`বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি'

  • PDF

২০১২ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটির ২০১২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। বিশ্বের ৯০টি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আরব বসন্ত পরবর্তী পরিস্থিতির বিশ্লেষন নিয়ে সংস্থাটি ৬৬৫ পৃষ্ঠার একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয় যে, সরকার রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের কার্যক্রম সীমিত করায়, নিপীড়নের ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীকে দায়মুক্তি প্রদান এবং যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও বিডিআর আদালতের আইন সংস্কারে মানাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি এড়িয়ে যাওয়ায় ২০১২ সালে সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

 

এইচআরডব্লিউ জানায়, ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সুস্পষ্টভাবেই লংঘন করা হয়েছে। কারণ যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত বলা হলেও পুরোপুরিভাবে এটিকে ঘরোয়া আদালতে পরিণত করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশীয় অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড এডামস বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আদালত গভীর সমস্যাগ্রস্থ। কারণ ইতোমধ্যেই এই আদালতের বিচারকদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘খুবই দুঃখজনকভাবে অভিযুক্তরা এখন আদালতের অন্যায়-অবিচারের শিকার হবে। এই বিচার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো একদমই আমলে না নিয়ে সরকার এটাই প্রমাণ করছে- তারা আইনের শাসন মেনে চলার চেয়ে বরং ভোটে জিতে ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী।’

‘এমনকি যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞমহল থেকে প্রস্তাব করা সত্ত্বেও এ বিচারের মারাত্মক আইনগত ত্রুটি এবং প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতার বিষয়ে সরকার কোনো কর্ণপাতই করেনি’ যোগ করেন অ্যাডামস।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১২ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পুরো বিচার প্রক্রিয়াটিতেই সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করার বিষয়ে দেখা গেছে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা।

ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চেয়ারম্যান ও ব্রাসেলসের একজন প্রবাসীর মধ্যে চলা গোপন কিছু ই-মেইল ও স্কাইপি আলাপের বিবরণ দিয়ে দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকা একটি কলাম ছাপে। এ থেকে ওই আদালতের চেয়ারম্যান, সরকার, ট্রাইবুনাল এবং প্রবাসীর মধ্যকার বেআইনি যোগাযোগের বিষয়টি প্রকাশিত হয়ে পড়ে। যার ফলে এই বিচার প্রক্রিয়ায় সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের বিষয়টিও ফাঁস হয়ে যায়।

ওই অবৈধ যোগাযোগের অভিযোগে চারটি মামলার পুনরায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি উঠলেও ট্রাইব্যুনাল তাতে কোনো কর্ণপাত করেনি, যা স্পষ্টতই এর নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড এখনও ঘটেই চলেছে। এর পাশাপাশি চলছে বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের গুম হওয়ার অহরহ ঘটনা। একজন সুপরিচিত শ্রমিক নেতাকে অপহরণ ও খুন করা হয় এবং শ্রমিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত অন্যদেরকে হুমকি দেয়া হয়। এছাড়া অনেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়।

‘এ সরকার বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা, একটিভিস্ট ও সমালোচকদের জন্য একটি মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু সরকারকে এখন এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য ন্যূনতম চেষ্টা করতেও দেখা যাচ্ছে না’ বলেন ব্র্যাড এডামস।

এইচআরডব্লিউ জানায়, যদিও বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে একগুচ্ছ শক্তিশালী আইন-কানুন রয়েছে, কিন্তু তার প্রয়োগ  একদমই  নেই বললেই চলে। ফলে ধর্ষণ, যৌতুকের জন্য নিপীড়ন, এসিড সন্ত্রাস, যৌন হয়রানি এবং ফতোয়ার নামে অবৈধ শাস্তি দেয়ার ঘটনা চলছেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পের শ্রমিকরা ভুগছে স্বাস্থ্যগত সমস্যায়। অথচ এ অবস্থার উন্নতি করার জন্য পর্যাপ্ত আইন কানুন থাকলেও তা কার্যকরে কোনো মনোযোগই দেয়া হচ্ছে না।

২০১২ সালের সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগটি ছিল, মানবাধিকার সংস্থাসহ বেসরকারি সংগঠনগুলোর ওপর ক্রমাগত বেড়ে চলা হুমকি, হয়রানি এবং অন্যায় চাপ প্রয়োগের অভিযোগ।

যেসব মানবাধিকার সংস্থা প্রকাশ্যে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তারা অভিযোগ করে, সরকার তাদের রেজিস্ট্রেশন নিয়ে হয়রানি করে এবং তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বিদেশি আর্থিক সহায়তা পেতেও বাধা সৃষ্টি করে।

২০১২ সালে র‌্যাব কর্তৃক বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমে আসলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু নিহতের সংখ্যা খুব একটা কমেনি।

ব্র্যাড এডামস বলেন, সরকার আইনের অপব্যাবহারকরীদেরকে জবাবদিহি করার কথা বললেও এখনও পর্যন্ত র‌্যাবের কোনো অফিসার বা সিনিয়র কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দিতে দেখা যায়নি। অথচ র‌্যাবের বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধে অসংখ্য হত্যা, অপহরণ এবং নিপীড়ন চালানোর স্পষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছ।

২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের অস্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়াও এখনও অব্যাহত রয়েছে। গত জুলাইয়ে এইচআরডব্লিও ওই বিচার প্রক্রিয়ায় নির্যাতন ও মৃত্যু এবং ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া লংঘন করে গণহারে রায় দেয়ার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সরকার ঢালওভাবে ওই প্রতিবেদনের সব অভিযোগই অস্বীকার করে।

বর্তমান সরকার ২০১২ সালে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলাকালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় না দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক আইনি দায়িত্ব লংঘন করে। এমনকি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে সক্রিয় এনজিওগুলোর কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়ে চরম অসহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছে।

এডামস বলেন, সরকার যে কোনো ধরনের সমালোচনাকেই, এমনকি দেশীয় যেসব এনজিও সত্যিকার অর্থেই দেশের পরিস্থিতির উন্নতি চায় তাদের সমালোচনাকেও ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ সরকার যে কারো ব্যাপারেই ‘হয় তুমি আমাদের পক্ষে আর নয়তো তুমি আমাদের শত্রু’ নীতি গ্রহন করেছে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার থেকে শুরু করে বিডিআর বিদ্রোহের বিচার, গার্মেন্টস কারখানায় আগুন এবং শ্রমিক অধিকার সব ক্ষেত্রেই সরকার এই নীতি গ্রহণ করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

Share this post

Add comment


You are here: মূল পাতা প্রতিদিনের খবর `বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি'