
ঢাকা অফিস : নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, চালকদের আর ঘাতক বলা যাবে না। চালকরা ইচ্ছা করে দুর্ঘটনা ঘটায় না। গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ আয়োজিত মহাসমাবেশে এ কথা বলেন তিনি। সমাবেশে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা যোগ দেন। রাজধানীর বিভিন্ন বাস ও ট্রাক স্ট্যান্ড থেকে মিছিল নিয়ে হাজির হন পরিবহন শ্রমিকরা। সমাবেশে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের
চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিতে জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হয়। এ সময় অনেকে ছবিকে লক্ষ্য করে জুতা ছুড়ে মারে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম আহ্বায়ক রমেশচন্দ্র ঘোষ, আবদুর রহিম দুদু, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী খান, চট্টগ্রাম পরিবহন মালিক সমিতির নেতা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, আমাদের চালক ও শ্রমিকদের বলা হচ্ছে ঘাতক, খানসেনা। এভাবে অপবাদ দিয়ে তাদেরকে জনগণের মুখোমুখি করা হচ্ছে। তারা ঘাতকও নয়, খানসেনাও নয়। তারা জনগণের সেবক। তিনি বলেন, আপনাদের মনে হতে পারে মন্ত্রী হয়েও আমি কেন এখানে। এর উত্তর হচ্ছে, ৩টি কারণে আমি এখানে এসেছি। সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা, চালকদের ঘাতক না বলা ও পরিবহন শিল্পকে রক্ষা করা। এছাড়া সরকারের কাছে কিছু দাবি-দাওয়া তুলে ধরা। তিনি বলেন, চালকদের বিরুদ্ধে আর ৩০২ ধারায় মামলা হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে চিঠি ইস্যু করেছে। এখন চালকদের বিরুদ্ধে মামলা হবে ৩০৪-এর বি ধারায়। সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে আমাদের উচিত মালিক, শ্রমিক ও যাত্রীসহ সবাইকে সচেতন করা। মিশুক মুনির ও তারেক মাসুদসহ ১৫ই আগস্ট নরসিংদীতে ১০ জন পুলিশ নিহত হয়েছেন। তাদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি। কিন্তু এসব দুর্ঘটনা চালক ইচ্ছা করে করেননি। একজন চালক একটা কুকুরও মারতে চায় না। দুর্ঘটনার নানা কারণ আছে। একশ্রেণীর পত্রিকা, টিভি চ্যানেল মালিক শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। জানি না তাদের উদ্দেশ্য কি। কলামনিস্ট মুনতাসীর মামুন পরিবহন শ্রমিকদের খানসেনা বলেছেন। এ ধরনের কথা বলে আমাদের তুচ্ছ করবেন না। সংঘাতময় পরিবেশ সৃষ্টি করবেন না। আমি মন্ত্রী হলেও পরিবহন শ্রমিকদের নেতা। প্রয়োজনে তাদের জন্য আত্মাহুতি দেবো। নৌমন্ত্রী বলেন, আমি নাকি ২৪ হাজার লাইসেন্স সরকারকে দিতে বলেছি। দেশে ৭ লাখ ৪২ হাজার ৪শ’ পরিবহনের জন্য ৬ লাখ ৬৪ হাজার চালক আছে। প্রতি বছর ৫০ হাজার গণপরিবহন রাস্তায় নামে। চালক কোথায় পাওয়া যাবে? আমি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লাইসেন্স দেয়ার কথা বলেছি সরকারকে। যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দিতে বলেছি তবে আমি সবার কাছে ক্ষমা চাইবো। তিনি বলেন, দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে আমি নাকি ১৪ বার বিদেশ গিয়েছি। বন্দরের কোটি কোটি টাকা খরচ করেছি। কিন্তু আমি গেছি ৬ বার। বন্দরের টাকায় গেছি ১ বার। আমি যুগান্তরের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। আমার প্রতিবাদ তারা ১৭-এর পাতায় ছোট করে ছেপেছে। কিন্তু ১০ জন লোক নিয়ে কেউ আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করলে তা প্রথম পাতায় বড় করে ছাপানো হয়। তিনি বলেন, আমি নাকি গরু, ছাগল চিনলেই লাইসেন্স দিতে বলেছি। কিন্তু আসলে আমি বলেছি, ট্রাফিক সিগন্যাল চিনলেই লাইসেন্স দেয়া উচিত। সরকারের গেজেটেই তো ট্রাফিক সাইন হিসেবে গরুর গাড়ির ছবি দেয়া আছে। সমাবেশে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুর রহিম দুদু বলেন, হাইওয়ে পুলিশের হয়রানি থেকে চালকদের রক্ষা করতে হবে। শ্রমিক নেতা আবুল হোসেন বলেন, আমাদের দাবি না মানা হলে রাস্তায় নামতে বাধ্য হবো। মহাখালীর উত্তর পাশে কাঁচাবাজার উঠিয়ে সেখানে টার্মিনাল সমপ্রসারিত করা হোক। শ্রমিক নেতা রুস্তম আলী বলেন, নসিমন করিমনে দেশ ভরে যাচ্ছে। এগুলো মহসড়কে চলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। চট্টগ্রামের শ্রমিক নেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, চট্টগ্রামে কোন বাস টার্মিনাল নেই। সেখানে অবিলম্বে বাস টার্মিনাল নির্মাণ করতে হবে। শ্রমিক নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, গাজীপুরে চাঁদাবাজি হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, বিআরটিসি’র জন্য এক আইন আমাদের জন্য আরেক আইন হতে পারে না। মুনসুর আলী ম-ল বলেন, ঢাকায় ছাত্র নামের সন্ত্রাসীরা ভাড়া দেয় না। আবার পরিবহন শ্রমিকদের মেরে গাড়ি আটকে রাখে। এটি বন্ধ করতে হবে।
১১ দফা দাবি তুলে ধরেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্যপরিষদের আহ্বায়ক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- চালকদের জন্য ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন। চালকদের বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় মামলা দায়ের বন্ধ করতে হবে। সড়ক পরিবহনকে শিল্পের সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। মোটরযানের ওপর থেকে ১৫ শতাংশ হারে আদায় করা ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে। সেতুগুলো থেকে বর্ধিত টোল প্রত্যাহার করতে হবে। টার্মিনালগুলোতে শ্রমিকদের বিশ্রামাগার নির্মাণ করতে হবে। রিক্যুইজিশনের নামে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ট্রাক বন্দোবস্তকারী সংগঠনগুলো নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। যাত্রী বীমার পরিবর্তে ট্রাস্টি বোর্ড প্রবর্তন করতে হবে। পরিবহন শ্রমিক মালিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে। এই ১১ দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপি আগামী ২৬শে অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগমন্ত্রীর কাছে দেয়া হবে। এছাড়া দাবিসমূহ আগামী ৩০শে নভেম্বর এর মধ্যে না মানা হলে ১লা ডিসেম্বর বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয় সমাবেশ থেকে।









