রইসউদ্দিন আরিফ
১. একটি প্রভাবশালী দৈনিকে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয় থেকে ছোট্ট একটি উদ্ধৃতি দিয়ে এই লেখাটি শুরু করতে চাই। উপসম্পাদকীয়টিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সদ্যসমাপ্ত ঐতিহাসিক ঢাকা সফরকালে বহুকাক্সিক্ষত তিস্তা চুক্তি না হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে Ñ“ট্রানজিটকে তিস্তায় ডোবাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বাহাদুরি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর সরকারের এই হুঁশ বিলম্বিত। তবু বলবো, শাবাশ জননেত্রী শেখ হাসিনা” (তিস্তা চুক্তি নিয়ে প্রহসন : মিজানুর রহমান খান : দৈনিক প্রথম আলো : ৮ সেপ্টেম্বর ২০১১)।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ‘বিলম্বিত বাহাদুরি’ Ñ ঢাকায় দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পূর্বমুহূর্তে দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রদর্শিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। আর যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে জননেত্রীর উদ্দেশে বর্ষিত ‘শাবাশ’ প্রবচণটি যতার্থভাবে প্রযোজ্য কি না তা নিয়েও সন্দহ আছে। তাছাড়া সন্দেহ এবং প্রশ্ন আরো নানাদিক দিয়েই আছে। যেমন মনমোহন সিংয়ের ঢাকায় আসার এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ঢাকায় না আসার সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েকদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে ঘোষণা দেন Ñ ‘মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে ট্রানজিট নিয়ে কোনো চুক্তি সই হবে না।’ উপদেষ্টা আরো বলেনÑ‘ট্রানজিট নিয়ে নতুন করে কোনো চুক্তি হওয়ার প্রয়োজনও নেই। কারণ ১৯৭৪ সালে ভারতের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্য ও ট্রানজিট চুক্তির আওতায়ই বিষয়টি সুরাহা হয়েছে।’ (সূত্র : মনমোহন সিংয়ের সফরে ট্রানজিট চুক্তি হচ্ছে না : দৈনিক প্রথম আলো : ২৪ আগস্ট ২০১১)।
এর অর্থ হলো, তিস্তা চুক্তির সাথে ট্রানজিট (করিডোর) চুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। যদি তাই হয় তাহলে ভারত সরকার দুই দেশের সম্পর্কের নতুন ইতিহাস তৈরির নামে যে নতুন চাণক্য খেলায় নেমেছে, সেই ‘খেলার’ ভেতরে মমতার ‘ভেল্কিবাজী খেলা’ যুক্ত হওয়ায় তিস্তা চুক্তি হলো না কারণে আমরাও বাহাদুরি দেখিয়ে ট্রানজিট (করিডোর) চুক্তি করলাম না Ñ এরূপ কোনো কৃতিত্ব খোঁজার কোনোই কারণ নেই। আর তার জন্য কাউকে ‘শাবাশ’ দেওয়ার প্রাসঙ্গিকতায়, নেহাৎ আমাদের অন্ধ আত্মতৃপ্তি ছাড়া আর কোনো মূল্য আছে বলে মনে হয় না। তবুও পুরনো খেলার ভেতরে নতুন খেলা মহিমান্বিত করার জন্য এ ধরনের প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করা হয়। তার জন্য একশ্রেণীর মিডিয়া-স্টারেরা সবসময় প্রস্তুতও থাকেন।
২.
তিস্তা চুক্তির সাথে ট্রানজিট তথা করিডোর চুক্তির প্রাসঙ্গিকতা নীতিগত ও চরিত্রগতভাবেও থাকার কথা নয়। কারণ তিস্তা চুক্তি হচ্ছে Ñ ভারত সরকার, প্রতিবেশী দুই সার্বভৌম দেশের সমঅধিকারভুক্ত অভিন্ন নদী তিস্তার উজানে গজলডোবায় বেআইনী বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তার প্রাপ্য পানি থেকে বঞ্চিত করে দীর্ঘদিন যাবৎ যে জটিল সংকট সৃষ্টি করে রেখেছে, সেই সংকট (কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়া) ভারতের দ্বারাই দূর করার চুক্তি। এর সাথে কোনোকিছু বিনিময়ের প্রসঙ্গ একেবারেই অবান্তর। অভিন্ন নদী তিস্তার প্রাপ্য পানির সাথে কোনোকিছু বিনিময়ের প্রসঙ্গ যদি কেউ তোলে তাহলে বুঝতে হবে, সেটা দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের পুরনো খেলার ভেতরে নতুন খেলা তৈরির তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যদিকে ট্রানজিটের নামে ভারতের সাথে করিডোর চুক্তি হচ্ছে Ñ বাংলাদেশের ভূখন্ডের ওপর দিয়ে ভারতের মূল ভূখন্ড থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংঘাত-সংক্ষুব্ধ অঞ্চলে অবাধ চলাচলের জন্য একটি সামরিক ও নিরাপত্তা চুক্তি।
সুতরাং এটা পরিষ্কার Ñ ভারতের সাথে বাংলাদেশের নদী ও পানি সমস্যা, ছিটমহল ও সীমান্ত সমস্যা, সমুদ্রাঞ্চল অপদখল সমস্যা এবং পর্বতপ্রমাণ বাণিজ্যঘাটতি সমস্যাসহ আরো অনেক সমস্যা (যা এককভাবে ভারত সরকারেরই তৈরি) বর্তমান রয়েছে, সেগুলোর সাথে করিডোর চুক্তির কোনোই সম্পর্ক নাই। তাই এসবের সাথে করিডোরকে গুলিয়ে ফেলারও কোনো অবকাশ নাই। এই বিষয়টিই প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী অন্যভাবে পরিষ্কার করেছেন।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই গুলিয়ে ফেলার কাজটি ভারতের পক্ষ থেকে নয়, বরং বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই করা হয়েছে। দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই কাজটি করেছেন এদেশে ভারতের শাসকশ্রেণীর আশীর্বাদ ও করুণাপ্রাপ্ত রাজনীতিক মহল, সুশীল Ñ বুদ্ধিজীবী মহল এবং বিশেষ শ্রেণীর মিডিয়া-স্টারেরা। এটা খুবই একটা পরিকল্পিত খেলা। এই খেলাটি দীর্ঘদিন যাবৎ চালানো হচ্ছে করিডোরের মতো একটি সামরিক ও নিরাপত্তা চুক্তির ভয়াবহতাকে জনগণের দৃষ্টি থেকে আড়াল করার জন্য। করিডোরের বদলে ট্রানজিট শব্দকে পপুলার করে তোলা হয়েছে এই উদ্দেশ্যেই। তাছাড়া এদের ভাবখানা এই যে Ñ আমরা কি কখনো ভারতকে ট্রানজিট (করিডোর) দিতে পারি কোনো কিছুর বিনিময় ছাড়াই? কিসের বিনিময়ে? তাদের কথামতে ভারতের সাথে আমরা করিডোর চুক্তি করতে পারি তিস্তার পানিবন্টন চুক্তির বিনিময়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, দুই সার্বভৌম দেশের অভিন্ন নদী তিস্তার পানি কি ভারতের একার সম্পদ যে, সেই পানি (দয়ার দান হিসেবে?) পাওয়ার বিনিময়ে ভারতকে আমাদের ভূখন্ডে করিডোর দিতে হবে?
বাংলাদেশে দিল্লি সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট রাজনীতিক, সুশীল, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া-স্টারেরা খেলার ভেতরে আরো খেলা তৈরির জন্য ইদানিং নতুন এক শ্লোগান হাজির করেছেন Ñ‘নদীর বিনিময়ে ট্রানজিট’। তাঁদের প্রচারণাটি হলো এরকম যে, ভারত সরকার যদি আন্তর্জাতিক ও অভিন্ন নদীগুলোর ওপর তৈরি সকল বাঁধ অপসারণ করে নদ-নদীর পানি ভাটির দেশ বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে দেয়, তার বিনিময়ে আমরা ভারতকে আমাদের ভূখন্ডে করিডোর দিতে পারি। এদের কথামতে মনে হয় Ñ ভারত সরকার যেমন বেআইনিভাবে দুই দেশের অভিন্ন নদ-নদীতে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে বড় অন্যায় করেছে, তেমনি আমরাও বুঝি ভারতকে এতোদিন আমাদের ভূখন্ডে করিডোর না দিয়ে ‘বড় অন্যায়’ করেছি। আর তাই ভারত এখন আমাদেরকে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দিয়ে তাদের ‘দায়মোচন’ করলে তার বিনিময়ে আমরাও ভারতকে করিডোর দিয়ে আমাদের ‘দায়মোচন’ করতে পারি! এই শ্রেণীর রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবীদের খেলা-তামাশার অন্ত নেই। তাঁরা এখন নেপাল-ভূটানের সাথে বাংলাদেশের ট্রানজিট, আর বাংলাদেশের ভূখন্ডে ভারতকে দেয়া করিডোর Ñ এ দুটোকে এক বস্তু বলে প্রচার করে বাঙ্গালকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে তিস্তা চুক্তি না হওয়ার বিপরীতে করিডোর চুক্তি না করার ‘বাহাদুরির’ জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ‘শাবাশ’ দেওয়ার বিষয়টিও মনে হয় তিস্তার পানি ও করিডোর এ দুটোকে একত্রে গুলিয়ে ফেলারই ফলাফল।
৩.
খেলার ভেতর খেলা ইতিমধ্যে আরো শুরু হওয়ার আলামত টের পাওয়া যাচ্ছে। মমতা ব্যানার্জি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, একটি অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কেন্দ্রীয় সরকারকে ডিঙ্গিয়ে তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করে এবং চুক্তিটি ভন্ডুল করে সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে শুধু ঔদ্ধত্যপূর্ণ আরচণই করলেন না। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে অন্যরকম এক সংকেতও দিলেন। দিল্লি সরকার যদি আজ হোক-কাল হোক, পানির সমবন্টনের ভিত্তিতে তিস্তা চুক্তিতে সই করেই ফেলে, তাহলে মমতা তখন ‘বিপ্লবী’ সেজে পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের উস্কে দিয়ে উল্টো বাংলাদেশকে তিস্তার পানি লুণ্ঠনকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে বাংলাদেশবিরোধী আন্দোলনে নামাতে পারেন।
ওদিকে পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী জানা যায়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আসাম ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীরা ঢাকায় মনমোহন সিংয়ের সফরসঙ্গী হওয়ার পর নিজ নিজ রাজ্যে ফিরে গিয়ে তোপের মুখে পড়েছেন এই অভিযোগে যে, বাংলাদেশের ভূখন্ডে দিল্লির করিডোর পাওয়ার বিনিময়ে তাঁরা নাকি সীমান্তে দুই রাজ্যের অনেক ভূখন্ড বাংলাদেশকে ছেড়ে দিয়ে এসেছেন। এখানেও পাওয়া যাচ্ছে নতুন খেলার সংকেত। সেটি হচ্ছে, অদূরভবিষ্যতে আসাম-মনিপুর-ত্রিপুরা রাজ্যের (হারানো ভূখন্ড?) উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশবিরোধী আন্দোলনের সংকেত। খেলার ভেতরের খেলা এখন যেরকম জটিল থেকে জটিলতর রূপ পরিগ্রহ করে চলেছে তাতে মনে হয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এই অভিনব খেলার উদ্বোধন শিগ্গিরই হতে যাচ্ছে। মনে হয় Ñ দিল্লির চাণক্য কৌশলের অধীনে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণ, যারা সবসময়ই সা¤্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম-লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ শক্তি, তারা অচিরেই হয়তো পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে বিভেদ ও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে পরাশক্তির নীলনক্শাই বাস্তবায়ন করবে।
কিন্তু পরাশক্তির নীলক্শা যা-ই হোক, এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ এবং প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর মুক্তিকামী জনগণের সুদৃঢ় ঐক্যই কেবল দক্ষিণ এশিয়ার নিপীড়িত জনগণের অধিকার ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত।
রইসউদ্দিন আরিফ : রাজনীতিক, লেখক, কলামিস্ট ঊ-সধরষ : ৎধরংঁফফরহথধৎরভ@ুধযড়ড়.পড়স









