মাহবুব মোর্শেদ
সোভিয়েত ইউনিয়ন আর নেই, সে কথা সবার জানা। কিন্তু রাশিয়া বলে যে একটি দেশ আছে সেটিও যেন আমরা ভুলতে বসেছিলাম। অন্তত বাংলাদেশের বেলায় এটি সত্য। রাষ্ট্র সম্পর্কীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ সূত্রে রাশিয়ার নাম বহু বছর বাংলাদেশে উচ্চারিত হয়নি। যেন রাশিয়া আমাদের কাছে যা, ইউক্রেন বা আর্মেনিয়াও তা।
আন্তর্জাতিক নানা সংবাদমাধ্যমের সূত্রে আমরা জানতাম, কমিউনিস্টরা চলে যাবার পর সংস্কারপন্থীরা সেখানে পালাক্রমে শাসন করছে। গত কয়েক মেয়াদে সেখানে পর্যায়ক্রমে চলছে ভোভা ও দিমার শাসন। ভ্লাদিমির পুতিন ও দিমিত্রি মেদবেদেভ রাশিয়ায় ভোভা ও দিমা নামে পরিচিত। এদের দুজনের একজন একবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, একবার রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন। বিষয়গুলো নিয়ে কৌতুক হচ্ছে। কিন্তু রাশিয়ার সেই দিন আর নেই। রাশিয়ার ভিন্নমতাবলম্বী বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকদের নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ার মাতামাতি ও আগ্রহও আর নেই। ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় রাশিয়ার যে প্রভাব ছিল তা এখন ইতিহাসের বইয়ের একটা অধ্যায় মাত্র। তবু তো রাশিয়া একটা দেশ। এর সঙ্গে ঐতিহাসিক একটা সম্পর্ক বাংলাদেশের।
পুরনো আত্মীয়ের অবস্থা খারাপ হলে আমরা তার খবর নেব না তা কী করে হয়। রাশিয়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে, পরেও অনেক করেছে। সে সব কি আমরা ভুলে যাবো। আমাদের কমিউনিস্টরা কি আর রাশিয়ার খবর রাখেন, রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ভাববিনিময় করেন। না করলে খুবই দুঃখের কথা। বুঝতে হবে, আগের সম্পর্ক স্রেফ সুবিধা বাগানোর জন্যই ছিল।
যাই হোক, রাশিয়ার কথা আবার মনে করিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তীব্র শীতের মধ্যে রাশিয়া সফর করে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিলেন সবাইকে। আমাদের আবার ঠাণ্ডাযুদ্ধের স্মৃতি এক ঝলক মনে পড়ে গেল। রাশিয়ার সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি হবে, পরমাণু বিদ্যুত চুক্তি হবে, ভাল কথা। কিন্তু সেটা সরকারের শেষ বেলায় কেন? সরকারের প্রথম বেলায় এমন চুক্তি হলে এতদিনে কাজ কতটা এগিয়ে যেত।
আমাদের সরকারের বিদেশ নীতি বড়ই রহস্যময়। কখন কার সঙ্গে ভাব আর কার সঙ্গে আড়ি বোঝা ভার। প্রথম কয়েক বছর তো মনে হতো। পৃথিবীতে দেশ আছে দুটা। এক বাংলাদেশ আর দুই ভারত। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে বাকী পৃথিবী ঠিকঠাক। তাই আর কোনো দিকে তাকানোর প্রয়োজন আছে বলে মনেই হয়নি হয়তো। সে সম্পর্ক থেকে কী এলো, কী লাভ হলো বিধাতা জানেন। তবে, ভারতের বাইরে তাকাবার ফুসরত অবশেষে মিললো শেষ বেলায় এসে।
এখন রাশিয়া, ইউক্রেনসহ নানা দেশের কথা ধীরে ধীরে মনে পড়ছে। এটা ভাল প্রবণতা। একসময় মনে হতো রাশিয়ার দেবার মতো অনেক কিছু আছে। অনেক কছু নিলেও আমরা কমিউনিজম নেইনি। রুশসাহিত্য প্রচুর এসেছে। এখন রাশিয়ার দেবার মতো যে দুটো জিনিশ আছে। আর তা আমরা নিচ্ছিও। অস্ত্র আর শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি। রাশিয়ার খনিজ সম্পদও আছে, সেটাও নেয়ার প্রস্তাব দেওয়া যায়। আমরা রাশিয়াকে দিতে পারি তৈরী পোশাক। আর কী দেব? অদক্ষ শ্রমিক দেয়া সম্ভব।
রাজনীতিতে রাশিয়া কী দিতে পারে? একই লোক কীভাবে বছরের পর বছর ক্ষমতায় থাকতে পারে তা শেখা যেতে পারে। তবে, এর ফলন বাংলাদেশে ভাল হবে না। বিশ্বব্যবস্থায় রাশিয়া দিতে পারে ভেটো। সিরিয়ার জন্য ভেটো খুব দরকার। কিন্তু আমাদের জন্য? আমাদের দরকার সহজ শর্তে ঋণ। অস্ত্র বা গোলাবারুদ কেনার জন্য নয়। আমরা একটা সেতু বানাবো। এজন্য বিশ্বব্যাংককে বোঝানো দরকার। রাশিয়া কি বিশ্বব্যাংককে বোঝাবে আমাদের হয়ে?
মাহবুব মোর্শেদ: সহকারী সম্পাদক, দৈনিক সমকাল











