ঢাকা অফিস : ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন নানামুখী নাটকীয়তায় শেষ পর্যন্ত ভেস্তেই গেল তিস্তা নদীর পানি চুক্তি। তারপর এই চুক্তি নিয়ে হাল ছাড়ছে না বাংলাদেশ। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের এ সফরে তিস্তা চুক্তি না হলেও বাংলাদেশ আশাবাদী, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নদীর পানি বণ্টনে মতৈক্য হবে। তবে সেই মতৈক্য কবে নাগাদ হবে তার কোন দিনক্ষণ জানাতে পারেনি সরকারের কেউই। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের দুই মন্ত্রী বলেছেন, তারা আশা করছেন আগামী তিন মাসের মধ্যেই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হবে।
পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা হতাশ নই। আশা করি, আগামী তিন মাসের মধ্যেই তিস্তার পানি নিয়ে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে পারবো। এ জন্য আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।
একই সুর ছিলো অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কথায়ও। তিনি বলেন, আমরা এ ব্যাপারে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। আশা করছি, তিন মাসের মধ্যেই আমরা এ চুক্তি সম্পন্ন করতে পারবো।
ড. মনমোহনের বহুপ্রতীক্ষিত এ সফরে তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পানি বণ্টন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আপত্তিতে তা আটকে যায়। এর জন্য মমতা ব্যানার্জি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেমন কে দায়ি করেছেন। তিনি বলেছেন, এই বিষয়ে তিস্তা পানি চুক্তির খসড়া তাকে দেখানো হয়নি। যখন জানলেন, বাংলাদেশকে ২৫ভাগের পরিবর্তে ৪৮ভাগ পানির হিস্যা দেয়া হচ্ছে তাতেই বেঁকে বসেন মমতা।
মমতাকে গলাতে শুরু হয় নানামুখী দৌঁড়ঝাপ। তার সাথে যোগাযোগ করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। মনমোহনের পক্ষ থেকে তার সাথে কথা বলেন ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জয়রাম রমেশও। এছাড়া শেষ সময়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন মমতাকে বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছেন। এসময় মেনন মমতাকে বলেছিলেন, আগে চুক্তিটা হয়ে যাক। তারপর আপনি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে আপনার আপত্তির কথা জানাবেন।
সূত্রমতে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকেও ফোনে যোগাযোগ করা হয় মমতার সাথে।
কিন্তু চুক্তি তো দূরের কথা, স্রেফ আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য মনমোহনের সফরঙ্গী হিসেবে বাংলাদেশে আসতেও রাজি করানো যায়নি মমতাকে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধীতার কারণে তিস্তা চুক্তি হয়নি এটি সবার কাছে স্পষ্ট। এখানেই তিনি ক্ষান্ত হননি, এখন মমতা পশ্চিমবঙ্গের তিস্তা প্রকল্প আরো জোরদার করছেন। এতে আরো স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে ঢাকা-দিল্লির তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিটি হওয়ার সম্ভাবনাটি আর কমে গেছে।
এবিষয়ে সম্প্রতি কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকা ‘তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ক্ষুদ্ধ মমতা, রিপোর্ট তলব’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে।
প্রকাশিত খবর অনুয়ায়ী, রাজ্যের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে বাংলাদেশকে তিস্তার পানি দেয়ার ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে তিস্তা চুক্তি বাতিল করতে হয়েছে দিল্লিকে। এ নিয়ে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের ঢাকা সফরে যখন বিস্তর জল ঘোলা হচ্ছে, তখন মহাকরণে বসে তিস্তা প্রকল্পের কাজের হাল হকিকত জেনে নিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
কলকাতার ঐ পত্রিকা লিখেছে, ‘এবং শুধু জানলেনই না, ১৯৭৬ সালে চালু হওয়া তিস্তা প্রকল্পের অগ্রগতি যে মোটেই বলার মতো নয়, ঐ প্রকল্পের মাধ্যমে যত কৃষকের উপকৃত হওয়ার কথা, তাদের বেশির ভাগের কাছেই যে তিস্তার জল এখনও অধরা তা জেনে রীতিমতো অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। কেন এত দিন ঠিক মতো কাজ হয়নি, সেচমন্ত্রী মানস ভুঁইয়ার কাছে তার রিপোর্ট চেয়েছেন মমতা। পাশাপাশি, কেলেঘাই-কপালেশ্বরী প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করতেও এ দিন নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।’
ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সাড়ে তিন দশক আগে শুরু হওয়া তিস্তা প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে বাড়তে ২৯৮৮ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে, যার ৯০ শতাংশই দিচ্ছে কেন্দ্র। প্রকল্প শেষ হলে সাড়ে তিন লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচের বন্দোবস্ত হবে। সেচ দফতরের হিসেব, এ পর্যন্ত কাজ হয়েছে ১২৬৭ কোটি টাকার, যাতে হিসেব মতো ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে জল পৌঁছনোর কথা। কিন্তু তার বদলে মাত্র ৩৬০০ হেক্টর জমিতে পৌঁছেছে সেচের জল!’
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মুখ্যমন্ত্রী মমতা এ দিন সেচমন্ত্রীকে বলেন, ‘এত দিনেও প্রকল্পের কাজ কেন করা যায়নি, দ্রুত তার রিপোর্ট দেবেন। আর কাজটা যাতে দ্রুত করা যায়, তার ব্যবস্থা নেবেন।’
এদিকে তিস্তা চুক্তি না হওয়াকে দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্য করে ঢাকায় সফররত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এক বক্তৃতায় বলেন, তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শেষের দিকে এসে অনাকাক্সিক্ষত কারণে চুক্তিটা হচ্ছে না। আমি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করেছি, যাতে এর একটি নির্ভরযোগ্য সমাধান বের করা যায়। এ নিয়ে জটিলতার অবসানে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
এবিষয়ে বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র বলেন, সামনেই মমতা ব্যানার্জির উপনির্বাচন। এ নির্বাচনে তিনি অংশ নেবেন। তাই তিনি কিছুটা সমস্যায় রয়েছেন। নির্বাচনের পরই তিনি তিস্তা নিয়ে ইতিবাচক সাড়া দেবেন বলে আমরা আশা করছি।
তিস্তা চুক্তির খসড়া তৈরি হওয়ার কথা জানিয়ে রমেশ চন্দ্র বলেন, ঐ খসড়া অনুযায়ীই চুক্তি হবে। তবে তা চূড়ান্ত হবে যৌথ-নদী কমিশনের (জেআরসি) মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকে। সেখানে বসেই উভয়পক্ষ এসব চূড়ান্ত করবো। তবে খসড়ায় পানি বণ্টনের বিষয়ে কী রয়েছে-তা জানাননি মন্ত্রী। জেআরসির ৩৮তম বৈঠক বাংলাদেশে হওয়ার কথা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, উভয় পক্ষের সাথে আলোচনা করে জেআরসির পরবর্তী বৈঠকের দিনক্ষণ আমরা চূড়ান্ত করবো।
তবে আগামীতে তিস্তার পানি ইস্যু কোন নাটকীয়তায় মোড় নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।









