Tuesday,
December 18 - December 24 , 2012 > Volume 13 > Issue 04



ভারতকে করিডোর দেয়া হয়েছে

  • PDF

সরকারের গোপন সিদ্ধান্ত ও লুকোচুরি

জামশেদ মেহদী : অবশেষে বহু বিতর্কিত এবং বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি মারাত্মক তিকর বলে বিবেচিত করিডোর (ওরা বলে ট্রানজিট) দেয়া হলো ভারতকে। দেশের ১৬ কোটি মানুষকে অন্ধকারে রেখে, আওয়ামী প্রভাবিত জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে, এমন কি আনুষ্ঠানিক প্রকাশ্য সরকারি ঘোষণা না দিয়ে অতি সংগোপনে করিডোর দেয়া হলো ভারতকে। গত ১৮ অক্টোবর মঙ্গলবার থেকে ভারতকে বাংলাদেশে করিডোর সুবিধা দেয়া হলো। এটি কিন্তু শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান বর্ণিত পরীামূলক ট্রানজিট নয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মাত্র কয়েকদিন আগে ড মশিউর রহমান বলেছিলেন যে, আগামীতে কিছু কালের জন্য ভারতকে পরীামূলকভাবে ট্রানজিট দেয়া হবে। পরীামূলক ট্রানজিটের ইংরেজি তিনি বলেছিলেন ‘ট্রায়াল রান’। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে এটি কোনো ট্রায়াল রান নয়, ভারতকে দেয়া হচ্ছে নিয়মিত ট্রানজিট।

গত ১৮ অক্টোবর মঙ্গলবার একটি ইংরেজি দৈনিকে খবর দেয়া হয়েছে যে আখাউড়া হয়ে ভারতের আগরতলায় প্রথম নিয়মিত ট্রানজিট পরিবহন গেছে। পত্রিকাটির মতে এর আগে ৯ ট্রাক লোহার পাত আখাউড়া স্থল বন্দর থেকে আগরতলা গেছে। কিন্তু এগুলি কি ট্রায়াল রানের ট্রাক, নাকি নিয়মিত ট্রানজিটের ট্রাক সে ব্যাপারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড খোলাসা করে কোনো কথা বলছেন না। তাদের এই ঢাক ঢাক গুড় গুড় দেখে মনে হচ্ছে যে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’।  আখাউড়ার স্থল ও শুল্ক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তারা একটি সরকারি নির্দেশ পেয়েছেন। ওই নির্দেশে ট্রাকভর্তি মালগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট’ মাল হিসেবে। আখাউড়া থেকে এসব মাল আগরতলা পৌঁছে দেয়ার জন্য বাংলাদেশী কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণকে নিন্দেশ দেয়া  হয়েছে। এসব মাল পরিবহনের জন্য কোনো ফি, মাশুল বা ভাড়া আদায় করা হবে কি না সে ব্যাপারে ওই সরকারি নির্দেশনামায় কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

ওই নিন্দেশে বলা হয়েছে যে অতঃপর আখাউড়ার পরিবর্তে ওইসব মাল আগরতলায় খালাস করা হবে। স্থলবন্দর কর্মকর্তারা বলেন যে, আখাউড়ায় মালগুলো আনলোড না করার ফলে আনলোডিং এবং রিলোডিং বাবদ বাংলাদেশের যে বড় অংকের টাকা পাওয়ার কথা ছিল, সেই টাকা থেকে বাংলাদেশ এখন বঞ্চিত হবে। এর আগে যখন দুটি পরীামূলক ট্রানজিট যায় তখন স্থলবন্দর কর্তৃপ এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন যে, বন্দর এলাকার মধ্যেই ওইসব মাল নামানো হবে। ফলে বাংলাদেশের বন্দর এবং শ্রমিকরা কিছু অর্থ পাবে। কিন্তু গত ১৭ তারিখের নিন্দেশে সরকার সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, এসব মালামাল ভারতে খালাস করা হবে। পরীামূলক ট্রানজিটের সময় বন্দর কর্তৃপরে আয় হয় ৭০ হাজার টাকা এবং শ্রমিকরাও কিছু আয় করেন। সরেজমিন পর্যবেণে দেখা যায় যে আগরতলায় পরিবাহিত হওয়ার জন্য প্রতিটি ট্রাকে সাড়ে ১৭ টন লোহার পাত বোঝাই ৯টি ট্রাক ১২ অক্টোবর থেকে দাঁড়িয়ে আছে।

খবরে বলা হয়েছে যে, কলকাতা থেকে প্রথমে ৬২১ টন লোহার পাত নিয়ে একটি জাহাজ আশুগঞ্জ এসে পৌঁছায়। সেখান থেকে এই চালানের একটি অংশ ওই ৯টি ট্রাকে উঠানো হয়। ইন্দো-বাংলা শিপিং নামক একটি কোম্পানির ব্যাবস্থাপক মোহাম্মদ নজিব বলেন যে, নিয়মিত ট্রানজিটের অংশ হিসেবেই তারা এসব মালামাল পরিবহন করছেন। প্রথম চালানে ‘হোমিবাবা’ নামক একটি ভারতীয় জাহাজে ৩০৫ টন ইস্পাত আনা হয় কলকাতা বন্দর থেকে। সেখান থেকে সেগুলো ট্রাকে উঠিয়ে আখাউড়া হয়ে ভারতের আগরতলা যায়।

ঘাট নাই অফিস নাই

তবুও করিডোর

প্রিয় পাঠক, ওপরে যে সাবহেডিং দেখলেন, সেটি কোনো কথার কথা নয়। সেটি হলো কঠোর বাস্তব। ‘ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সরদারের’ মতে, ঘাট নাই অফিস নাই তবুও ভারতকে করিডোর দেয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছেন শেখ হাসিনার সরকার। গত ১৫ অক্টোবর ‘দৈনিক প্রথম আলোয়’ যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে সেই রিপোর্টে বলা হয়,“নেই কোনো স্থায়ী অবকাঠামো। অস্থায়ী ঘাট বানানো হয়েছে বালুর বস্তা দিয়ে। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপরে (বিআইডব্লিউটিএ) অফিস চলছে পেট্রল পাম্পের দুটি ক ভাড়া নিয়ে। কর্মকর্তা সাকুল্যে একজন। এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আশুগঞ্জ বন্দরের চিত্র।

কোনো কিছুই ঠিক নেই। এভাবেই আশুগঞ্জ নৌবন্দর দিয়ে ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান নৌ প্রটোকলের আওতায় ট্রানজিট পণ্য ত্রিপুরার আগরতলায় চলে গেছে। এখন শুরু হয়েছে নিয়মিত চালান খালাস। সরেজমিন দেখা গেছে, বালুর বস্তা দিয়ে বানানো ঘাটে মালামাল খালাস করা হচ্ছে। এমনকি মালামাল খালাস করার সময় কোনো শুল্ক কর্মকর্তা ও বিআইডব্লিউটিএর কোনো কর্মকর্তা তদারকিতে নেই। জাহাজের লোকজনই ট্রাকে মাল ওঠানোর কাজ তদারক করছেন। এর আগে পরীামূলক চালান হিসাবে লোহার পাতের দুটি চালান ইতোমধ্যেই আগরতলায় পৌঁছে গেছে। তবে এই চালানের জন্য কোনো মাশুল বা ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয়নি ভারতীয় ব্যবসায়ীদের।

ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারি যন্ত্রাংশ জাহাজ থেকে নামাতে আশুগঞ্জের পুরনো ফেরিঘাটের পাশে অস্থায়ী ঘাট তৈরি করা হয়েছে। এখন ওই ঘাটেই বালুর বস্তা ফেলে উঁচু করে ট্রানজিট মালামাল ওঠানো-নামানোর উপযোগী করা হয়েছে। আর এখানেই ঝুঁকি নিয়ে ট্রানজিট পণ্য জাহাজ থেকে সরাসরি ট্রাকে তোলা হচ্ছে। এখানে পণ্য রাখার কোনো স্থান ও মহাসড়ক নেই। বালুর ঘাট থেকে মূল মহাসড়ক পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার অংশে সড়ক নেই। বালুময় পথ পাড়ি দিতে হয় পণ্যবাহী ভারি ট্রাকগুলোকে।

অবাঞ্ছিত তাড়াহুড়া

ওপরের এসব রিপোর্ট থেকে দেখা যায় যে ভারতকে করিডোর দেয়ার জন্য সরকার দিগিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিল। তাই অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই ভারতকে করিডোর দেয়া হলো। অথচ করিডোর দিতে গেলে অন্তত ৫টি কাজ আগে সম্পন্ন করতে হবে। কাজ ৫টি হলো (১) কতগুলো রেল ও ল্যান্ড রুট হবে সেটি নির্ধারণ (২) ওই রুটগুলো কোন দিক দিয়ে শুরু হয়ে কোন দিক দিয়ে যাবে এবং কোথায় গিয়ে শেষ হবে সেটি নির্ধারণ (৩) এই সব রুট দিয়ে কোন ধরনের যান চলাচল করবে সেটি এবং সেই যানবাহনে কি কি পণ্যসামগ্রী পরিবাহিত হবে সেটি নির্ধারণ। (৪) এই সব পণ্য পরিবহনের জন্য মাশুল নির্ধারণ অর্থাৎ প্রতি টনে প্রতি মাইল বা কিলোমিটারে কত টাকা মাশুল হবে (৫) এই রেল, ল্যান্ড ও নৌ রুট দিয়ে সারা বছরে কত হাজার বা কত ল টন পণ্য আনা-নেয়া করা হবে। এর ফলে করিডোর থেকে বাংলাদেশের কত আয় হবে তার একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে।

লেখাটি যখন এই পর্যায়ে এসেছে তখন বুধবার সকালে ভারতের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত মি রজিত মিত্র বলেছেন যে, আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া হয়ে ভারতের আগরতলায় যে ট্রানজিট চলছে সেটি ১৯৭২ সালের নৌ ট্রানজিট চুক্তি অনুযায়ী নাকি হচ্ছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি আভ্যন্তরীণ নৌ ট্রানজিট চুক্তি স্বারিত হয়। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি দ্বিপাকি বাণিজ্য চুক্তি স্বারিত হয়। এই চুক্তির পঞ্চম ধারার অধীনে উল্লেখিত নৌ ট্রানজিট চুক্তি স্বারিত হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, এটি ছিল একান্তই একটি বাণিজ্য চুক্তি এবং সেই বাণিজ্য চুক্তি পরিচালিত হবে নৌপথে। ২ বছরের জন্য এই চুক্তিটি স্বারিত হয় এবং ২ বছর পর পর সেটি নবায়ন কর হয়। ২০০৯ সালে অর্থাৎ বর্তমান আওয়ামী সরকারের আমলেও তৎকালীন বাণিজ্য সচিব মাসুদ এলাহী বলেন যে, দুই দেশের নৌপথ ব্যবহার করে এই বাণিজ্য চলবে। নৌপথ ব্যবহারের মাধ্যমে নদীর নাব্য নিশ্চিত করা যাবে। এই চুক্তির অধীনে ভারত সরকার নদীর নাব্য রার জন্য বাংলাদেশকে বছরে ২ কোটি টাকা দেবে। যেসব পয়েন্টে উভয় দেশের ফেরি চলাচল করবে সেগুলি হলো কলকাতা, রায়মঙ্গল, খুলনা, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, গোয়ালন্দ, সিরাজগঞ্জ, বাহাদুরাবাদ, চিলমারী, ধুবরি, ভৈরব বাজার, আমিরগঞ্জ, শেরপুুর, ফেঞ্চুগঞ্জ ও জকিগঞ্জ।

উপরে উল্লিখিত ৭২ সালের নৌ ট্রানজিট চুক্তিতে রেল বা সড়ক পথ ব্যবহারের কোনো কথা উল্লেখ ছিল না। ২ বছর পর পর চুক্তিটি নবায়ন করা হবে সত্য। কিন্তু েেএত্রও তৎকালীন বাণিজ্য সচিব জনাব মাসুদ স্পষ্ট ভাষায়  উল্লেখ করেছিলেন,“ঘড় হবি রংংঁব রিষষ নব রহপড়ৎঢ়ড়ৎধঃবফ রহ ঃযব ৎবহবধিষ ধমৎববসবহঃ” অর্থাৎ নৌ চলাচলের বাইরে এবং চুক্তিতে বর্ণিত রুট এবং পন্য ছাড়া অন্য কোনো বিষয় এই চুক্তির আওতায় উত্থাপন করা যাবে না। সুতরাং এই উক্তির মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, অন্য কোনো বিষয় অর্থাৎ স্থল বা রেল করিডোর এই চুক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।

ভারতকে করিডোর দেয়ার জন্য এই সরকার এতই উতালা হয়ে পড়েছে যে এখন বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় পই নৌ চুক্তির মনগড়া ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেছে। এছাড়া এরমধ্যে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী বলেছেন যে, ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার জন্য নতুন করে আর কোনো চুক্তির  প্রয়োজন নাই। আসলে শেখ হাসিনার সরকার সুকৌশলে ভারতকে করিডোর দিচ্ছে।

এরজন্য তারা সওয়ার হয়েছে ৭২ সালের বাংলা ভারত দ্বিপাকি বাণিজ্য চুক্তি এবং ৭২ সালের বাংলা ভারত দ্বিপাকি নৌ চলাচল চুক্তির ঘাড়ে। সেজন্যই জনগণকে না জানিয়ে, জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে, জনমত গঠনের কোনোরূপ চেষ্ট না করে, ৭২ এর ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ভারতকে গত ১৮ই অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে করিডোর দেয়া হয়েছে। তারপরও তারা সরকারিভাবে সেটি ঘোষণা করেনি। পত্র-পত্রিকাগুলো বরং নিজেদের গরজে সরেজমিন পরিদর্শন করে সরকারের এই গোপন সিদ্ধান্ত ফাঁস করেছেন।

এই গোপনীয়তা এবং এই লুকোচুরিই প্রমাণ করে যে এই কাজটি অর্থাৎ ভারতকে করিডোর দেয়া বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল তো নয়ই, বরং এটি আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। সুতরাং বাংলাদেশের জনগণ কোনো অবস্থায় এটাকে মেনে নিতে পারে না। তাই জনগণের দাবি, করিডোর প্রশ্নে গণভোট গ্রহণ করা হোক। সেটা না করে যদি জনগণের ওপর জোর করে সেটা চাপিয়ে দেয়া হয়, তাহলে পরবর্তী সরকার এর কোনো দায় দায়িত্ব গ্রহণ করবে না।

Share this post

Add comment




You are here: প্রথম পৃষ্ঠা ভারতকে করিডোর দেয়া হয়েছে