ঢাকা অফিস : ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদে থাকা না থাকার সিদ্ধান্তের ভার বিচারপতি নিজামুল হকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ বিষয়টি তার সুবিবেচনার ওপর ছেড়ে দিয়ে আবেদনটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। সাঈদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে গতকাল বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবির এবং বিচারপতি এ কে এম জহির আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেয়। বিচারপতি নিজামুল হক ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন না। গণতদন্ত কমিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম থেকে বিচারপতি নিজামুল হককে প্রত্যাহারের জন্য এ আবেদনটি করা হয়। এদিকে এখন আর ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি নিজামুল হকের দায়িত্ব পালনে আর কোন বাধা নেই বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। অন্যদিকে দেশ, জাতি ও ট্রাইব্যুনালের মঙ্গলের জন্য বিচারপতি নিজাম নিজেই এ আবেদনের নিষ্পত্তি করবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন সাঈদীর আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় চিফ প্রসিকিউিটর এডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু ট্রাইব্যুনালকে জানান, গত ৯ই নভেম্বর বৃটিশ আইনজীবী স্টিফেন কে কিউসি, জন ক্যামেগ ও টবি ক্যাডম্যানের একটি বিবৃতি ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের মেইলে এসেছে। সাঈদীর পক্ষে পাঠানো এই একই চিঠি পরদিন দৈনিক সংগ্রামেও ছাপা হয়েছে। তিনি বলেন, বৃটিশ চেম্বার অব ল’ এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বিধান অনুযায়ী তারা এটি করতে পারেন না। এটি আইনসম্মত নয়। এ সময় ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে ডাকেন। তাকে এক পুলিশ সদস্য এজলাসের সামনে নিয়ে যান। ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি এ মামলায় কোন বিদেশী আইনজীবী নিয়োগ করেছেন কিনা? সাঈদী বলেন, হ্যাঁ। ট্রাইব্যুনাল বলেন, তারা যেসব চিঠি পাঠায়, তা কি আপনার পরামর্শে পাঠায়, ডিফেন্স টিমকে সহযোগিতার জন্য পাঠায়? সাঈদী বলেন, আমি তো কারাগারে। আমার সঙ্গে বিদেশী আইনজীবীর পরামর্শ নেয়ার সুযোগ নেই। এ সময় প্রশ্ন বোঝা এবং জবাব দেয়ার ক্ষেত্রে সাঈদীকে তার আইনজীবী তাজুল ইসলাম সহযোগিতা করলে প্রসিকিউশনের কয়েকজন সদস্য তাকে নিষেধ করেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কিছু উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। এ সময় তাজুল ইসলাম প্রসিকিউশনকে লক্ষ্য করে বলেন, অভিযুক্তকে সহযোগিতা করা আমার আইনগত অধিকার। পরে ট্রাইব্যুনালের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। সাঈদী জানান, বিদেশী আইনজীবীরা কোথাও কোন চিঠি পাঠান কিনা তা তার জানা নেই। এ বিষয়ে তার সঙ্গে কোন পরামর্শ হয়নি। এর পর ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম থেকে বিচারপতি নিজামুল হককে প্রত্যাহারের আবেদনের ওপর ট্রাইব্যুনাল আদেশ দেয়। লিখিত আদেশে ২০০৪ সালে গণতদন্ত কমিশন রিপোর্ট প্রকাশিত হয় বলে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল। এ সময় প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, গণতদন্ত কমিশন রিপোর্ট ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয়। ট্রাইব্যুনাল দুঃখ প্রকাশ করে ভুল সংশোধন করে। লিখিত আদেশে বলা হয়, ১৯৭৩ সালের অ্যাক্ট অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত। এ আইন অনুযায়ী সমপর্যায়ের একজন সহকর্মী বিচারপতির অপসারণের সিদ্ধান্ত দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিচারপতির সুবিবেচনা ও বিবেকের ওপর ছেড়ে দেয়া হলো। একই সঙ্গে আবেদনটি নিষ্পত্তি করা হলো। এদিকে বৃটিশ আইনজীবী স্টিফেন কে কিউসি, জন ক্যামেগ ও টবি ক্যাডম্যানের চিঠি সম্পর্কে ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলা হয়, তাদের এ চিঠি পাঠানো বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও বার অব ইংল্যান্ড অব ওয়েলসের বিধির পরিপন্থি। তারা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য নন। তারা অভিযুক্তের পক্ষে কথা বলতে পারেন না। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের আদেশের কপি বার অব ইংল্যান্ড অব ওয়েলসে পাঠানোর কথাও আদেশে বলা হয়। ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম থেকে এর চেয়ারম্যান নিজামুল হককে প্রত্যাহারের জন্য আমরা একটি আবেদন করেছি। ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, দু’ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল তার চেয়ারম্যানের অপসারণ আদেশ দিতে পারে না। আমরা বলেছি, দলমত নির্বিশেষে দেশের প্রথিতযশা আইনজীবীরা বলেছেন, আইন অনুযায়ী এ পদে বিচারপতি নিজামুল হক থাকতে পারেন না। আমাদের যুক্তি ট্রাইব্যুনাল বাতিল করেনি। তিনি বলেন, আমরা বলেছি, আমরা বিচার চাই। ন্যায়বিচার চাই। কিন্তু নিজামুল হক থাকলে তা সম্ভব নয়। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, জাতি আজ অধীর আগ্রহে বিচারপতি নিজামের দিকে তাকিয়ে আছে তিনি কবে এ পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। পদত্যাগ করবেন। আমরা আশা করি তিনি নিজেই এ আবেদনের নিষ্পত্তি করবেন। এতে দেশ, জাতি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সবার জন্যই মঙ্গল। প্রসিকিউটর এডভোকেট সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের ব্যাপারে সাঈদীর আবেদনটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর ফলে ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি নিজামুল হকের দায়িত্ব পালনে আর কোন বাধা রইল না। গত ২৭শে অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের বিরুদ্ধে গণতদন্ত কমিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনেন সাঈদী। এ অভিযোগের কারণে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ানোর আবেদন করেন তিনি। রোববার এ আবেদনের ওপর উভয় পক্ষের শুনানি শেষ হয়। সাঈদীর পক্ষে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক এবং এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসনে অংশ নেন। অন্যদিকে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন এডভোকেট সৈয়দ হায়দার আলী এবং এডভোকেট মোহাম্মদ আলী। গত বছরের ২৫শে মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরম থেকে এ পর্যন্ত জামায়াতের পাঁচ শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাঈদী ছাড়াও গ্রেপ্তারকৃত জামায়াতের অন্য নেতারা হলেন-দলের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোলা। এছাড়া বিএনপির সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আটক থাকলেও জিয়াউর রহমান আমলের মন্ত্রী আবদুল আলীম শর্তসাপেক্ষে জামিনে রয়েছেন।







