এখন সময় ডেস্ক : নানামুখি অর্থনৈতিক সংকট বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর সুপার পাওয়ার আমেরিকার ভবিষ্যৎ অনশ্চিত করে তুলেছে। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সংকট হতে উত্তরণ লাভ করলেও দীর্ঘ মেয়াদে দেশটি কোনোভাবেই তার অবস্থান ধরে রাখতে পারবে না। কিছুদিন আগে একটি আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সি এ দেশের রেটিং অবনমিত করেছে, যা বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে অনেকটাই প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। অতিমাত্রায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ও ভোগবাদিতাই এই অর্থনৈতিক সংকটের মূলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে পর্যবেক্ষগণ মনে করেন।
ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল সাধারণ নাগরিকদের মানসিকতাকে পুঁজি করে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রমরমা ব্যবসায় করে যাচ্ছে। বিশ্বের যেসব দেশে স্বল্প সুদে সহজে ঋণ মেলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তাদের সবার শীর্ষে। ২০০৭-০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, যার প্রভাবে বিশ্ব একটি ভয়াবহ মন্দার দিকে ধাবিত হয়েছিল তার পেছনেও ছিল এই ঋণ সমস্যা। ব্যাংক ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলো হাউজিং খাতে স্বল্পসুদে এবং সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করেছে; কিন্তু যাদের ঋণ প্রদান করা হয়েছে তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার প্রতি সামান্যতম দৃষ্টি দেয়া হয়নি। ফলে দেখা গেল, এক সময় ব্যাংকগুলো আর ঋণ আদায় করতে পারছে না। অনেক ব্যাংক ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়া হয়ে যায়। এভাবে ২০০৭ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে মোট ১৫৪টি বড় আকারের ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে। এই দেশটি যেহেতু এখনো বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তি তাই এখানে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হলে তার প্রভাব অনিবার্যভাবে অন্যান্য দেশেও বিস্তার লাভ করে। এ ছাড়া দেশটি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না করে অনুৎপাদনশীল খাতে অতিমাত্রায় পুঁজি বিনিয়োগের ফলে ক্রমশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। বর্তমানে দেশটির মোট ঋণের পরিমাণ হচ্ছে জিডিপির ৯৮ শতাংশ। কিন্তু আগে একটি আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সি যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধ ক্ষমতা সম্পর্কিত রেটিং অবনমিত করেছে। ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ক্ষেত্রে ট্রিপল এ+ অর্জন করে। সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের আগ পর্যন্ত শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছিল; কিন্তু রেটিং এজেন্সি যুক্তরাষ্ট্রের রেটিং কমিয়ে দেয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী এর তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ার বাজারে ধস নামে। বিশেষ করে চীনে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে চীনের বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আরো একটি কারণ হচ্ছে, অতিমাত্রায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। অস্ত্রের মাধ্যমে পরদেশ দখল করতে গিয়ে নিজের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করেন যখনই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সংকটের মধ্য দিয়ে যায় তখনই তারা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে যুদ্ধ যেনো একটি মোক্ষম সমাধান। ‘৬০ দশকের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির এক-তৃতীয়াংশ যুদ্ধ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। বার্টান্ড রাসেল সে সময় বলেছিলেন, য্ক্তুরাষ্ট্রের প্রতি তিনটি অর্থনৈতিক তৎপরতার একটি হচ্ছে যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত। এই ধবংসাত্মক প্রবণতার সঙ্গে যার অস্তিত্ব জড়িত তার নিকট সংকটটাই মৌলিক।
বিশ্বব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেড়শ’র বেশি বড় আকারের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে যে কোনো অজুহাতে আক্রমণ পরিচালনা করা তার একটি প্রবণতায় পরিণত হয়। ‘৬০ এর দশকে ভিয়েতনাম ছাড়াও কিউবায় একটি স্থায়ী যুদ্ধাবস্থা তৈরি করে রেখেছিল। নিকারাগুয়া, পানামায় যুদ্ধ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে তারা সরাসরি আগ্রাসন চালিয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে সবসময় একটি অপ্রতিরোধ্য দানবীয় শক্তি হিসেবেই আমরা চোখের সামনে দেখি।
ভিতরে ভিতরে যে অর্থনৈতিক যে সংকট সৃষ্টি হয় তা মারাত্মক আকার ধারণ করে ‘৯০এর দশকে। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার পতন হলে যুক্তরাষ্ট্র একক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই একক বিশ্বশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পতনের ঘণ্টাও বেজে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ অর্থনীতি বিস্তারের একটি অজুহাত। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন চলে গেল তখন যুদ্ধ অর্থনীতি একটি বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পতিত হয়। ১৯৯১ সালে তাদের নতুন শত্রু সন্ধান শুরু হয়। এই নতুন শত্রু সন্ধান কার্যক্রমের প্রথম শিকার হলো ইরাক। ১৯৯১সালে ইরাক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নতুন ফ্রন্ট খোলা হলো। পরবর্তী ইতিহাস আমাদের জানা আছে। পরবর্তীতে আবারো ইরাক আক্রমণ করা হলো। প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানি, প্রাইভেট কনস্ট্রাকশন কোম্পানি, প্রাইভেট কমিউনিকেশন সিস্টেম গড়ে উঠে। এদের হাতে চলে যায় অনেক ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য। এর ফলে অপচয় এবং যুদ্ধ খাতে ব্যয়ও বাড়তে থাকে। ২০১০-’১১ সালে সারা পৃথিবীতে যুদ্ধ খাতে ব্যয় হয়েছে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই ব্যয় করেছে ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধখাতে ব্যয় করেছে ৭০০ বিলিয়ন ডলার। এই ব্যয় বহন করা হয় পাবলিক মানি দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করেনি।
এখানে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক দিকে বিত্তবান শ্রেণীর মানুষগুলো নানা ধরনের বিলাসিতার মধ্যে নিজেদের উজার করে দিচ্ছে। অন্যদিকে বিত্তহীন মানুষগুলো রাতের বেলা না খেয়ে ঘুমাতে যায়। ২০০৭-০৮ সালে যখন সমস্ত যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক সংকটের সূচনা হয় তখন সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের অর্থ দিয়ে তথাকথিত ‘বেইল আউট প্যাকেজ’র নামে বিত্তবানদের সহায়তা করা হয়। প্রথমে ৮০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়। পরে এই অর্থের পরিমাণ আরো বাড়ানো হয়; কিন্তু এতেও কোনো লাভ হয়নি। সেই সংকট অতিক্রম করতে না করতেই আবারো নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক জিডিপি’র পরিমাণ প্রায় ১৬ ট্রিলিয়র ডলার। আর দেশটির মোট ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১৪ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তাদের মোট অর্থনীতির প্রায় পুরোটাই ঋণনির্ভর। এভাবে একটি দেশ অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর হয়ে পড়লে কোনোভাবেই তার উন্নতি সাধিত হতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বর্তমানে ঋণ এবং যুদ্ধের উপর নির্ভরশীল। তারা চেষ্টা করলেও যুদ্ধ অর্থনীতি হতে বেরিয়ে আসতে পারবে না। একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ হয়েছে এটাই যে, তাদের এজন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্চা দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্মানও খুয়াতে হচ্ছে। এ পর্যন্ত বাইরের কোনো দেশ আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র সফলতা অর্জন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের একটি বাজে প্রবণতা হচ্ছে তারা ঋণ করে হলেও বিলাসিতা করতে পিছপা হয় না। কিছু দিন আগে তাদের রাষ্ট্রীয় ঋণের সিলিং বাড়ানো হয়েছে। এই সিলিং বাড়ানোর জন্য সরকারের উপর একটি কঠিন শর্তারোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সিলিং বাড়ানো হবে ঠিকই কিন্তু সরকারকে তার ব্যয় সংকোচন করতে হবে। আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তাই সরকার ইচ্ছে করলেও এ মুহূর্তে নতুন করে কোনো ট্যাক্স আরোপ করতে পারছে না। তাহলে ব্যয় সংকোচন করতে হলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ব্যয় কমাতে হবে। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা বা এ ধরনের জনকল্যাণমূলক খাতের ব্যয় হ্রাস করা হলে তা দেশটির ভবিষ্যতের জন্য খুবই খারাপ হতে পারে।







