জীবন চৌধুরীর কলাম
(পূর্ব প্রকাশের পর)
গায়ত্রী প্রণয়ে যখন শরৎচন্দ্রের হৃদয় সিক্ত তখন ঘটে গেল অপত্যাশিত এক ঘটনা। এই সময় শশাংক মোহন মুখোপাধ্যায় নামে এক লোক এলো রেঙ্গুনে কাঠের কারার করতে। সে মাসিক ৫০ টাকা বেতনে ফ্রেন্ডকে তার অধীনে কাজ দিল। একই বাড়িতে ফ্রেন্ড ও গায়ত্রী থাকেন বলে হঠাৎ একদিন শশাংক গাংত্রীকে দেখে তাকে পাওয়ার আশায় ব্যাকুল হয়ে নানা কু’মতলব আটতে শুরু করলো। এদিকে শরৎ তার একাগ্র ও একচ্ছত্র প্রেমের সাধনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে দেখে প্রমাদ গুণলেন। গায়ত্রী প্রেমে কাউকে ভাগ বসাতে তিনি নারাজ।
একদিন গায়ত্রী নিজের দুর্ভাগ্যের চিন্তায় নিমগ্ন, হঠাৎ শরৎচন্দ্র প্রচন্ড হৃদয়াবেগে বিচলিত হয়ে উদভ্রান্তের মতো তার সামনে উপস্থিত হলেন। গায়ত্রী শরৎচন্দ্রের সন্দেহ প্রবণ দৃষ্টি কারণে ভয়ে পাশের ঘরে পালিয়ে গেলেন। শরৎচন্দ্র অবশ্য তাতে হতাশ হননি। গায়ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনি কি জানেন না আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য শশাংক লোকজন নিয়ে আসছে? তাই আমি আপনাকে রক্ষা করতে ছুটে এসেছি। গায়ত্রী নিরুত্তর। শরৎচন্দ্র বললেন, দয়া করে আপনি বলুন এখন যাবেন কোথায়? এবার গায়ত্রী জবাব দিলেন, মার ইচ্ছা যা হবে উপস্থিততো পথে দাঁড়িয়েছেন। শরৎচন্দ্র উত্তেজিত হয়ে বললেন, পথে দাঁড়িয়েছেন বটে কিন্তু ঘর তৈরি করে নিতে কতক্ষণ? গায়ত্রীর উত্তর সে ঘর মা-ই ঠিক করে দেবেন, আপনাকে করতে হবে না।
গায়ত্রীর কথায় শরৎচন্দ্র তখন হিতাহিত জ্ঞান শূন্য। তিনি পুরা পাগলের মতো জবাব দিলেন, আমার জীবনের মাঝখানে যে আপনার আসন পাতা হয়ে গেছে, গায়ত্রী দেবী। আমাকে একেবারে ঠেলে ফেলে দিয়ে কি আপনি চলে যেতে পারবেন? গায়ত্রী অশ্রু বিজড়িত কণ্ঠে বললেন, আমি সে সৌভাগ্য চাই না। কারণ, আপনি আমার পিতা, আমায় ক্ষমা করুন, আমি যে বড় অসহায়। গায়ত্রীর জবাবে শরৎচন্দ্র রীতিমতো থ হয়ে গেলেন। নিজের উত্তেজনা প্রশমন করলেন। নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জায় আর অনুতাপে তক্ষণি স্থান ত্যাগ করলেন। গায়ত্রী মনে মনে ভাবলেন, উদাসী সাধকের মনেও তাহলে কাক বাসা বাঁধতে পারে। মনে হলো তার পায়ের তলার মাটি যেন ক্রমশঃ সরে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শরৎচন্দ্রের হস্তক্ষেপের ফলেই গায়ত্রী ঠাঁই পেলেন। আবার কুঞ্জুবিহারী বন্দো পাঠাগারের বাড়িতে। শরৎচন্দ্র শশাংকের আশা পূর্ণ করে দিয়েও সেদিন গায়ত্রীকে পাননি। তাই ব্যর্থ প্রেমের বেদনা শরৎচন্দ্রের হৃদয়ও চূর্ণ-বিচুর্ণ করে দিয়েছিল। ফলে তার সৃষ্ট চরিত্র সুরেন্দ্রনাথ রমেশ, সতীশ প্রভৃতির ন্যায় বিধবা নারীকে ভালোবেসে তিনি জীবনের শুধু ব্যর্থতা ও নৈরাশ্যই বরণ করেছেন।
একজন রাজকন্যে Ñ
বার্মায় শরৎচন্দ্রের জীবন সত্যিকার অর্থে বিচিত্র ও রহস্যময় ছিল। কারণ সেখানে একজনের সঙ্গে তিনি গভীর প্রণয় ডোরে বাধা পড়েছিলেন। যদিও সে বাঁধন শেষ পর্যন্ত পরিণয় সুতায় গাঁথা হয়নি। সে প্রেম কাহিনী শরৎচন্দ্রের ঘনিষ্ঠজনরাও সর্বস্তরের বর্ণনা করতে পারেননি। তাই সবার মতই তাদেরও প্রশ্ন রয়ে গেছে, কে সেই রহস্যময়ী রমনী যিনি নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছেন বার্মা প্রবাসী শরৎচন্দ্রকে? তবে শরতের লেখায় পাওয়া যায়: মানুষের নিজস্ব এমন কিছু ঘটনা আছে যাহা কেবল নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সম্ভবত এই উক্তি বার্মার সেই অজানা ঘটনা সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। তবে তার প্রণয়ীর সম্পর্কে জানার মধ্যে এটুকুই জানা গেছে যে, মেয়েটি ছিল অনিন্দ্র্য সুন্দরী। শরৎচন্দ্র এক চিঠিতে তাকে রাজকন্যা বলেছেন এবং তার সঙ্গে দেড় বছর বসবাসও করেছেন। আরেক তথ্যে পাওয়া যায়, বার্মা ছেড়ে কলকাতা চলে এসে শিবপুরে অবস্থান করার সময় শরৎচন্দ্র পানিত্রাসে দিদি দিনি অনিলা দেবীর বাড়িতে প্রয়াই বেড়াতে যেতেন। সঙ্গে থাকতো এক সুন্দরী যুবতী। শরৎচন্দ্র তাকে প্রেমিকা হিসেবে পরিচয় দিতেন।
শরৎচন্দ্রের প্রেমের কাহিনী? পাঠশালা থেকে শুরু করে প্রবাস জীবনে এমনকি নিষিদ্ধ পল্লী পর্যন্ত বিস্তৃত। যখন যেখানে প্রেম চেয়েছেন, পেয়েছেন। কোথাও প্রেম ধন্য হয়েছেন, কোথাও হয়েছেন ব্যর্থ-পার্থক্য শুধু এটুকুই। শরৎচন্দ্র দিল খোলা এবং যুব স্পষ্টবাদী ছিলেন বলেই হয়তো তার পতিতালয়ের বিচিত্র জীবনের কথা নিজেই স্পষ্টভাবে বিভিন্ন সময়ে বলে যেতে পেরেছেন। সাধু সাজিতেছি না, কারণ, এমন পংকিল জীবনে সাধুত্বের ভান খাটবে না। একবার শরৎচন্দ্র বাসন্তী নামক এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী পতিতার কাছে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে শরতের এক সময় চমৎকার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাই প্লেগে আক্রান্ত এই পতিতার সেবা যতœ করতেও কোনো কুণ্ঠাবোধ করেননি শরৎ। এমন আরো চমকপ্রদ ও রোমান্টিক কাহিনী আছে বিজলী, কমলা, মালতী, সুমিত্রা প্রমুখ পতিতার সঙ্গে শরৎচন্দ্রের প্রেম সম্পর্কে। ফলে বিজলী, চন্দ্রমুখী, রাজলক্ষ্মী প্রভৃতি প্রেমময়ী পতিতা নারী তার সাহিত্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মূলত: এসব চরিত্র চিত্রনের ভেতর দিয়ে শরতের নিজের জীবন রূপই প্রতিফলিত হয়েছে। (চলবে)
(পরবর্তী সংখ্যায় শরতের প্রণয় থেকে পরিণয় ও অন্যান্য প্রসঙ্গ)









