবং তখন অন্য খাতে ব্যয় কমিয়ে সেই টাকা পরিশোধ করতে হবে | এই সমস্যাটিকে বলা হয় ম্যাচিউরিটি মিসম্যাচ অর্থাৎ ম্যাচিউরিটির সময়ের ভিন্নতার কারণে উদ্ভূত ঝুঁকি। আবার সার্বভৌম বন্ড বিক্রির সাথে সাথে এর চাহিদা ধরে রাখার জন্য সরকারকে জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় কমিয়ে সেই অর্থ লাভজনক খাতে ব্যয় করতে হবে | একারণেই দেখা গেছে আর্জেন্টিনা এবং গ্রীস সরকারকে খরচ কমাতে যেয়ে বেসরকারীকরণ ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য করা হয়েছে | এরকম পরিস্থিতিতে হয়ত পড়তে চায়নি গ্রীস বা আর্জেন্টিনা কিন্তু বাস্তবতা এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে ঋণের বোঝা সামলাতে না পেরে এর দায় জনগনের উপরই পড়েছে| কাজেই পরিণতির দিক থেকে বিশ্ব ব্যাঙ্কের শর্ত আর বন্ড কিনলে বাজার ধরে রাখার শর্তের মধ্যে আসলে তেমন কোনো পার্থক্য নেই | খোলা চোখে মনে হতে পারে বিশ্ব ব্যাঙ্কের বিকল্প সার্বভৌম বন্ড | কিন্তু বাস্তবে উভয়ের শর্ত একই |

খুব আশাবাদী হয়ে যদি ধরেও নেই আমাদের পরিস্থিতি রাশিয়া, আর্জেন্টিনা, গ্রীসের মত হবে না তারপরও স্বীকার করতেই হয় যে সার্বভৌম বন্ডে রয়েছে নানা ধরনের ঝুঁকি | দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে, টাকার অবমূল্যায়ন হলে, পরিশোধের নির্দিষ্ট সময়ে অনাকাঙ্খিত ভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফুরিয়ে গেলে, বড় ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে, এবং কোনো আন্তর্জাতিক কুটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের উপর কোনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ তৈরি হলে বন্ডের চাহিদা কমে যেতে পারে | সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যদি ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে তাহলে একটা ঋণ পরিশোধ করতে আরেকটা ঋণ নিতে হবে, এবং তখন আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেডিট রেটিং কমে গেলে বাংলাদেশকে আরো অধিক সুদে বন্ড বিক্রি করতে হবে|

সরকার সার্বভৌম বন্ড বাজারে ছাড়লে এখন থেকে কয়েক বছর পর গ্রীসের সাধারণ মানুষদের মত আমাদের রাস্তায় নামতে হবে কিনা জানি না, তবে এই সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না | কারণ সরকার ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাকে সবার আগে বাজেট খর্ব করতে হবে, এবং তা করতে হবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপর সেই বোঝা চাপিয়ে |জনগণ এই ঋণের বোঝা চায় কিনা তা সরকারকে জানতে হবে | জনগনকে অজ্ঞতার অন্ধকারে রেখে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলে সরকার বড় ধরণের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে | গ্রীসের অবস্থায় গিয়ে নয়, ভাবতে হবে এখনই – জনগনকে এবং নীতি নির্ধারক মহলকে |

মোশাহিদা সুলতানা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-এর অর্থনীতির প্রভাষক।

লেখাটি ফেব্রুয়ারী ১৬, ২০১২ তারিখে বিডিনিউজ২৪’এ প্রকাশিত

 

রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান : আহমদ ছফা’র অনুভব

  • PDF

চৌদ্দই আগষ্টের রাতে আমি নতুন ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার সাতাশ নম্বর সড়কের একটি হোস্টেলে এক বন্ধুর সংগে ঘুমাতে গিয়েছিলাম। সাতাশ নম্বর আর বত্রিশ নম্বর সড়কের ব্যবধান বড় জোড় তিন থেকে চার'শ গজ। এই বত্রিশ নম্বরেই দারাপুত্র পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান।

আনুমানিক রাত এগারোটা হবে হয়ত। বত্রিশ নম্বর পেরোবার সময় খাকি পোষাক পরা আট দশজন পুলিশ দেখলাম। কয়েকজন অফিসার, বাকিরা সেপাই। বন্দুক উঁচিয়ে রাষ্ট্রপতির বাসভবনের সামনের সড়কের মুখে পাহারারত।

এই পথে বেশ ক'দিন থেকে যাওয়া আশা করছি। প্রায়ই দেখতাম ঘুণটি ঘরে দু'জন থেকে তিনজন সেপাই দাঁড়িয়ে। কোন অফিসার দেখেছি মনে পড়ে না। আজ পাহারাদারদের দল ভারি দেখেও মনে কোন ভাবান্তর আসেনি।

আগামীকাল পনেরোই আগস্ট বেলা দশটার দিকে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এককালের বাংলাদেশের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানিত অতিথি হিসেবে আগমন করছেন। হয়ত সেজন্য এই অধিকসংখ্যক সেপাই-সান্ত্রীর আনাগোনা। এখন পর্যন্ত সবকিছু পূর্ব-নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুসারে ঘটে আসছে। কোথাও কোনো ঝঞ্জাট ঘটেনি।

শেখ মুজিবুর রহমানের আগমনোপলোক্ষে বিস্তীর্ন এলাকা জুড়ে ছড়ানো-ছিটানো বিশ্ববিদ্যালয়ে চলেছে সাজানো গোছানোর পালা। রাস্তার এবড়ো-থেবড়ো গর্তগুলোতে সুরকি পড়েছে। রোলার ঘুরছে, পীচের আস্তরণ বসেছে। গত এক পক্ষকাল ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে, কলভবনে, বাণিজ্যভবনে, বিজ্ঞানভবনে জোর মেরামতির কাজ চলছে। অনেকদিন অনাদরে মৃত জন্তুর কন্কালের মত দাঁড়িয়ে থাকা ন্যাড়ামুড়ো দেয়ালগুলো চুণ, সুরকির প্রসাধন স্পর্শে হেসে উঠেছে। সমস্ত এলাকাটায় একটা সাজ সাজ রব, তাড়াহুড়ো ব্যস্ততা এসব তো আছেই।

রাতের আঁধারে শক্তহাতে আলকাতরা দিয়ে দাবড়া করে লেখা শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা দেয়াল লিখনসমূহ নবীন চুনের প্রলেপের তলায় ঢাকা পড়েছে। সুন্দরীর ললাটের সিন্দুর বিন্দুর মত বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সুউচ্চ শুভ্র প্রাচীরের কপোলদেশে শিল্পীর নিপুণ তুলিতে লেখা সুন্দর সুন্দর লিখনমালা দৃস্টিকে দূর থেকে টেনে নিয়ে যা্য়। শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতির ত্রানকর্তা, সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রবর্তনের মহানায়ক, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লৌহমানব ইত্যাদি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছেন, তাই বিশ্ববিদ্যালয় নানান রঙের চিত্রলেখায় সেজে সুন্দর হয়ে উঠেছে। চারদিকে একটা উৎসবের হাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়াঢাকা কালো কালো সাপের শরীরের মত চেকন বাঁকা রাস্তাগুলোর মোড়ে মোড়ে উল্লসিত অভিনন্দন বুকে ধারন করে রাতারাতি ঝাঁক বেঁধে দাঁড়িয়ে গেছে নানান রঙের প্ল্যাকার্ড। তোরণরাজি মাথা তুলেছে। সর্বত্র একটা উৎকন্ঠার ভাব। আগামীকাল কাঁটায় কাঁটায় বেলা দশটায় তিনি আসছেন।

প্রায় এক পক্ষকাল ধরে দিনে রাতে কাজ চলছে। উপাচার্যের আহার নেই, নিদ্রা নেই। সাড়ে সাত লক্ষ টাকা নগদে বলিয়ে দিয়েও মনে মনে তিনি সস্তিবোধ করতে পারছেন না। দৈবাৎ যদি কোন ত্রুটি থেকে যায়, আর সেখানেই যদি মহামানবের দৃস্টি আটকে যায়, তিনি মুখ দেখাবেন কেমন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রপতির এটা প্রথম আনুষ্ঠানিক আগমন। তিনি শুধু রাষ্ট্রপতি নন, বাঙালি জাতির পিতা, মুক্তিদাতা, বাংলার হাটের মানুষ, ঘাটের মানুষ, মাঠের মানুষের বন্ধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সরকার সমর্থক ছাত্রদলটির হোমরা-চোমরা কর্মীদেরও বেশ ব্যস্তদিন কাটছে। তারা দিবসে কাজের তদারক করে, রজনীতে পাহারায় থাকে। বাংলাদেশে দুস্ট লোকের অভাব নেই। রাষ্ট্রপতির আগমনের সন্গে সম্পুর্ণ সংগতিহীন অলুক্ষণে কোন দেয়াল লিখন লিখে যেতে পারে, অনেক অর্থব্যয়ের শ্রমের শিল্পকর্মগুলোর অংগহানি ঘটাতে পারে, সুন্দর চিত্রলেখাসমুহের লাবণ্যহানি করতে পারে, এরকম কিছু ঘটা অস্বাভাবিক নয়। তাই আগেভাগেই এই শতর্কতামুলক ব্যবস্থা।

পুরো দায়িত্বটা রাষ্ট্রপতির জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামাল গ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁর দীর্ঘ দেহ এবং বাহু বিশিষ্ট বন্ধুদের নিয়ে অবিরাম চরকার মত ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের গোঁড়া সমর্থক ছাত্র এবং শিক্ষকদের মনোভংগিটা এরকম যে, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে চরণ ফেলামত্রই বাংলাদেশে একটি অভিনব যুগের অভ্যুদয় ঘটবে।

শেখ মুজিবের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনটা ছিল কৌশলগত দিক দিয়ে তাঁর নতুন শাসনতান্ত্রিক বিধি চালু করার পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। উনিশ শ' পচাঁত্তর সাল শুরুর দিকে তিনি বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক কার্যকলাপ একেবারে নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছেন। বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীদের বেশকিছুকে জেলে ভরেছেন। তাঁর একনায়কত্বের প্রতিস্পর্ধী তরুণ বয়স্ক রাজনৈতিক নেতা এবং কর্মীদের খুশীমাফিক হত্যা করেছেন এবং সে কথা বলে প্রকাশ্যে গর্ববোধ করতেও তাঁকে দেখা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর স্থলে সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রপতি হয়ে বসেছেন। তাঁর নিজের দল আওয়ামী লীগ অন্য দুটো সমর্থক দল বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চালিত ন্যাশনাল আওয়মী পার্টির কেউ কোনো ওজর আপত্তি উত্থাপন করেননি। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতার সংগে জড়িত এই তিনটি দলের প্রত্যেকটিরই টিকে থাকার জন্য শেখ মুজিবের ছত্রছায়ায় দাঁড়ানোর ছিল একেবারে অপরিহার্য। মুজিব থাকলে তাঁরা সবাই আছেন, তিনি নেই তো কেউ নেই। তাই তাঁদের কারো পক্ষে এই জননন্দিত অধিনায়কের কোনো সিদ্ধান্তকে দলীয় কিংবা আন্ত:দলীয় শৃংখলা প্রয়োগ করে রাশ টেনে ধরা অসম্ভব ছিল।

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়েই তিনি তাঁর প্রতি সমর্থনবিমুখ পত্র-পত্রিকাসমুহের মুখ প্রায় বন্ধ করে নিয়ে আসছিলেন। বিরোধী পত্রিকাগুলোতে সরকারি বিজ্গ্জাপন বন্ধ করে দিয়ে, সাংবাদিকদের গ্রফতার করে, সম্পাদকদের জেলে পুরে, ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত করে ইত্যাদি নানা ছলছুতোর সাহায্যে অনেকগুলো দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং পাক্ষিক পত্রিকার প্রকাশ সাফল্যজনকভাবে বন্ধ করে দিতে পেরেছিলেন। এই চরম মার হজম করেও যে গুটিকয়েক পত্রিকা প্রাণ নিয়ে কোনোরকমে বেঁচেছিল, সগুলোর বিরুদ্ধে কোন রকমের অভিযোগহীনতাকেই অভিযোগ হিসেবে দাঁড় করিয়ে সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করে বন্ধ করে দিলেন।

তারপরে বাংলাদেশে শেখ মুজিবের বিরোধী কোন দলের মালিকানাধীন কোন পত্রিকা ছিলনা। ব্যক্তি মালিকানাধীন পত্রপত্রিকার সংখ্যাও ছিল একেবারে অল্প। শেখ সাহেবের নিজের দল আওয়ামী লীগ এবং তাঁর সমর্থক দুটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চালিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এই তিনটি রাজনৈতিক দলকে তিনি অংগুলি হেলনে সামনে পেছনে ডাইনে বাঁয়ে যেদিকে ইচ্ছে পরিচালনা করতেন। এই দলগুলোর ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শন যা-ই হোক না কেন, কার্যত তাঁরা শেখ মুজিবুর রহমানের সব রকম নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতেন। অংগদলসমুহের পরামর্শে নাকি নিজের বিবেচনা অনুসারে তা বলা খুব মুশকিল। তিনি সরকারি দলটি এবং সরকারের অন্ধ সমর্থক দল দুটোকে ভেংগে একটি মাত্র জাতীয় দল গঠন করার সিদ্ধান্ত ঘোষনা করলেন। আর নতুন জাতীয় দলের নামকরন করলেন, "বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ" সংক্ষেপে বাকশাল। বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষনার পরে তখন পর্যন্ত যে কয়টি ব্যক্তি বা দলীয় মালিকানাধীন পত্রিকা বাংলাদেশ সরকারের সংগে আপোস রফা করে বেঁচেছিল, সগুলোকে পুরোপুরি সরকারি আওতায় নিয়ে আসার জন্য তিনি সুদীর্ঘ বাহু প্রসারিত করলেন।

বাংলাদেশে ব্যাক্তি বা দলীয় মালিকানাধীন দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকার সংখ্যা ছিল একেবারে স্বল্প। অনেকগুলোই সরকারি কোপানলে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছে। আইয়ুব আমলে প্রত্যক্ষভাবে সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকার সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি। একটি বাংলা, অন্যটি ইংরেজি। বাংলা পত্রিকাটির নাম ছিল "দৈনিক পাকিস্তান"। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর "দৈনিক বাংলা" নামে আত্মপ্রকাশ করে। ইংরেজি পত্রিকাটির নাম ছিল "মর্নিং নিউজ"। এ দুটি পত্রিকা ছাড়া স্বাধীনতার পর সরকারের প্রত্যক্ষ এখতিয়ারে আরো তিনটি পত্রিকা চলে আসে। তার দুটি দৈনিকের মধ্যে একটি বাংলা এবং একটি সাপ্তাহিক চলচ্চিত্র পত্রিকা। ইংরেজি দৈনিকটির পাকিস্তান নাম ছিল, "পাকিস্তান অবজারভার"। স্বাধীনতার পর "বাংলাদেশ অবজারভার" নাম নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। বাংলা কাগজটি আগে থেকেই "দৈনিক পূর্বদেশ" নামেই পরিচিত ছিল এবং চলচ্চিত্র পত্রিকাটির নাম ছিল "চিত্রালী"। এই পত্রিকা তিনটির মালিক জনাব হামিদুল হক চৌধুরী যিনি ন'মাসের স্বাধীনতা যু্দ্ধের সময়ে দখলদার পাকিস্তানি সৈন্যদের কার্যকলাপ সমর্থন করেছেন এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্থনের পূ্র্বে পাকিস্তানে আশ্রয়গ্রহন করেছিলেন। তাই পরিত্যাক্ত সম্পত্তি হিসেবে পত্রিকা তিনটির প্রকাশনার দায়িত্ব সরাসরি সরকারকেই গ্রহণ করতে হয়েছিল।

শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে বাংলাদেশ যুব আওয়ামী লীগ প্রসিডিয়ামের সভাপতি কেন্দ্রীয় বাকশালের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা এবং রাষ্ট্রপতির বুদ্ধিবিবেচনার একমাত্র ভরসা বলে কথিত জনাব শেখ ফজলুল হক মনি স্বাধীনতার পরে একেবারে শূন্যাবস্থা থেকেই তিন তিনটি পত্রিকার জন্মদান করেছিলেন। একটি ছিল বাংলাদেশের বিচারে ইর্ষাযোগ্য মানের অধিকারী ইংরেজি দৈনিক, নাম "বাংলাদেশ টাইমস", বাংলা দৈনিকটির নাম "বাংলার বাণী" এবং চলচ্চিত্র পত্রিকাটির "সিনেমা" নামে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতার পূর্বে তিনি স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় সাব এডিটরের কাজ করতেন। শেখ মুজিবুর রহমানের তিন বছরের শাসনকালে জনাব শেখ ফজলুল হক মনির মত অনেকেই এরকম সামান্য অবস্থা থেকে অকল্পনীয় অর্থ-সম্পদের মালিক হতে পেরেছেন। অবশ্য তাদের বেশিরভাগেরই রাজনৈতিক উচ্চাকাংখা ছিলা না বলে টাকা-পয়সাকে এমন সুন্দর লাভজনকভাবে বিনিয়োগ করতে পারেননি। ওপরে বর্ণিত তিনটি বাংলা এবং তিনটি দৈনিকের প্রত্যেকটিই সরকার সমর্থন করে যেত। এই সমর্থন অনেক সময় এতো দাসোচিত এবং অমার্জিত রুপ গ্রহণ করত যে, রুচিবান মানুষদের পিড়িত না করে ছাড়ত না। এই সকল পত্রিকার সম্পাদক এবং সাংবাদিকেরা সরকারের সুনজরে পড়ার জন্য তোষামোদ এবং তোয়াজে কে কার চাইতে অধিকদুর যেতে পারেন সেজন্য রীতিমত প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন। যদিও সেসব লেখা পাঠ করে বিবমিষা ছাড়া নিরপেক্ষ পাঠকের মনে আর কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারত না।

রাজধানী ঢাকা থেকে তখন প্রকাশিত উল্লিখিত ছয়টি দৈনিক পত্রিকা ছাড়া আরো কয়েকটি পত্রিকা তখোনো ছিল। তার মধ্যে জনপ্রিয়তায় যেটি সবগুলোকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল, সে পত্রিকার নাম "দৈনিক ইত্তেফাক"। এই পত্রিকাটির সংগে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নানা উত্থান-পতন ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। আওয়ামী লীগের প্রথম সভাপতি মওলানা ভাসানী এই কাগজটির প্রতিষ্ঠাতা হলেও প্রখ্যাত সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন ওরফে মানিক মিয়া ছিলেন পত্রিকাটির মালিক এবং সম্পাদক। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রাতিম্বিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী তফাজ্জল হোসেন সাহেব নিজেও ছিলেন একজন আওয়ামী লীগার, শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ঘনিষ্ঠ সহচর এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁর পরামর্শ-বুদ্ধি-বিবেচনা আওয়ামী লীগ মহলে অপরিসীম মর্যাদা এবং গুরুত্বসহকারে গৃহীত হত। জন্মের শুরু থেকেই এই পত্রিকাটি আওয়ামী লীগকে দ্ব্যর্থহীন সমর্থন দান করে আসছিল। উনিশ শ' পয়ষট্টি সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর আওয়ামী লীগের ছয় দফা দাবিকে তৎকলীন পূর্ব পাকিস্তানে জনপ্রিয় করার পেছনে শেখ মুজিবুর রহমান যে ভুমিকা পালন করেছিলেন, "ইত্তেফাক" পত্রিকা এবং সম্পাদক তফাজ্জল হোসেনের অনন্য সাংবাদিকতার প্রতিভা তাঁর চাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেননি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন আন্দোলনের প্রতি জোরাল সমর্থন প্রকাশ করার অভিযোগে আই্য়ুব খান সরকারের গভর্নর মোনেম খান পত্রিকাটির প্রকাশ বন্দ্ধ করেছিলেন এবং ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছিলেন। উনিশ শ' উনসত্তর সালের আইয়ুব বিরোধী অভ্যুত্থানের সময়ে প্রবল জনমতের চাপে সাময়িক সরকারকে বাধ্য হয়ে এই পত্রিকাটির ওপর থেকে নিষিধাগ্জা প্রত্যহার করে নিতে হয়। "ইত্তেফাক" যেসব সময়ে আওয়ামী লীগকে অকুন্ঠ সমর্থন করে আসছিল ইত্তেফাকের ভুমিকাটি অতটা মর্যাদাবিবর্জিত ছিলনা। এই কাগজে মাঝে মাঝে গণতান্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নটি তুলে ধরার চেষ্টা করত। ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার ইত্যাদির সপক্ষে কখনো-সখনো, দু'চার কথা নরমে-গরমে সাহস করে লিখে বসত। "ইত্তেফাক" ছাড়া অপর প্রাচীন দৈনিক পত্রিকাটির নাম "আজাদ"। পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা, মুসলিম লীগের পুরোধা, কৃতবিদ্য পন্ডিত এবং এক সময়ের বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের নাম করা সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন এই প্রাচীনতম পত্রিকাটির প্রতিস্ঠাতা সরকার ঘেঁষা। বাংলাভাষা আন্দোলন ছাড়া তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং কেন্দ্রের মধ্যে স্বার্থ-সংস্লিষ্ট ব্যাপারে যখনই বিরোধ উপস্হিত হত সব সময়েই কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থন করত। মওলানা আকরম খাঁ যতদিন বেঁচে ছিলেন এই সুচিহ্নিত ভুমিকা "আজাদ" পত্রিকা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেছে। মাওলানা সাহেবের মৃত্যুর পর আজাদের প্রাক্তন ভুমিকার অনেক পরিবর্তন ঘটলেও পত্রিকা হিসেবে পূর্বের জনপ্রিয়তা হারিয়ে বসেছিল। পরিচালনার ত্রুটিই সম্ভবত এর মুখ্য কারণ। স্বাধীন বাংলাদেশে কোন রকমের ধারদেনা করে আজাদ পত্রিকার দিন চলছিল। সরকারের বিরোধিতা করার তো প্রশ্নই ওঠেনা। মাঝখানে একবার সরকার পত্রিকাটিকে নিয়েও গিয়েছিলেন।

মোজাফফর আহমদের বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির পত্রিকাটির নাম "সংবাদ"। এই কাগজে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ছাড়াও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি সমর্থন জ্জাপন করত। এই দুটি দলই যৌথভাবে ভারত থেকে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে কিম্বা বলা যায় তারও আগে থেকে অধিকাংশ বিষয়ে আওয়ামী লীগকে ছায়ার মত অনুসরন করে আসছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এই পার্থক্য কমতে কমতে একেবারে শুন্যের কোটায় এসে ঠেকেছিল। অধিকন্তু তিনদল মিলেমিশে একদল সৃষ্টির পরে একদলীয় সরকার পদ্ধতির মুখ্য নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের যাবতীয় কার্যকালাপের প্রতি সমর্থন যোগানো পত্রিকাটির একটি নৈতিক কর্তব্যও হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই পত্রিকাটিতেও সরকারি কার্যকলাপের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত হত। স্বাধীনতার পর "জনপদ" নামে আরেকটি বাংলা দৈনিক ঢাকা থেকে আত্মপ্রকাশ করে। আওয়ামী লীগের এককালীন সভাপতি এবং পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য জনাব কামরুজ্জামান ছিলেন পত্রিকাটির নেপথ্য মালিক। এটিও ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থক পত্রিকা। "দি পিপল" নামে একটি দৈনিক ইংরেজি পত্রিকা স্বাধীনতা সংগ্রামের কিছুকাল পূর্বে জন্মলাভ করেছিল। জনৈক উঠতি বাঙালী ধনী ছিলেন পত্রিকাটির স্বত্তাধিকারী। উনিশ শ' একাত্তর সালের মার্চর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আগুন লাগিয়ে কাগজটি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতে গাণ্দ্ধী শান্তি প্রতিষ্ঠানের অর্থানুকুল্যে কাগজটির পুন:প্রকাশ ঘটে। বাংলাদেশে পুনরায় কাগজটির প্রকাশ ঘটার পর থেকে সব সরকারকেই সমর্থন দান করেছিল। উনিশ শ' একাত্তর সালের পয়লা জানুয়ারি একবার মাত্র সরকারি গুলিবর্ষন করার প্রতিবাদ করে গরম খবর পরিবেশন করেছিল বলে প্রচন্ড হুমকির মুখে ভাল ছেলের মত সুর পাল্টাতে বাধ্য হয়।

উনিশ শ' পচাত্তর সালের শুরুর দিকে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক কার্যকলাপ একেবারে পুরোপুরি বন্দ্ধ ঘোষনার পরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সমর্থক পত্রিকা গণকন্ঠের প্রকাশ রুদ্ধ, সম্পাদক দেশের খ্যাতনামা কবি জনাব আল মাহমুদ কারারুদ্ধ এবং ছাপাখানায় তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। এর পূর্বেও "গণকন্ঠ" পত্রিকাটি বন্দ্ধ করার জন্য সরকার নানাধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। পত্রিকাটিতে সরকারি বিজ্জাপন দেয়া হত না, দুয়েকবার ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছে। আইনের ফ্যাঁকড়া তুলে মুদ্রণ এবং প্রকাশের পথে কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। মাঝখানে একবার বন্দ্ধও করে দেয়া হয়েছিল। সাংবাদিকদের সমবেত দাবির মুখে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেও রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ বন্ধ ঘোষনার সাথে সাথে প্রকাশ রহিত হয়ে গেল। গণকন্ঠের পিছু পিছু সরকার বিরোধী দলীয় ইংরেজি "সাপ্তাহিক ওয়েভ" এবং "হলিডে" কিছুদিন পর্যন্ত টিকে থাকে পরেছিল। পরে দুটোকেই বন্ধ করে দেয়া হয় এবং আপত্তিজনক সংবাদ পরিবেশনের দায়ে "হলিডে" সম্পাদক জনাব এনায়েতুল্লাহ খানকে জেলখানায় প্রেরণ করা হয়। জনাব আলী আশরাফ সম্পাদিত বাংলা "সাপ্তাহিক অভিমত" - এরও একই পরিণতি ঘটে।

বিরোধীদল তো ছিলই না। বিরোধীদলীয় পত্রপত্রিকাগুলোকেও নির্মমভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সরকার সমর্থক পত্রিকাসমুহ এবং সরকারের অন্য দুটো অংগদলের মুখপত্রগুলো প্রতিটি স্বৈরাচারী পদক্ষেপকে একেবারে নির্লজ্জভাবে অভিনন্দিত করে যাচ্ছিল। তথাপি শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসন কায়েম করার প্রাক্কালে বাংলাদেশে পত্র-পত্রিকার সংখ্যা একেবারে কমিয়ে এনে গণমতের বাহনগুলোর কর্তৃত্ব নির্ভরযোগ্য হস্তে অর্পণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র চারটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হবে ঠিক হল। দুটি বাংলা এবন দুটি ইংরেজি এবং এটাও ঠিক হল যে বাদ বাকি পত্রিকাসমুহ বন্ধ করে দেয়া হবে। "ইত্তেফাক" কাগজটিকে পুরোপুরিভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা হল। "ইত্তেফাক" ছাড়া অপর যে বাংলা কাগজটি বেঁচে থাকবে সেটির নাম "দৈনিক বাংলা"। ইংরেজি কাগজ দুটির নাম "বাংলাদেশ অবজারভার" এবং "বাংলাদেশ টাইমস"। এসব পত্রিকাগুলো একেবারে সরকারি পত্রিকা এবং সাংবাদিকেরা সরকারি কর্মচারীরুপে চিহ্নিত হবেন বলে ঘোষনা দেয়া হল।

একসংগে অনেকগুলো পত্রপত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে গোটা দেশের সাংবাদিকবৃন্দ এক ভয়াবহ সংকটে নিপতিত হন। এই নির্মম অর্তসংকটের দিনে সাংবাদিকেরা সবান্ধবে বেকার হয়ে পড়ার ফলে তাঁদের সামনে বেঁচে থাকার দ্বিতীয় কোন পন্থা উম্মুক্ত রইল না। যে চারটি পত্রিকা প্রকাশিত হবার সিদ্ধান্ত পাকাপাকি হয়ে গেছে, সেগুলোতে কোনো রকমে স্থান করে নেয়ার জন্য প্রতিটি সাংবাদিকই মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের কাছ থেকে এর চেয়ে ভিন্ন কোন আচরন আশাও করা বোধহয় সম্ভব ছিলনা। অবশ্য শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার তাঁদের কর্মসংস্থান করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতিও দান করেছিলেন এবং সরকার থেকে তাঁরা অল্প-স্বল্প মাইনেও পাচ্ছিলেন। এই অনিশ্চিত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সাংবাদিকদের মাথায় যে চিন্তাটা প্রথমে এসেছিল তাতে বাহ্যত দাসোচিত আত্মসমর্পন এবং সুবিধাবাদি চরিত্রের পরিচয় স্পষ্টতভাবে ফুটে উঠলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতির বিচারে তাই-ই ছিল একান্ত বাস্তব এবং যুক্তিসংগত। প্রতিটি আলাদা আলাদা পত্রিকার সাংবাদিকেরা ভাবলেন তারা আগেভাগে যদি সরকারি দলে যোগ দেয়ার আবেদনপত্রে সই দিয়ে বসেন, সরকার অনুকম্পা করে তাঁদের কথাটি বিবেচনা করে দেখবেন। এই ধরনের মনোভাবের বশবর্তী হয়ে যাবার বেশ কয়েকদিন পূর্বে "দৈনিক পূর্বদেশ" পত্রিকার সাংবাদিকবৃন্দ সদলবলে বাকশালের কেন্দ্রীয় দফতরে গমন করে সই করা আবেদনপত্রসমুহ জমা দিয়ে এসে মনে করলেন, যা্ক্ নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এই ঘটনার পর থেকে অন্যান্য চালু এবং বাতিল পত্রিকার কর্রমরত সাংবাদিকদেরও বোধদয় ঘটল। তাঁরা ভাবলেন, পূর্বদেশের সাংবাদিকদের মত তাঁরাও যেয়ে যদি বাকশালের সদস্যপদের আবেদনপত্রে সই না করেন, তাহলে তাদের চাকুরি হবে না এবং চালু পত্রিকায় কর্মরত থাকলে চাকুরিটি টিকবে না। সরকারি পত্রিকায় সরকারিদলের লোকদের কাজ পাবার নৈতিক দাবীই সবচেয়ে বেশী। তারপর থেকে সাংবাদিকেরা দিগ্বিদিক জ্ঙান হারিয়ে দল বেঁধে নিয়মিত বাকশাল অফিসে ধাওয়া করতে থাকলেন। প্রতিটি পত্রিকার সরকারসমর্থক সাংবাদিকেরা উদ্যোগী হয়ে সহযোগী এবং কলাকুশলীদের টেনে নিয়ে জাতীয় দলের অফিসে হাজিরা দিতে আরম্ভ করলেন। রাস্ট্রের তৃতীয় স্তম্ভ বলে কথিত সংবাদপত্রের কারিগরদের একাংশ পেশাগত মর্যাদা, স্বাধীনতাস্পৃহা, সত্য এবং ন্যায় - সাংবাদিকতাবৃত্তির সংগে সংস্লিষ্ট ইত্যাদি মহত অনুষংগসমুহ বাদ দিয়ে যে নাটকের অবতারনা করেছিলেন বাংলাদেশের সমাজে অনতিবিলম্বে তার প্রভাব অনুভুত হতে শুরু করে। অবশ্য সাংবাদিক মাত্রেই যে বাকশালে যোগ দেয়ার জন্য লালায়িত ছিলেন তেমন কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। চাপের মুখে বাকশাল সদস্যপদের আবেদনপত্রে সই করে একজন সাংবাদিককে আমি সত্যি সত্যি নিজের চোখে কাঁদতে দেখেছি। বেশ ক'জন সাংবাদিক ভয়ভীতি অগ্রাহ্য করে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার আদর্শ এবং নীতিতে অটল ছিলেন। "ইত্তেফাক" পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জনাব আসাফউদ্দৌলা রেজা আবেদনপত্রে সই করেননি। এই অভিযোগে সরকারি ব্যবস্থাপনায় "ইত্তেফাক" প্রকাশ পাওয়ার সময় তাঁর চাকরি চলে যায়।

বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের সভাপতি ঘোষনা করেছিলেন যে আমলা, কর্মরত সাংবাদিক, স্বায়ত্বশাসিত এবং আধা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমুহের কর্মচারীবৃন্দ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক যে কেউ বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের সদস্যপদের জন্য আবেদন করতে পারবেন। অবশ্য কাকে সদস্যপদ দেয়া হবে, কাকে হবে না, সেটি সম্পুর্নভাবে কর্তৃপক্ষের বিবেচনার বিষয়।

যে কেউ ইচ্ছে করলে সরকারি দলে যোগদান করতে পারবে, এটা ছিল সরকারি ঘোষনা। আসলে যোগ না দিলে কারো নিস্তার পাবার উপায় ছিলনা। ভেতরে ভেতরে সমস্ত সরকারি বেসরকারি দফতর স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পত্রিকার সাংবাদিক, লেখক, কবি, সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছিলেন যে, সবাইকে জাতীয়দলে যোগ দেয়ার আবেদনপত্রে সই করতে হবে। কতৃপক্ষ যাকে বিপজ্জনক মনে করেন সদস্যপদ দেবেন না, কিন্তু বাংলাদেশে বাস করে চাকুরি-বাকরি, ব্যাবসা-বানিজ্য করে বেঁচে-বর্তে থাকতে চাইলে জাতীয়দলের সদস্যপদের আবেদনপত্রে সই করতেই হবে। সর্বত্র বাকশালে যোগদান করার একটা হিড়িক পড়ে গেল। শেখ মুজিবুর রহমান যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে বাকশালের কেন্দ্রীয় দফতর উদ্বোধন করতে এলেন তাঁকে স্বাগত সম্ভাষন জ্জাপনের উদ্দেশ্যে গোটা দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, শ্রমিক, কৃষক সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে হাজির থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। সেদিন ছিল মুষলধারে বৃষ্টি। অবিরাম ধারাস্রোতে প্লাবিত হয়ে ভেজা কাকের মত সুদীর্ঘ মানুষের সারি কিভাবে রাস্তায় তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন, যাঁরা এ দৃশ্য দেখেছেন ভুলবেন না। মহিলাদের গাত্রবস্ত্র ভিজে শরীরের সংগে একশা হয়ে গিয়েছিল। এই সুবিশাল জনারন্যে আমাদের দেশের নারীকুলকে লজ্জা-শরম জলাঞ্জলি দিয়ে সশংকিতচিত্তে তাঁর আগমনের প্রতীক্ষা করতে হচ্ছিল।

নাগরিক জীবনের সর্বত্র একটা আতন্কের কৃষছায়া প্রসারিত করে আসছিল। এ ধরনের চিন্তা, বুদ্ধি এবং সাহসরোধী পরিবেশে যেখানে মানুষের বিচার-বুদ্ধি কাজ করে না, বেঁচে থাকা বলতে শুধু বোঝায় কোন রকমে পশু অস্তিত্বের সংরক্ষণ। নৈতিক সাহস, মানবিক মুল্যবোধ ইত্যাকার সুসভ্য জীবনের বোধগুলো বাংলাদেশে সর্বপ্রকারের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। সবখানে আতন্ক, উদ্বেগ। এ তো গেল একদিকের চিত্র। অন্যদিকে গ্রাম-বাংলার মানুষদের অবস্থা দুর্দশার শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দাম প্রতিদিন হু হু করে বাড়ছে। দেশে অভাব, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ক্ষুধার তাড়নায় মা সন্তান বিক্রি করছে। স্বামী স্ত্রীকে পরিত্যাগ করছে। বিনা কাফনে লাশ কবরে নামছে। সৎকারবিহীন অবস্থায় লাশ শৃগাল-কুকুরের আাহার্য হওয়ার জন্য পথে পথে পড়ে থাকছে। চারদিকে জ্বলন্ত বিভীষিকা, চারদিকে হা-অন্ন, হা-অন্ন রব। এই অন্নহীন বস্ত্রহীন মানুষের দংগল একমুঠো ভাত, এক ফোটা ফেনের আশায় ঢাকা শহরে এসে শহরের ফুটপাতে চিৎ হয়ে মরে থাকছে।

একদিকে উদ্ধত উলংগ স্বৈরাচার, অন্যদিকে নির্মম দারিদ্র, বুভুক্ষা এই দুইয়ের মাঝখানে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে অতি কষ্টে, অতি সন্তর্পনে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হচ্ছিল। অর্থনৈতিক অন্তর্দাহের আঁচ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতেও লেগেছে। অনেকগুলো পরিবার মাছ-মাংস স্পর্শ করা বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে। কোনো কোনো পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যারা দু'বেলা ভাত খেত দু'বেলা আাটা খেয়ে জীবন কাটাচ্ছে। আবার অনেক পরিবারের দু'বেলা আটাও জোটে না।

অথচ শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন ক্ষমতার সংগে যাঁরা যুক্ত তাঁদের সুযোগ-সুবিধের অন্ত নেই। তাঁদের হাতে টাকা, ক্ষমতা সবকিছু যেন স্বাভাবিক নিয়মে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। আইন তাঁদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধির সহায়, সরকারি আমলারা আ্জ্গাবহ মাত্র, সামাজিক সুনীতি, ন্যায়-অন্যায়, নিয়ম-কানুন কোন কিছুর পরোয়া না-করলেও তাঁদের চলে। উনিশ শ' একাত্তুর সালের যুদ্ধের পর থেকে এই শ্রেণীটি বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক নৈরাজ্যের থেকে প্রাণরস সংগ্রহ করে ডাঁটো হয়ে মাথা তুলছিল। ঢাকা শহরের প্রশস্ত রাজপথ থেকে শুরু করে সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিস্ঠান, ব্যাবসায়ীর আড়ত, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, রেডিও-টেলিভিশন, লেখক-সাহিত্যিকদের আড্ডা, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির এমনকি দূর-দুরান্তের পল্লীগ্রামের মহল্লায় মহল্লায় এই হঠাৎ জন্মানো নব্যনবাবদের সীমাহীন প্রতিপত্তি। এদের অনুমোদন ছাড়া মরণোম্মুখ রোগী এক ফোটা ওষুধ পেত না, শীতার্ত উলংগ অসহায় মানুষের পরনে রিলিফের একখানি বস্ত্র উঠত না, এক সের রেশনের চাল কি আটা বিলি হতে পারত না। বিধ্ধস্ত বাংলাদেশের জনগনের সাহায্যার্থে যে দেশ থেকেই সাহায্য আসুক না কেন এই শ্রণীটির দুষ্ট ক্ষুধার চাহিদা মিটাতে সবকিছু শেষ হয়ে যেত। এদের অনুমোদন ছাড়া কোন অফিসে একজন সামান্য পিয়নের নিয়োগপত্র পাওয়ার সম্ভাবণা ছিল না, যোগ্যতা যাই হোক না কেন। রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করানো যেত না। ছাত্রকে স্কুলে। বেবাক দেশের দশদিকে এরা ছড়িয়েছিল। আমলাদের মধ্যে, নিম্নশ্রেণীদের মধ্যে, শিক্ষকদের মধ্যে, গায়ক-শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে, কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে অন্তরীক্ষে অবস্থান করে একজন মাত্র মানুষ সবকিছুর সুতো ধরে রয়েছেন--তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীনতার তিন বছর সময়ের মধ্যে সার্বিক পরিস্থিতি এরকম হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বাংলাদেশ এবং শেখ মুজিব এ দুটো শব্দ পরস্পরের পরিপুরক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেখ মুজিব যদি বলতেন আমিই হলাম গিয়ে বাংলাদেশ, তাহলে তিনি এতটুকুও মিথ্যে বলতেন না। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দেশে ফিরে ক্ষমতার সিংহাসনে অধিষ্টিত হয়ে একে একে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর গলা টিপে ধরেছিলেন। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে তিনি নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছেন। তাদের ঘরবাড়ি ভূ-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছেন, পরিবার-পরিজনের ওপর সীমাহীন অত্যাচার চালিয়েছেন। তাদের কাউকে গ্রেফতার করে কারাগারের উদরে নিক্ষেপ করেছেন। দেদার নেতা এবং কর্মী হত্যা করেছে রক্ষীবাহিনী। বাংলাদেশের গ্রামে-গন্জে বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী দমন করার নামে সরল মানুষদের পাখির মত গুলি করে, গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। শেখ মুজিব বিরোধী কোন কিছুর আভাস পাওয়ামাত্রই রক্ষীবাহিনী আগ্নেয়াস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে ছুটে গেছে। সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে, ভেংগে-চুড়ে তছনছ লন্ড-ভন্ড করে দিয়েছে। পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির নেতা তিরিশ বছর বয়স্ক সিরাজ সিকদারকে নৃশংসভাবে হত্যা করিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান পরিষদ কক্ষে উল্লসিত উদ্ঘোষনায় ফেটে পড়ে বলেছিলেন, এখন কোথায় সিরাজ সিকদার? গ্রফতার, নির্যাতন এসব শেখ মুজিব প্রশাসনের একটা অ্ত্যন্ত উল্লেখযোগ্য দিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবদুল মতিন, আলাউদ্দিন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি মেজর জলিল, সম্পাদক আ.স.ম. আবদুর রব সহ অসংখ্য নেতা এবং কর্মী, জাতীয় লীগের অলি আহাদ অনেককেই তিনি কারাগারে প্রেরণ করেছিলেন। বিপ্লবী মতাদর্শী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীদের কথা বাদ দিয়েও তিনি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিকবোধ আস্থাশীল রাজনৈতিক দলগুলোর উপস্থিতিও বরদাশত করতে পারতেন না।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফেরার পর তিনি দেশের বিপর্যস্ত অবস্থার উন্নয়ন সাধনের জন্য সময়ে অসময়ে হুঙ্কার দেয়া ছাড়া কোনো বাস্তব কর্মপন্থা গ্রহণ করেননি। পক্ষান্তরে তার বিরোধীদের সমুলে বিনাশ করার এক সর্বনেশে খেলায় মেতে উঠেছেন। এমনকি সে বিরোধিতা নিজের দলের লোক থেকে এলেও এবং একান্ত ন্যায়সংগত হলেও তিনি সহ্য করেননি। দৃশ্যত বিরোধীদলবিহীন খোলা ময়দানের তিন তিনটি দলের সর্বময় কর্তা হওয়া স্বত্তেও তিনি নিশ্চিত বোধ করতে পারছিলেন না। তিনটি দলকে এক করে একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করে সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করে রাখার জন্য রাতারাতি প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি হয়ে বসলেন। সংবিধান বাতিল ঘোষনা করলেন। জাতীয় পরিষদের সদস্যদের সংগে বয়-বেয়ারাদের মত আচরন করলেন। উদারনৈতিক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী শেখ মুজিব গণতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ দলের পাটাতনে দাঁড়িয়েই একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরিসরে নিজেকে বাঙালি জাতির সংগ্রামী প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে নিতে পেরেছিলেন এবং বাঙালি জাতির মুক্তি-সংগ্রামের নায়করুপে সারাবিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তিন বছর যেতে না যেতেই আওয়ামী লীগ দলটির অস্তিত্ব বিলীন করে দিলেন। উনিশ শ' উনসত্তর সালের পর থেকে এ পর্যন্ত তাঁকে ভাগ্যদেবতা অযাচিতভাবে কৃপা করে আসছে। উনিশ শ' উনসত্তর সালে আইয়ুব বিরোধী অভ্যূথ্থানের ফলে আইয়ুব খানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা উঠিয়ে নিতে হয়। কারাগার থেকে তিনি বেরিয়ে আসেন বাঙালি জাতীর জনক এবং অদ্বিতীয় নেতা হিসেবে। তাঁর প্রতি জনগনের আস্থা ভালবাসা তাঁর মস্তকে হিমালয় পর্বতের চুড়োর মত উত্তুংগ মহিমায় বিভুষিত করেছে। গোটা জাতি তাঁর পেছনে। এর পূর্বে কোন বাঙালি নায়কের পেছনে মানুষ অকৃত্ত্রিম আস্থা এবং স্বত:স্ফুর্ট ভালাবাসা এমন করে বিলিয়ে দেয়নি। তার আগেও এরকমটি ঘটেছে বারবার। যে-কোন বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপ্লব, উপবিপ্লব শুরু হওয়ার পূর্বে শেখ মুজিব কোন যাদুমন্ত্র বলে কারাগারে ঢুকে পড়েছেন। ঘটনার নিয়মে ঘটনাটি ঘটে যাবার পর বিজয়ী বীরের মত শেখ সাহেব দৃপ্ত পদক্ষেপে প্রকাশ্য সূর্যালোকে বেরিয়ে এসে নেতার আসনটিতে বিনাদ্বিধায় বসে পড়েছেন। শেখ মুজিবকেই ঘটনাটির নায়ক বলে লোকে বিনাদ্বিধায় মেনে নিয়েছেন। তাঁর নিজের দলের মধ্যেও এ নিয়ে বোধকরি কোন প্রশ্ন কখনো উঠেনি। উনিশ শ' একাত্তর সালের পঁচিশে মার্চ তারিখে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে আপন বাসভবন থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং উনিশ শ' বাহাত্তর সালের দশই জানুয়ারি তারিখে বাংলাদেশে এসে এমন একটি আসন পেয়ে গেলেন, বাঙালি জাতির ইতিহাসে কোন মানুষ সে রকম মর্যাদা, ভালোবাসা এবং একছ্ত্র ক্ষমতার আসনে উপনিবেশ করতে পারেনি। তাঁর তেজ, বীর্য এবং বাক্যের মন্ত্রশক্তিতে বিস্ময়াবিষ্ট দেশবাসী বহুকাল পূর্বেই তাঁকে বংগবন্ধু এবং বাঙালি জাতির পিতা ইত্যাদি দুর্লভ সম্মানে ভূষিত করেছিলেন। শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার আসনে তো তিনি রাজচক্রবর্তী হিসেবে বহুকাল পূর্বে থেকেই আসীন ছিলেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে বাঙালি হৃদয়ের সিংহাসনের রাজা বাস্তবের সিংহাসনে আরোহন করলেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি তাঁর দু:শাসনে যতই বিপর্যয়ের শেষ সীমানায় নেমে আসুক-না কেন, বন্যা, মহামারী, চোরাচালানী, ছিনতাইকারী, টাউট, স্বজনতোষণকারীরা বাংলাদেশে যে অবর্ননীয় দু:খ-দুর্দশারই সৃষ্টি করুক-না কেন তাঁর গোচরেই সবকিছু ঘটে আসছিল। যৌবনবতী মেয়ে মানুষ তার প্রেমিককে যে রকম বিশ্বাস করে এবং ভালবাসে, বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে সেই অকৃত্তিম অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে উৎসারিত বিশ্বাস এবং ভালাবাসা দিয়েছিল। তিনি এলেন, প্রধানমন্ত্রী হলেন। নতুন সংবিধান রচনা করলেন, নির্বাচন ডাকলেন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর বছর না ঘুরে না-আসতেই প্রধানমন্ত্রীর পদ তাঁর হল না। তাঁরই নির্দেশে রচিত সংবিধানের বিধানগুলো আঁটোসাটো জামার মত ক্রমাগত তাঁর বিরক্তি উৎপাদন করছিল। তাই তিনি নিজ হাতে গড়া অনুশাসনের নিগড় ছিন্ন করে ফেললেন। সংবিধান বাতিল ঘোষনা করলেন। যে সংসদীয় গণতন্ত্রের বাঁধানো সড়ক বেয়ে আকাশস্পর্শী উচ্চকাঙ্খার নির্দেশে একটি সবল, স্বাস্থ্য এবং দরাজ কন্ঠস্বর মাত্র সম্বল করে এতদূর উর্ধ্বে আরোহন করেছেন সেই সংসদীয় গণতণ্ত্র শেখ মুজিবের হাতেই জখম হয়ে হয়ে লাশটি তাঁরই হাতে কবরস্থ হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিল। অবিলম্বে তিনি তাঁর কর্তব্যকর্ম সমাপন করলেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের লাশটি কবর দিলেন। একদলীয় সরকারের রা্স্ট্টপতি হিসেবে নতুন পরিচয়ে তিনি নিজেকে পরিচিত করলেন। শেখ মুজিব যা করেন সব নিঁখুত। ইতিহাসের সংগোপন আকান্খা তাঁর প্রতি কর্মে অভিব্যক্তি লাভ করে। এ হচ্চে তাঁর পরিষদের ধারণা। কথাটি তিনিও আপনদল এবং বন্ধুদলের মানুষদের কাছ থেকে এতবেশি শুনেছেন যে নিজেও প্রায় অতিমানব বলে বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন। তিনিও মনে করতে আরম্ভ করলেন, যা কিছু হও বলবেন, অমনি হয়ে যাবে। এ যেন শেক্সপীয়রের নাটকের নায়ক জুলিয়াস সিজার। আকাশের জ্যোতিস্কমন্ডল বারেবারে শুভ-সংকেত বয়ে নিয়ে আসে।

শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রে সীজারের বীরত্ব এবং গুনাগুন বর্তমান ছিল কিনা বিচার করবেন আগামীদিনের এৈতিহাসিক। তবে একথা সত্য যে, পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশ বাংলাদেশে তিনি যা পয়েছেন, যা আদায় করেছেন, অনুরুপ ভাগ্য কোন রোমান সীজারের কোনদিন হয়নি।

সব শক্তিদর্পী মানুষের যেমন হয়ে থাকে তেমনি শেখ মুজিবর রহমানের মনে কিছু নিরীহ বস্তু না পাওয়ার ক্ষোভ বারবার তাঁর অন্তর্লোককে পীড়ন করেছে। শক্তিদর্পী মানুষেরাও চায় মানুষ তাদের ভালাবাসুক বন্ধুর মত, আবার যমের মত ভয় করুক। আকাশের দেবতাকে যে রকম ভীতিমিশ্রিত ভালবাসা দিয়ে বিচার করে, শেখ মুজিবুর রহমানের মনেও অবিকল সে রকম একটি বাসনার উদয় হয়েছিল।

তিনি বিলক্ষন জানতেন, পান্ডিত্যাভিমানী শিক্ষিত সমাজের মানুষ তাঁকে অন্তর থেকে অবজ্গা করেন। এই শ্রেণীটির চরিত্রের খাঁজগুলো সম্বন্ধে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন। উনিশ শ' উনসত্তর সালের পূর্ব পর্যন্ত এই শ্রেনীর লোকেরা তাঁকে বাগাড়ম্বর সর্বস্ব অমার্জিত হামবগ ছাড়া কিছু মনে করতেন না, তা তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। বিভিন্ন বিবৃতি, বক্তৃতা, ঘরোয়া বৈঠক এবং আলাপ-আলোচনায় এঁদের প্রতি প্রচ্ছন্ন ঘৃণা এবং বিরক্তি তিনি কুন্ঠাহীনভাবে ব্যক্ত করেছেন। তা সত্তে্ও উচ্চশিক্ষিত আমলা, লেখক-সাহিত্যিক এবং শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক এবং সম্ভ্রন্ত সমাজের একাংশ তাঁকে বংগবন্ধু বলে যে সম্বোধন কেন করতেন শেখ মুজিব তা বুঝতেন এবং তা তাঁর ক্ষমতার স্বাভাবিক প্রাপ্য হিসাবেই গ্রহণ করতেন। তাছাড়া বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি বলে কথিত শ্রেণীটির হীনমন্যতাবোধ এবং চারিত্রিক দাসত্ব অনেকটা প্রবাদের সামিল। যে-কোন নতুন শাসক এলেই সকলে মিলে তাঁর গুণপনা বাখান করা এখানকার বহুদিনের একটা প্রচলিত প্রথা। কচিত কদাচিত ব্যতিক্রমী কন্ঠ শোনা যায়। এর কারণ নিশ্চয়ই বাংলাদেশের সমাজ শরীরের মধ্যে সংক্ষুপ্ত আছে।

শক্তিদর্পী মানুষেরাও যে শেষ পর্যন্ত একেকটা দিকে কাঙাল থেকে যান শেখ মুজিবের মধ্যেও তার পরিচয় পাওয়া যায়। যে বস্তুটি সহজভাবে পাওয়া যায় না তাকে ভেঙে ফেলার জন্য এঁদের অনেক সময় নিয়মমত খাওয়া-শোয়ার ব্যাঘাত ঘটতে থাকে। তাঁর আসন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের ঘটনাটিকেও এ পর্যায়ে ফেলা যায়। যদিও তিনি দেশের একচ্ছত্র অধিপতি তথাপি তাঁর কানের কাছে অনেক উচ্চকন্ঠ চিৎকার করেছে, বাচাল ও অর্বাচীনেরা অনেক বৃথা লিখেছে, কিন্তু পন্ডিতরা বরাবর নিশ্চুপ থেকেছেন। এই অর্থবোধক নিশ্চয়তা তাঁর বুকে শেলের মত বেজেছে। সেজন্যই তাঁর অত ঘটা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা। যে লোকেরা সহজভাবে তাঁকে স্বীকার করে নেয়নি, তাঁদেরকে তাঁর মহিমা বুঝিয়ে দেয়ার জন্যই বিশ্ববিদ্যলয়ে আসছেন। নইলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে শেখ মুজিব সকাল-সন্ধে ভাঙা কাপে চা খেয়েছেন, সেখানে আাসার জন্য সাড়ে সাত লক্ষ টাকা ব্যয় করার কি প্রয়োজন থাকতে পারে? বিশষত বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রের পয়সার অভাবে সকাল বেলার টিফিন জোটে না।

তাছাড়া আরেকটি কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা তাঁর জন্য অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। যতই তিনি জনগনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন ততই তাঁর চরিত্রের স্বৈরাচারী লক্ষণসমুহ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। ক্ষমতার নির্মম একাকীত্ব তাঁকে নিশ্চয়ই বুঝিয়ে দিয়েছিল যে গণতণ্রের ধারাস্রোতে বাহিত হয়ে তিনি এসেছিলেন, তাতে তাঁর পুনরায় অবগাহন করার কোন উপায় নেই। কেননা এই তিন বছরে শরীর অনেক ভারী হয়ে গিয়েছে এবং সাঁতারও প্রায় ভুলে গিয়েছেন। যদি তাঁকে একজন মানুষ হিসেবেই বেঁচে থাকতে হবে - জনতাই তাঁর শাসনের বিষয়বস্তু। তিনি রাজা এঁরা প্রজা। এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি মনে মনে সাংঘাতিক রকম অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন। সংবিধান, জাতীয় পরিষদ, পরিষদের সদস্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি বলতেন, তিনি জনগনকে ভালবাসেন এটা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস আর জনগন তাঁকে দেখতে ভিড় করতেন, তাঁর বক্তৃতা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, তাঁর কথায় হাত উঠাতেন এটা জনগনের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা শুনে এবং কথায় কথায় হাত উঠিয়ে অভ্যস্ত। আসলে জনগন অনেকদিন থেকেই তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। কারণ বাংলাদেশের যে দুর্দশা বন্যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি ধরে নিয়েও বলা যায় তার আশি ভাগই মানুষের সৃষ্টি এবং তাঁর জন্য মুখ্যত দায়ী তাঁর পরিচালিত তৎকালীন সরকার। গ্রামের সরল মানুষকে, অনাহারক্লিষ্টা বিধবাকে আমি নিজের কানে তাদের তাবৎ অভাব অভিযোগের জন্য দায়ী করে অভিস্পাতের বাণী উচ্চারণ করতে শুনেছি। তিনি যে ধীরে ধীরে স্বখ্যাত সলিলে ডুবে যাচ্ছেন খুবই টের পাচ্ছিলেন। জনগনের রুদ্ররোষ কি বস্তু উপলব্ধি করতে সময় লাগেনি। এই জনগনই আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করিয়ে শেখ মুজিবকে আইয়ুব খানের কারাগার থেকে মুক্তমানব হিসেবে প্রসন্ন দিবালোকে বের করে এনেছে। উনিশ শ' একাত্তর সালের মার্চ মাসের দিনগুলোতে জনগনের সংগবদ্ধ শক্তির গভীরতা, তীব্রতা কতদূর হতে পারে, বাঁধভাঙা বন্যার স্রোতের মত রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক জীবনে কি অঘটন ঘটিয়ে তুলতে পারে সে জ্ঞান তিনি হাতে কলমেই লাভ করেছেন। তাই তিনি ক্রমাগতভাবে জনগনের ক্ষোভ আক্রোশ প্রকাশ করার পন্থা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমুহের মুখে বালির বাঁধ রচনা করে যাচ্ছিলেন। তাই তিনি তিনদল ভেঙে একদল করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী থেকে সরাসরি একনায়ক সেজে বসেছেন।

তিনদিন ভেঙে একদল করার পর তাঁর হাতে প্রভুত ক্ষমতা সঞ্চিত হয়েছিল বটে, কিন্তু তিনি রাজনৈতিকভাবে সম্পুর্ণ গরঠিকানার মানুষ হয়ে পড়েছিলেন। সম্মিলিতভাবে তিনি তিনদলেরই কর্তা, কিন্তু আসলে কোন দলেরই কেউ নন। এই ঠিকানাহীনতা তাঁকে একনায়কতন্রের দিকে আরো জোরে ঠেলে দিচ্ছিল। জনগন মন অধিনায়ক নেতার পক্ষে একনায়ক পরিচয়ের পথে রাজার পরিচয় আরো প্রীতিপদ এবং সম্মানের। বিশেষত তিনি দেশ এবং বিদেশের সামনে প্রমাণ যখন করতে পেরেছেন, তিনি চাননি তবু জনগন তাঁকে রাজার আসনে বসিয়েছে। এই রাজকীয় পরিচয়টা দেশের মানুষের মনে ভালভাবে দাগ কাটে মত বসিয়ে দেয়ার জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করে যাচ্ছেন। একদলীয় শাসন কায়েম করেছেন, জাঁকালো রাষ্ট্রপতি হয়ে বসেছেন, উপবেশনের সুবিধার জন্য দিনাজপুরের মহারাজার সিংহাসনটা আনিয়ে নিয়েছেন। ব্রিটিশ আমলের ঘূণে ধরা প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করেছেন। পূর্বের জেলা এবং বিভাগগুলোর সীমানা চিহ্ন মুছে দিয়ে গোটা দেশেকে একষট্টিটি নতুন প্রশাসনিক এলাকা তথা জেলায় বিভক্ত করে, প্রতি জেলার জন্য একজন করে গভর্নরও দান মনোনয়ন দান করেছেন। জেলা প্রশাসনের সংগে সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসনের সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। গভর্নররা যাতে সর্বেসর্বা হয়ে বসতে না পারে সেজন্য বৈরী গ্রুপ থেকে একেকজন বাকশাল সাধারন সম্পাদককে মনোনয়ন দান করা হয়েছে। শাসনব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢালাই করার নামে আইয়ুবের মত শেখ মুজিবও তাঁর সিংহাসনে থাকার পথটি পাকাপোক্ত করেছেন। আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের মৌলিক বস্তুটির সংগে জনগনের চাক্ষুষ পরিচয় ঘটেছে। মুজিবের মৌলিক বস্তুটিরও প্রয়োজনীয়তা কতদূর ছিল আগামীদিনের প্রশাসনবিদরা বিচার-বিবেচনা করে দেখবেন। আমার বক্তব্য হল, আইয়ুব সরকার এবং মুজিব সরকার নিজেদের ক্ষমতায় অটুট থাকবার জন্য উদ্ভাবিত পথটিকেই শাসনতান্ত্রিক বিপ্লব বলে আখ্যা দিয়েছেন। জেলাসমুহের গভর্নর এবং বাকশালের সাধারন সম্পাদক নিযুক্ত করার ব্যাপারেও শেখ সাহেব রাজকীয় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশের শাসক নেতৃশ্রণীতে যত ধরনের চাপ প্রয়োগক্ষম গ্রুপ রয়েছে, সব গ্রুপ থেকে প্রতিনিধি গ্রহন করেছেন - রাজনৈতিক দল ও ন্যাপ থেকে, আমলাদের থেকে, আইনজীবী শ্রেণী থেকে, সেনাবাহিনী থেকে, আনুপাতিকহারে গভর্নর ও সম্পাদক নিয়েগ করার পেছনের কারণ ছিল সার্বিকভাবে গোটা শাসক নেতৃশ্রণীটার কাছে তাঁর শাসনটা গ্রহণযোগ্য করে তোলা।

ব্যবহারিক দিক দিয়েও তিনি রাজার মতই আচরন করে যাচ্ছিলেন। তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দের কেউ তাঁর সামনে টু-শব্দটি উচ্চারণ করতে সাহস পেতেন না। তাঁকে বুদ্ধি পরামর্শ দিতে পারে মত কেউ ছিলেন না। তিনি যদি কখনো মন্ত্রিসভার সদস্যদের ডাকার প্রয়োজন মনে করতেন, ডাকতেন। এ কারণে যে তাঁর নিজস্ব পরিবারটিকে কেন্দ্র করে একটি রাজপরিবারের ছবি ক্রমশ লক্ষ্যগোচর হয়ে উঠেছিল। তাঁর ছেলে, তাঁর ভাগ্নে, ভগ্নিপতি, ভাই সকলে সত্যি সত্যি দুধের সরের মত বাংলাদেশের শাসকশ্রণীর পুরোভাগে ভেসে উঠেছিলেন। বাকি ছিল রাজমুকুটটা মস্তকে ধারণ করা এবং রাজউত্তরীয়খানি অঙে চড়িয়ে দেয়া। এই জন্যই তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। নেপোলিয়নের মত বিশ্ববিখ্যাত বীরযোদ্ধাও হাতে প্রভূত ক্ষমতা থাকা স্বত্ত্বেও রাজমুকুটটি নিজে নিজে পরে বসেননি। রোম থেকে পোপকে আসতে হয়েছিল। এই সমস্ত শক্তিধর মানুষেরা শক্তি দিয়ে সব কাজ করো আনলেও শেষের কাজটি করাবার জন্য এমন কাউকে খোঁজ করে আনেন, যাঁর প্রতি মানবসাধারণের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা রয়েছে এবং যা ঐতিহ্যসম্মত।

নেপোলিয়নের যুগ গেছে, পোপের যুগ গেছে। কিন্তু মানুষের অন্তরের আগুন সে রকম আছে। উচ্চাকাঙ্খা উদ্ধত হয়ে এখনো আকাশ ফুঁড়ে ফেলতে চায়। তাই শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছেন। একক হাতে বেবাক ক্ষমতা তুলে নেয়ার স্বপক্ষে সাসস্বত সমাজের রায় গ্রহণ করবেন। তাছাড়া আরেকটি গোপন অভিলাষ তাঁর মনের কোনে থাকাও বিচিত্র কি। উচ্চশক্ষাভিমানী পন্ডিতম্মন্য লোকেরা যাঁদের তিনি মনে মনে অপরিসীম তাচ্ছিল্য করেন, তাঁরা সকলে একযোগে এসে তাঁর বিরাটত্ব ও মহত্তের সামনে দন্ডবত হবেন। একজন শিক্ষকও যাতে অনুপস্থিত না-থাকতে পারেন এবং একজনও যাতে অর্থহীন নীরিহ একগুঁয়েমীকে আশ্রয় করে কাগুজে বীর হিসেবে পরিচিত না-হতে পারেন আগেভাগে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ সরকারসমর্থক ছাত্রদের যাবতীয় দুর্নীতির আখড়াতে পরিনত হয়েছিল। পাকিস্তানি শাসনামলে সামরিক সরকারের আরোপিত হাজারো বাধা-বিঘ্ন অগ্রাহ্য করে বাঙালি মনীষা পাথরের ভেতর দিয়ে পথ কেটে একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পানে অগ্রসর হচ্ছিল। কি সংস্কৃতি চর্চায়, কি রাজনৈতিক চেতনার বিকাশে, কি মননশীলতার লাবণ্য সঞ্চারে পাকিস্তান আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে ভুমিকা পালন করেছে তা বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। বাংলাভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ, বাংলার জাতীয় জাগরনের প্রথম আন্দোলন, উনিশ শ' উনসত্তরের আইয়ুব বিরোধী বিক্ষোভ, একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধ এ সকল জাতীয় জীবনে অপরিসীম প্রভাববিস্তারী ঘটনাগুলো ঘটিয়ে তোলার উদ্যোগপর্বে নেতৃত্বদান করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উন্নয়নশীল দেশসমুহের রাজনীতিতে ছাত্ররা অনিবার্যভাবে কোন্ ভুমিকা পালন করে থাকেন শেখ মুজিব তা জানতেন। তিনি নিজেও এরকম ছাত্র আন্দোলনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তাই তাঁকে শুরু থেকেই ছাত্রদের কঠোর নিয়ন্ত্রনে রাখার বিষয়টি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে ভাবতে হয়েছে।

তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করার কিছুদিন পরই দেখেছেন যে, যে ছা্ত্রপ্রতিষ্ঠানটির পেশল সমর্থন তাঁর একমাত্র রাজনৈতিক মুলধন ছিল সেই ছাত্রলীগকে চোখের সামনে দু'টুকরো হয়ে যেতে, তাঁর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়া, ছাত্রলীগের অপরাংশের সক্রিয় সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে অপর একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেখে তাঁকে নিশ্চয়ই হতবাক করে থাকবে। উনিশ শ' তিয়াত্তর সালের পয়লা জানুয়ারির ঘটনা। ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিবাদ করে বাংলাদেশের ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যকেন্দ্রের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে পুলিশ বিক্ষোভকারী ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষন করে। ফলে একজন ছাত্র ঘটনাস্থলে নিহত হয়, কয়েকজন মারাত্বকভাবে আহত হয়। তার প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়ন সমস্ত ঢাকা শহরে প্রতিবাদ সভা এবং মিছিলের আয়োজন করে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকারী আখ্যায় ভুষিত করে। সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চালিত 'ন্যাপ' এবং 'বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি'র সমর্থক ইউনিয়নের দখলে ছিল। তাঁর এই গুলিবর্ষনের প্রতিবাদস্বরুপ বিক্ষুদ্ধ ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা ছাত্রসংসদের খাতায় যে পৃষ্ঠাটিতে শেখ মুজিবুর রহমান কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের আজীবন সদস্য হিসেবে সাক্ষর করেছিলেন সেই পৃষ্ঠাটিকে ছিড়েঁ ফেলে। অথচ এই ছাত্র ইউনিয়নই পদে পদে শেখ মুজিবুর রহমানকে তাদের মূল রাজনৈতিক দলদু'টোর মত অন্ধভাবে সমর্থনদান করে যাচ্ছিল। নিজের সমর্থক ছাত্ররা যখন এ অভাবনীয় কান্ড ঘটিয়ে তুলতে পারে, বিরোধীদলীয় ছাত্ররা যে প্রতিবাদে কতদূর মারমুখী হতে পারে, একটি সম্যক ধারণা তাঁর হয়েছিল। তাঈ শক্তহাতে বিশ্ববিদ্যালয়সমুহ বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় এবং ছাত্রসমাজকে নিয়ন্ত্রনে রাখার সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেছিলেন।

উনিশ শ' বাহাত্তর সালের পর থেকে প্রকৃত প্রস্তাবে চার পাঁচজন ছাত্রই স্টেনগান হাতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ চালাত। উপাচার্যবৃন্দ এই অস্ত্রধারী ছাত্রদের কথাতে উঠতেন, বসতেন। স্বাধীনতার পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুক্তির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল, কিন্তু স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যলয়ের বেবাক পরিবেশটাকেই কলুষিত করে তোলা হল। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন চিন্তা, কল্পনা, নিরপেক্ষ গবেষনার পথ একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। সরকার সমর্থক ছাত্ররা প্রকাশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করত। দরকারবোধে তারা এগুলো ব্যবহার করতে কোন রকম কুন্ঠা বা সংকোচবোধ করত না। বর্তমানে ঢাকা জেলার জেলা জজের কোর্টে একটি লোমহর্ষক হত্যা মামলার বিচার চলছে। সরকার সমর্থক দু'দল ছাত্রের মধ্যে মতামতের গরমিল হওয়ায় অবাধে রাতের বেলা অগ্নেয়াস্ত্র ব্যাবহার করে সাতজন সতীর্থকে হত্যা করেছে। আজ থেকে প্রায় একবছর পূর্বে হাজী মুহম্মদ মহসীন ছাত্রাবাসের টিভি কক্ষের সামনেই এই শোকাবহ ঘটনা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারসমর্থক ছাত্ররাই যখন মতামতের গড়মিলের জন্য স্বদলীয় ছাত্রের হাতে এভাবে বেঘোরে প্রাণ হারাতে পারে, সাধারণ ছাত্র এবং শিক্ষকদের অবস্থা কি হতে পারে সহজেই অনুমান করা যায়। সরকারসমর্থক ছাত্রের মত শিক্ষকদেরও একটি বিশেষ অসুবিধা হবার কথা নয়। এঁদের অনেকে পুর্ব থেকে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর সেবা করে আসছেন। সুতরাং এই নতুন শাসনামলেও তাঁরা বস্তু-সম্পদের দিক দিয়ে কিঞ্চিত লাভবান হওয়ার সাধনা করে যাচ্ছিলেন এবং নানাভাবে সরকারসমর্থক ছাত্ররা সক্রিয় সহায়তা দান করে যা্চ্ছিলেন। আর সরকার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে অপর কোন মতামত এবং প্রতিষ্ঠান যাতে মাথা তুলতে না-পারে সেজন্য সম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা করে আসছিল। বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারি মতামতের লালনক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে যেয়ে এমন একটা অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হল, যার সংগে অধিকাংশ শিক্ষক এবং ছাত্র মিলিয়ে নিতে পারলেন না। শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তা এবং রাষ্ট্রশাসন পদ্ধতিকে মুজিববাদ আখ্যা দিয়ে, তার প্রচার, প্রসার এবং বাস্তবায়নের জন্য সরকারসমর্থক ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়সমুহে এমন একটা সুসংগঠিত অভিযান পরিচালনা করলেন, কোন স্বাধীনচেতা, ন্যায়বান ছাত্র কিংবা শিক্ষক তার সংগে অন্তরের সামান্য সংযোগও অনুভব করতে পারলেন না। এই না-পারার কারণেই সৎ এবং ন্যায়পরায়ন শিক্ষকরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। তাঁরা অপরিসীম মানসিক উৎকন্ঠা নিয়ে শঙ্কা, ত্রাস এবং ভীতির মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হলেন। অতি শিগ্গির গোটা দেশের তাবত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই মুজিববাদী ছাত্রদের এবং তাঁদের পেছন বুদ্ধি-পরামর্শ যোগানো শিক্ষকদের প্রভাব ঘুর্ণিহাওয়ার মত অপ্রতিরোধ্য বেগে ছড়িয়ে পড়ল।

যে সমস্ত শিক্ষক চরিত্র এবং বিদ্যাবত্তার জন্য ছাত্রদের মধ্যে শ্রদ্ধা এবং সম্মানের আসনে অধিষ্টিত ছিলেন মুশকিল হল তাঁদেরই। তাঁরা তাঁদের পরিবারবর্গ নিয়ে নিতান্ত ভয়ে ভয়েই দিবস রজনী অতিবাহিত করতেন। যে-কোন সময়, যে কোন বিবাদ এসে ঘাড়ে আশ্রয় করতে পারে। সে সময় আমি নিজে বিশ্ববিদ্যালয় কম্পাউন্ডে বাস করেছি। এই সন্ত্রাসজনক পরিস্থিতির ভয়াবহতা কিছু কিছু অনুভব করেছি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার দু'বছর পরেও দেখেছি শিক্ষকরা ফ্ল্যাটে বাইরের দিক থেকে তালা লাগিয়ে রাখতেন। কোন অচেনা লোক খোঁজ-খবর করতে গেলে বাড়ির লোকেরা জবাব দিতেন, তিনি বাসায় নেই।

যে মুষ্টিমেয় ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছু শক্তহাতে নিয়ন্ত্রন করত সংখ্যায় ছিল তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনরত মোট ছাত্রছাত্রীর এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। সরকারি পুলিশ সব সময়ে তাদের সাহায্যে মোতায়েন থাকত। ছাত্রাবাসের ভোজনক্ষে খাওয়ার জন্য তাদের কোনো অর্থ দিতে হত না। অধিকন্তু মন্বন্তরের সময় ছাত্রাবাসের প্রভোস্ট এবং হাউজ টিউটররে সংগে মিলেমিশে রেশনে পাওয়া চাল, ডাল কালোবাজারে বেচে দিয়ে প্রচুর অর্থ আত্নস্যাত করার সুযোগ তারা পেত। তাছাড়াও সরকারদলীয় লোকদের মধ্যে ব্যাবসা-বাণিজ্য, চাকুরি-বাকরি বন্টন করার বরাদ্দ সুযোগগুলো তো ছিলই।

বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজের ছাত্রসংসদসমূহের নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করত, ভীতি এবং ত্রাসসৃষ্টি করে ছাত্র সাধারণের কাছ থেকে ভোট আদায়ের চেষ্টা করত। তারপরেও যখন দেখা যেত নির্বাচনে তারা শতকরা বিশটি ভোটও লাভ করতে পারেনি এবং পরাজয় অবধারিত, রাতের বেলা আলো নিভিয়ে ভোটের বা্ক্সগুলো লুট করে নিয়ে যেত। তাদের অনুমোদন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্রভর্তি হতে পারত না, ছাত্রাবাসসমূহে থাকবার জায়গা পেত না। শিক্ষকদের নিয়োগ বরখাস্ত অনেকটা তাদের খেয়াল-খুশির উপর নির্ভরশীল ছিল।

শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর একদলীয় শাসন চালু করে দেশে যে নতুন শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতি চালু করার কথা ঘোষনা করেছিলেন, তাতে বিশ্ববিদ্যলয়গুলোকেও ক্ষমতার অংশভোগী করে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক শ' পনেরজন সদস্যের মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যত্রয় এবং বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালিকা ও বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষাকে স্থান দিয়েছিলেন। জাতীয়দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের স্থান দিয়ে সরাসরি বিধিবদ্ধভাবে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে সরকারি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসার আয়োজন সম্পুর্ণ করলেন। অর্থাৎ এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ঘোরপ্যাচ ব্যাতিরেকে প্রত্যক্ষভাবে সরকারি শাসন বলবত করা হবে। পূর্বেকার সরকারসমূহ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃত্ব করতেন বটে, কিন্তু সে পন্থাটি ছিল সম্পুর্ণ স্বাধীন, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। সরকার প্রশাসন কিংবা পরিচালনায় প্রকাশ্যত কোন হস্তক্ষেপ করতেন না। শেখ মুজিবই প্রথম যিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষমতার অংশীদার করলেন। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আলাদা অস্তিত্ব, আলাদা আইন-কানুন এগুলোকে তিনি ক্রমে ক্রমে ভেঙে নতুন করে সাজিয়ে, তার মধ্যে সরকারি বিরোধীতার বীজকে উপরে ফেলতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, যে আধুনিক শিক্ষাভিমানী পন্ডিত সমাজ তাঁকে অবগ্জ্জা করেন, তাঁদের অন্তরলালিত অহন্কার চূর্ণ করতে পারবেন। নতুন পদ্ধতিটা এমনভাবে রচনা করা হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পন্ডিতদেরও তাঁর আাওতার বাইরে থাকার উপায় নেই এবং শেখ মুজিবুর রহমানরে সিংহাসনের পেছনে না দাঁড়িয়ে তাঁদের গত্যান্তর থাকবে না। তৃতী্য়ত, বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের হাতের মুঠোতে পুরে তিনি দেশের মানুষ এবং বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করত পারবেন যে তিনি মন্দ অর্থে একনায়ক নন। দেশের কৃষকসমাজ থেকে শুরু করে সারস্বত্ব সমাজ পর্যন্ত তাঁকে এত অনুরোধ উপরোধ করেছেন যে, বাধ্য হয়েই তিনি দেশের কল্যান চান এবং বাংলার মানুষকে ভালবাসেন। সমস্ত দেশের মানুষের সমবেত প্রার্থনা তিনি অগ্রাহ্য করতে পারেননি।

তাঁর দিক থেকে শেখ মুজিবুর রহমান ভূল চিন্তা করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্ষমতার অংশ দেয়ার সংগে সংগেই এক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রবীণ উপাচার্য এক পত্রিকার প্রতিনিধির সংগে সাক্ষাতকারে বলেই বসলেন যে শেখ মুজিবুর রহমানের মত এমন একজন বলিষ্ঠ নেতা হাজার বছরে জন্মগ্রহন করেননি। শেখ মুজিবুর রহমান যে বলিষ্ঠ নেতা সে বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি তা প্রকাশ করার জন্য এই সময়কে বেছে নিয়েছিলেন কেন তা অনেকের কাছেই খুব তাৎপর্যপূর্ণবহ মনে হয়েছে। বাস্তবেও তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের নিয়ে কর্মচারীদের কেন্দ্রীয়দলে যোগদানের আবেদনপত্রসহ তাঁদের নিয়ে রাষ্ট্রপতির সংগে দেখা করে আসলেন। সেই ছবি কাগজে ফলাও করে প্রকাশিত হল।

এই উপাচার্য ভদ্রলোককে দেশের মানুষ আত্নমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে জানতেন। অতটুকু দাস্যতা তাঁর কাছ থেকে কেউ প্রত্যাশা করেননি। তাঁর এ ধরনের কার্যকলাপের দু'রকম প্রতিক্রিয়া হল। তাঁর মত লোকের পক্ষে তথাকথিত জাতীয়দলের এ ধরনের কান্ডজ্গ্জানহীন তোষামোদ দেখে জ্ঞানীগুণী সমাজের একাংশ চিন্তিত হয়ে উঠলেন, আরেক অংশের প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে এল। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির সংগে তাঁর দহরম মহরম অন্যান্য উপাচার্য এবং সরকারসমর্থক শিক্ষা-সংস্কৃতির সংগে সংযুক্ত নেতৃ্শ্রনীর মনে ঈর্ষার উদ্রেক করেছিল তাতে সন্দেহ নেই। তিনি যদি রাষ্ট্রপতির সংগে অতবেশী মাখামাখি করার সুযোগ আদায় করে ফেলেন, অন্যান্যদের সুযোগ-সুবিধে মাঠে মারা যাবার সম্ভাবনা। তাই অন্যান্যরাও উঠে পড়ে লাগলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক আবুল ফজল ছাড়া আর সকল উপাচার্যই নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং শিক্ষকদের জাতীয়দলে যোগ দেয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছিলেন। এ ব্যাপারে সরকার সমর্থক ছাত্রদল উপাচার্যদের সহায়তা দিয়ে আসছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয়দলে যোগদান করার জন্য যে জয়ভীতি এবং নানামুখী চাপরে সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তা আমি খুব কাছে থেকে নিজের চোখে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছি। প্রতিটি অধ্যক্ষ বিভাগীয় শিক্ষকদের মধ্যে আবেদনপত্র বিলি করেছিলেন এবং সরকারি প্ররোচনায় তরুণতর শিক্ষকদের সই করতে অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য করেছিলেন। অনেক শিক্ষকই স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে সই করতে চাননি। কিন্তু হুমকি, ভীতি এবং চাপের মুখে তাঁদের বেশীরভাগই আত্নসমর্পন করতে বাধ্য হলেন। যে সকল শিক্ষক সই করেননি, তাঁদের নাম বাকশাল কেন্দ্রীয় অফিসে পাঠিয়ে দেয়া হল। সরকারসমর্থক ছাত্রদল এই বিদ্রোহী শিক্ষকদের দেশদ্রোহী হিসেবে খুব শিগগির ধরে নেয়া হবে বলে হুমকি দিয়ে গুজব ছড়াতে শুরু করল। এই জোর-জুলুম, ভয়-ভীতি, সন্ত্রাসের মধ্যে চৌদ্দই আগষ্ট সন্ধ্যাবেলা দেখা গেল মাত্র পনেরজন শিক্ষক জাতীয়দলে সদস্যপদের আবেদন করে সই করেননি। বাকি সকল শিক্ষকদের সই সম্বলিত আবেদনপত্র সংগৃহীত হয়ে গেছে। আগামীকাল যখন রাষ্ট্রপতি আসবেন, তখন প্রায় হাজারখানেক শিক্ষকের আবেদনপত্র তাঁর সকাশে দাখেল করা হবে। তিনি শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভাষন দেবেন এবং তাঁদের কাছে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি একনিষ্ঠ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি চাইবেন এবং শিক্ষকরাও হাত তুলে তিনি যা বলবেন তার প্রতি সমর্থন জানাতে বাধ্যা হবেন। এই পর্যন্ত সকলে তাই করছেন।

বাংলাদেশের আগ্নেয়আত্মার জ্বালামুখ বলে কথিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিন্তা, ভাবনা, বুদ্ধি এবং মননশীলতার নেতৃত্বদানকারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোন শক্তিধর মানুষকে যা দেয়নি শেখ মুজিবুর রহমানকে সেই অকুন্ঠ আনুগত্য স্বেচ্ছায় প্রদান করবে। গোটা দেশের মানুষ অবাক বিস্ময়ে এই দৃশ্য দেখার জন্য বেদনাহত চিত্তে প্রতীক্ষা করছিল। রাষ্ট্রপতির বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন উপলক্ষে জাতীয় দৈনিকগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করছিল। রেডিও ঘনঘন সংবাদ দিচ্ছিল। টেলিভিশনে উপাচার্যের বিশেষ সাক্ষাতকার দেখানো হচ্ছিল। এ উপলক্ষে কি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়কে কিভাবে সাজানো গোছানো হয়েছে আনুপূর্বিক সমস্ত বিবরণ রেডিও, টেলিভিষন প্রচার করছিল। এই দিনটিকে ভাবগম্ভীর, পবিত্র এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণরূপে দেশের মানুষরে দৃষ্টিতে চিত্রিত করার জন্য পূর্ণপ্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছিল। সরকারি প্রচারণার ধরণটা এমন ছিল যে-কোন রকমের বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বত:স্ফুর্তভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে এই ঐতিহাসিক সংবর্ধনা প্রদান করছে। পূর্বের একনায়করা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে যে রকম ছা্ত্রদের পূঞ্জীভূত ক্ষোভ, আক্রোশ কোন না কোনো পথে ফেটে পড়ে, খুন, জখম, রক্তারক্তি কান্ড অবধারিত ঘটে যেত এবার সে সবের কোন লক্ষণ নেই। তিনি তো আর ওৌপনিবেশিক শাসনকর্তা নন, তিনি স্বয়ং বাঙালি জাতির পিতা। সুতরাং তিনি বিশ্ববিদ্যলয়ে আগমন করছেন, তার জন্য কেন বিক্ষোভ এবং অশান্তি হবে। বরঞ্চ এই মহানায়ককে আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা তাঁদের মধ্যে পাবেন এ আনন্দে সকলে বিভোর হয়ে আছেন। আগামীকাল উনিশ শ'পচাঁত্তর সালের পনেরই আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের একটি স্মরণী্য় দিন হয়ে বিরাজ করবে।

চৌদ্দই আগষ্ট সন্ধের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। শুনলাম কার্জন হলে এবং লাইব্রেরিতে বোমা ফুটেছে। পরিবেশটা থমথমে হয়ে এসেছে। উৎসবমুখর পরিবেশ হঠাৎ যেন কেমন থিতিয়ে এসেছে। মিনিটে মিনিটে পুলিশের গাড়ি টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। সকলের চোখেমুখে আশংকা। ছাত্রদের সিংহভাগ যাঁরা এই সুবিশাল এলাহিকান্ডের নীরব নিরুপায় দর্শক ছিলেন, তাদের মনের গতিটা অনুসরন করতে চেষ্টা করলাম। তাঁদের চোখমুখ দেখে মনে হল এ রকম একটা অভাবনীয় কান্ড ঘটায় সকলে যেন মনের গভীরে খুশি হয়েছে। হাতে পায়ে শেকল, শেকলের পর শেকল পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বারুদ এবং আগুনের ভাষায় শেষ পর্যন্ত আসন্ন মূহূর্তটিতেই কথা কয়েছে। অর্থাৎ কোন স্বেচ্ছাচারীকেই এই পবিত্র বিদ্যাপীঠ কোনদিন অতীতে বরন করেনি এবং ভবিষ্যতেও বরণ করতে প্রস্তুত নয়।

কথাগুলো ভেবে নিয়েছিলাম আমি। মনের ভেতর একটা ভয়ার্ত আশংকাও দুলে উঠেছিল। দুয়েকটা বোমা ফুটেছে এই ভয়ে শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা স্থগিত রাখবেন তিনি তেমন মানুষ নন। তুনি নিশ্চিতভাবেই আসবেনই। অপার শক্তিবলে মুখরা নগরীর স্পর্ধিত জিহ্বা যিনি স্তব্ধ করে দিয়েছেন, দুয়েকা বোমা ফুটলে কি তিনি সেই ভয়ে ঘরের কোনে চুপটি করে ভেজা বেড়ালের মত বসে থাকবেন? তাঁর প্রতি সবচেয়ে বিরুপ শ্রেণীটি আগামীকাল সকালে সদলবলে নতমস্তকে বসে থাকবেন? নাটকের এই রোমাঞ্চকর দৃশ্যে তিনি কি করে অনুপস্থিত থাকতে পারেন? হয়ত আরো বোমা ফুটবে। পুলিশ ছাত্রাবাসসমুহের কক্ষে কক্ষে খানাতল্লাসী চালাবে, সন্দেহজনক কিছু ছাত্রদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে। কিন্তু তাঁর আসা বন্ধ হবে না।

রাতে হেটে ফিরছিলাম সাতাশ নম্বর সড়কের দিকে। মনে মনে এসব কথা তোলপাড় করছিল ভয়ংকরভাবে। শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘবাহু প্রসারিত করে সমস্ত দেশটাকে কঠিন আলিংগনে আবদ্ধ করছেন, যা কিছু বাধা দিচ্ছে, প্রতিবাদ করছে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোন কথা নেই, কোনো বাধা নেই। বাংলাদেশের কন্ঠ একটি, সেটি শেখ মুজিবুর রহমানের ---- মানুষ ওই একজন, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। ভয়ে দুরুদুরু করছিল বুক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পনেরজন সই করেননি, তাঁদের অনেকেই আমার চেনাজানা বন্ধু-বান্ধব। তাঁদের অবস্থার কথা চিন্তা করছিলাম। তাঁদের কি হবে? তাঁদের কি চাকরি চলে যাবে? তাঁরা কি খাবেন? এই বাজারে বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে কিভাবে জীবনধারন করবেণ? তাঁদের কি পুলিশে তুলে নিয়ে যাবে? কি হতে পারে এই রাজদ্রোহিতার পুরষ্কার?

ভয়ঙ্কর চাপ অনুভব করছিলাম। একা একা হাঁটছিলাম। ভয়ানক একা বোধ করছিলাম। চারপাশের লোকজনের কারো সংগে আমার সম্পর্ক নেই, যেন কোনকালে ছিলও না। একা একা আমি যেন সুড়ংগ পথে বিচরন করছি। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল আমি ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আমি দেখে আসছি, কিভাবে আমার লালিত মূল্যবোধগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। লোভীর লোভ, প্রবলের অন্যায়কে এমনভাবে রুপ ধরে জেগে উঠতে আমি কোনোদিন দেখিনি। এত অশ্রুতে ভেজা, এতা গাঢ়রক্তে রন্জিত আমাদের স্বাধীনতা আমাদেরকে এমনভাবে প্রতারিত করছে প্রতিদিন, সে কথা কার কাছে যেয়ে বোঝাই। যাদেরকে মনের কথা ব্যক্ত করতে যাব, তাঁদের অবস্থাও আমার মত। এ কেমন স্বাধীনতা, যে স্বাধীনতা আমাদের গোটা জাতীটাকে সম্পূর্ন ভিখিরীতে পরিণত করে? এমন স্বাধীনতা যে স্বাধীনতায় আমরা একটা কথাও বলতে পারব না। চোখের সামনে সত্য মিথ্যের আকার নিচ্ছে। জলজ্যান্ত মিথ্যে নধর তাজা সত্যি হিসেবে এসে প্রতিদিন হাজির হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের গোটা জাতিটাকে নিয়ে কি করতে চান? তাঁর কথায় কথায় উঠে বসে এ জাতির তো আর কোনোকিছুই অবশিষ্ট নেই। এত অ্ত্যাচার দেখেছি, এত জমাট দু:খ দেখেছি, এত কাপুরুষতা দেখেছি এ জাতি আর মানুষের পর্যায়ে নেই। ক্রমশ পশুর নিচে চলে যাচ্ছি আমরা। দুর্নীতির জাতীয়করন করে সমাজজীবনের প্রতিটি স্তর তিনি বিষিয়ে তুলেছেন। এই জাতীর যা কিছু গভীর, যা কিছু পবিত্র, উজ্জ্বল এবং গরীয়ান বিগত তিন বছরে সমস্ত কিছু কলুষিত করে ফেলতে পেরেছেন।

তাঁর বাহিনী অশ্বমেধ যজ্ঞের মত যদিকেই গেছে সবকিছু ভেঙেচুরে তছনছ করে ফেলেছে। শেষমেষ ছিল আমাদের একটা বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা ভাবতে শিখেছি, এই বিশ্ববিদ্যালয়ই স্বাধীনতা, শান্তি, কল্যাণ, প্রগতি, সাম্য এবং হরিৎবরণ আশা-আকাঙ্খার লালনক্ষেত্র। এইখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন এক শঙ্কাহীন স্বাধীনতা নিবাস করেন, বিরাজ করেন এমন এক সুস্থশালীনতা আমাদের জ্ঞানদায়িনী মা বিশ্ববিদ্যায়ের অঙ্গে অঙ্গে এমন এক প্রসন্ন পবিত্রতার স্রোত প্রবাহিত হয়, কোন রাজণ্য, কোন সমরনায়ক, কোন শক্তিদর্শী মানুষ কোনদিন তা স্থুল হস্তের অবলেপে কলঙ্কিত করতে পারেনি। আকাশের মত উদার, বাতাসের মত নির্ভর, অনির্বার ঝর্নার উৎসের মত স্বচ্ছ এবং সুনির্মল স্বতঃস্ফুর্ত স্বাধীনতা এইখানে প্রতিদিন, প্রতিদিন বসন্তের নতুন মুকুলের আবেগে অঙ্কুরিত হয়।এই অকুন্ঠিত স্বাধীনতার পরশমনির ছোঁয়ায় প্রতিটি আপদকালে এই জাতি বারে বারে নবীন হয়ে ওঠে। এর প্রতিষ্ঠাকালের পর থেকে আমাদের জন্মভুমির ওপর দিয়ে কতই না ঝড় বয়ে গেছে। কতবার ঘোড়ার খুড়ে, বন্দুকের আওয়াজে কেঁপে উঠেছে আকাশ, গর্বিত মিলিটারীর বুটের সদম্ভ পদবিক্ষেপে চমকে উঠেছে রাত্রির হৃদয়। কত শাসক এল, কত মানুষ প্রাণ দিল। আমাদের এই ধৈর্যশীলা জ্ঞানদায়িনী মা সংহত মর্যাদার শক্তি, সাহস, বলবীর্য সবকিছু ফুরিয়ে যাবার পরেও শিখিয়েছে কি করে প্রতীক্ষা করতে হয়। নীরব ভাষায় মৌন আকাশের কানে কানে বারেবারে জানতে চেয়ে গেছে শক্তি, ক্ষমতা, দম্ভ এসবের পরিণতি কোথায়? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অতন্ত্রপ্রহরীর দল, তারা কোথায়? কোথায় মি. জিন্নাহ, কোথায় নাজিমুদ্দিন, কোথায় নুরুল আমিন? জেনারেল আইয়ুব খান, আবদুল মোনেম খান, ইয়াহিয়া খান এই সমস্ত শক্তিদর্পী মানুষেরা আজ কোথায়? তাঁরা যে আতঙ্ক, যে ঘৃণা, যে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে এ দেশের জনপদবাসীর জীবনধারায় ঘুর্ণিঝড়ের সূচনা করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কি আপন সন্তানদের তার আর্তি থেকে বেরিয়ে আসার প্রেরণা দেয়নি?

সেপ্টেম্বর ৯, ১৯৭৫

 

 

সেই রাশিয়া এই রাশিয়া

  • PDF

মাহবুব মোর্শেদ

সোভিয়েত ইউনিয়ন আর নেই, সে কথা সবার জানা। কিন্তু রাশিয়া বলে যে একটি দেশ আছে সেটিও যেন আমরা ভুলতে বসেছিলাম। অন্তত বাংলাদেশের বেলায় এটি সত্য। রাষ্ট্র সম্পর্কীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ সূত্রে রাশিয়ার নাম বহু বছর বাংলাদেশে উচ্চারিত হয়নি। যেন রাশিয়া আমাদের কাছে যা, ইউক্রেন বা আর্মেনিয়াও তা।

 

নেতৃত্বগৃধœুদের উদগ্র ক্ষুধা যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র ঐক্য একদিনেই শেষ

  • PDF

এখন সময় রিপোর্ট : বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে নিউ ইয়র্ক প্রবাসী যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে ঐক্যের সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল তাতে ‘স্যা-িঝড়’ প্রচ- আঘাত হেনেছে। ‘দীর্ঘদিন থেকে ঐক্য প্রত্যাশি বিএনপি সমর্থকরা গত ১০ ডিসেম্বর যে আশার আলো দেখেছিলেন তা কতিপয় নেতৃত্বগৃধœু নাদানের জন্য আবার দু:খকনকভাবে হোচট খেয়েছে’ বলে মন্তব্য করলেন দলের নিউ ইয়র্ক প্রবাসী কয়েকজন প্রবীন ও তরুণ নিবেতি প্রাণ কর্মী ও সমর্থক।

 

যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশিয়ানদের রাজনৈতিক অবস্থান সংহত করার দীপ্ত শপথে এ্যাসাল’র পঞ্চম কনভেনশন সমাপ্ত

  • PDF

এখন সময় রিপোর্ট : গত ১৫ ডিসেম্বর টিমস্টার’স লোকাল ৩৭, ইউনিয়ন হল, ম্যানহাটন’এ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এ্যালাইয়েন্স অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকান লেবার (এ্যাসাল)’র পঞ্চম কনভেনশন। বিকাল ৪টা থেকে শুরু হয়ে রাত ১০ পর্যন্ত চলা এই কনভেনশনে যুক্তরাষ্ট্রের মুলধারার বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত দক্ষিণ এশিয়ার কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

 

ভেতরের মানুষ

  • PDF

জীবন চৌধুরীর কলাম

(পূর্ব প্রকাশের পর)

গায়ত্রী প্রণয়ে যখন শরৎচন্দ্রের হৃদয় সিক্ত তখন ঘটে গেল অপত্যাশিত এক ঘটনা। এই সময় শশাংক মোহন মুখোপাধ্যায় নামে এক লোক এলো রেঙ্গুনে কাঠের কারার করতে। সে মাসিক ৫০ টাকা বেতনে ফ্রেন্ডকে তার অধীনে কাজ দিল। একই বাড়িতে ফ্রেন্ড ও গায়ত্রী থাকেন বলে হঠাৎ একদিন শশাংক গাংত্রীকে দেখে তাকে পাওয়ার আশায় ব্যাকুল হয়ে নানা কু’মতলব আটতে শুরু করলো। এদিকে শরৎ তার একাগ্র ও একচ্ছত্র প্রেমের সাধনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে দেখে প্রমাদ গুণলেন। গায়ত্রী প্রেমে কাউকে ভাগ বসাতে তিনি নারাজ।

 

ফি ছাড়া ব্ল্যাক কার ও কার ইন্সুরেন্স করেন ব্রোকার নেয়াজ

  • PDF

এখন সময় রিপোর্ট : নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশী ক্যুমিউনিটিতে দীর্ঘদিন ব্ল্যাক কার, কার সার্ভিস, হোম ও বিজনেস ইন্সুরেন্সের যাবতীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন অভিজ্ঞ ব্রোকার এনওয়াই ইন্সুরেন্স ব্রোকার হাউজের প্রেসিডেন্ট শাহ নেয়াজ। এখন সময়’কে তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।

এখন সময় : ব্ল্যাক কার ও কার সার্ভিসের ক্ষেত্রে ইন্সুরেন্সে কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

 

জ্যাকসন হাইটসে সন্ত্রাসী হামলার শিকার বাংলাদেশি পরিবার

  • PDF

এখন সময় ডেস্ক : নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস এলাকায় গত রবিবার রাতে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন এক বাংলাদেশি পরিবার। কৃষ্ণাঙ্গ একদল সন্ত্রাসী তাদের বেদম মারধর করে। এ ঘটনায় জাভেদ (২৫) নামে একজনকে গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিউইয়র্ক পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে গ্রেফতার করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টারের বাসিন্দা জাভেদ তার বাবা, ভাই, ভাবী ও ছোট বোনকে নিয়ে জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ স্ট্রিটের একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত মহান বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যান।

 



Joomla Templates and Joomla Extensions by JoomlaVision.Com
  • পপাত ধরণীতল!!

    পপাত ধরণীতল!!

    সাঈদ তারেকএই ভাটি বেলায় এসে সিটি ইলেকশনের বুদ্ধিটা কে যে দিয়েছিল! কি হতো চার সিটিতে নির্বাচনটা না করালে! মেয়াদ শেষ হয়ে গেছিলো? তো মেয়াদ তো ঢাকারও শেষ হয়ে গেছে পাঁচ…

  • চার সিটি নির্বাচনের ফলাফল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে নাকি বিপক্ষে ?

    চার সিটি নির্বাচনের ফলাফল  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে নাকি বিপক্ষে ?

    জাহিদ হাসান বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে ১৫ জুন রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়ে গেল, এতে সব কয়টা মেয়র ও অধিকাংশ কাউন্সেলর পদে…

  • তারেক জিয়া দেশে ফিরলে বিএনপি’র লাভ-ক্ষতি

    তারেক জিয়া দেশে ফিরলে বিএনপি’র লাভ-ক্ষতি

    সাঈদ তারেক ............ কয়েক দিন আগে দেখা গেল তারেক জিয়া দেশে ফিরে আসছেন- এই এক খবরে সরকারি দলের লোকজনের কাপড়-চোপড় নষ্ট হবার দশা! শুরু হলো স্বভাবসূলভ প্রলাপ বকা। এক মন্ত্রী…

  • বাংলাদেশে শত্রুশক্তির যুদ্ধ

    ফিরোজ মাহবুব কামাল ......... শত্রুপক্ষের রণকৌশল : মুসলমানগণ কোন কালেই শত্রুমুক্ত ছিল না। আজও নয়। যেখানেই মুসলমান আছে সেখানে শয়তান এবং তার দলবল ও রণকৌশলও আছে। কোন বিজন দ্বীপে ঈমানদার…

  • বিরোধী দলকে জুজুর ভয় দেখানো হচ্ছে ১/১১ এর সরকার কি তত্ত্বাবধায়ক ?

    জাহিদ হাসান .......... দেশে আর কয়েক মাস পরেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ৫ বছরের মেয়াদ শেষ হবে, নিয়ম অনুযায়ী বা সংবিধান মেতাবেক ২০১৪ সালের জানুয়ারী মাসের মধ্যে পরবর্তি সংসদ…

You are here: শেষ পৃষ্ঠা