Tuesday,
December 18 - December 24 , 2012 > Volume 13 > Issue 04



বিদায় লন্ডন স্বাগত রিও

  • PDF

শ্রেষ্ঠত্ব যুক্তরাষ্ট্রের, বর্ণাঢ্য সমাপনী অনুষ্ঠান

ইলিয়াস খান, অলিম্পিক ভেন্যু লন্ডন থেকে : উদ্বোধনী দিনের মতোই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে শেষ হলো বিশ্ব কাঁপানো লন্ডন অলিম্পিক। অ্যাথলেটিক্সের এ মহাযজ্ঞ দেখতে হলে পৃথিবীকে গুনে গুনে আরও চারটি বছর অপেক্ষা করতে হবে। তাকিয়ে থাকতে হবে ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেরিওর দিকে। ল্যাটিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় দেশ ব্রাজিলের এই শহরটিতেই বসবে ৩১তম গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের আসর। অবশ্য এর আগে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করবে ব্রাজিল।

রোববার রাতে লন্ডনে জমকালো এক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে পর্দা নামলো গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মতো লন্ডন অলিম্পিকের সমাপনী অনুষ্ঠানেও ছিল নানা চমক। সমাপনীর অনুষ্ঠানের কোনো তথ্যই আগেভাগে কোনো মাধ্যমকে জানানো হয়নি। চমক হিসেবে রেখে দেয়া হয়েছিল সবকিছু। ১৬ দিনের প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড়দের অর্জনকেই সমাপনী অনুষ্ঠানে টিভির জায়ান্ট স্ক্রিনগুলোতে ফুটিয়ে তোলা হয়। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আওসি) সভাপতি জ্যাক রগ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘোষণার আগে অলিম্পিক পতাকা তুলে দেন পরবর্তী আসরের আয়োজক ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওর মেয়র অ্যাডোয়ার্ডো পায়েসের হাতে। এর মধ্যদিয়ে নেভানো হয় লন্ডন অলিম্পিকের মশাল। বেজে ওঠে বিদায়ের করুণ সুর। এ সময় পদকজয়ী অনেক অ্যাথলেটের চোখের কোনে পানি ভেসে ওঠে। বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় ‘আ সিমেম্ফানি অব ব্রিটিশ মিউজিক’, নামে আখ্যায়িত সমাপনী অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ শিল্প-সংস্কৃতি আর সঙ্গীতের জয়গান গেয়ে লন্ডন অলিম্পিক স্টেডিয়ামে শুরু হয় ৩০তম শ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের সমাপনী অনুষ্ঠান। তিন ঘণ্টাব্যাপী চলে এ অনুষ্ঠানমালা।

সবার আগে মঞ্চে আসেন এমিলি সানডে। পরবর্তী আধঘণ্টায় জুলিয়ান লয়েড, টিমোথি স্পেল, ম্যাডনেস, মাসেড ব্যান্ড, পেট শপ বয়েজ, ওয়ান ডিরেকশন ও রে ডেভিস পরিবেশন করেন তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলো। তাদের গানে উঠে আসে কসমোপলিটান লন্ডনেরর শিল্প-সংস্কৃতি। সঙ্গে তুলে ধরা হয় অর্ধশতাব্দীতে পপ মিউজিকে ব্রিটেনের নানা অর্জন। সমাপনী অনুষ্ঠানে বহুল জনপ্রিয় গানগুলো গেয়ে শোনান পপ শিল্পীরা। এসব গানের পসরা শুরু হয় কিংবদন্তি জন লেননকে দিয়ে। দেখানো হয় তার আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা পাওয়া ‘ইমাজিন’ এর আসল ফুটেজ। এরপর মঞ্চে আসেন জর্জ মাইকেল। একে একে গেয়ে শোনান ‘ফ্রিডম ৯০’ ও ‘হোয়াইট লাইট’ টাইটেলের গান।

গান শেষ। শুরু হয় সুপার মডেলদের নিয়ে চোখ ধাঁধানো ‘ফ্যাশন শো’। মঞ্চ মাতিয়েছেন ‘স্পাইস গার্লস’, কাইজার চিফ, ডেভিড বাউই, অ্যানি লেনক্স, ডিজে ফ্যাটবয় স্লিম, রাসেল ব্রান্ড, জেসি জে, টায়ো ক্রুজ, বিডি আই, এরিক লেডল, সুসান বুললক, হাকেনি কলিরি ব্যান্ড, রিডিং স্কটিশ পাইপ ব্যান্ড ও মরিস ম্যান।

ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক রাত আড়াইটায় শুরু হয় খেলোয়াড়দের মার্চপাস্ট। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মার্চপাস্টে অ্যাথলেটরা নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধি হিসেবে এলেও সমাপনীতে সবাই এক সঙ্গে বৃহত্ এক জাতির অংশ হিসেবে মাঠে আসেন। ১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিক থেকে এই রীতি চলে আসছে।

কেট বুশের ‘রানি আপ দ্য হিল’ পরিবেশনের সময় উদযাপন করা হয় ১৬ দিনে খেলোয়াড়দের অর্জনকে। মাঠের প্রতিযোগিতা ভুলে খেলোয়াড়রাও নেচে গেয়ে অনুষ্ঠানের উত্সবমুখর পরিবেশকে এনে দেন অন্য এক মাত্রা। রীতি মেনেই পুরুষদের ম্যারাথন জয়ীদের পদক তুলে দেয়া হয় এ সময়। সমাপনী অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আর্টিস্টিক ডিরেক্টর কিম গ্যাভিন।

এদিকে গেমসের সমাপনী দিনে পনেরোটি স্বর্ণ পদকের নিষ্পত্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে এবারের অলিম্পিকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ৪৬টি স্বর্ণ, ২৯ রুপা ও ২৯টি ব্রোঞ্জ নিয়ে মোট ১০৪টি পদক নিয়ে চীনকে পেছনে ফেলে অলিম্পিকে মেডেল তালিকার শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করে দেশটি। এবার নিয়ে মোট ১৬ বার অলিম্পিকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করল আব্রাহাম লিঙ্কনের দেশ।

বেইজিং অলিম্পিকে চমক দেখানো স্বাগতিক চীন প্রথম থেকে লড়াই করে এলেও লন্ডন অলিম্পিকে শেষ পর্যন্ত মেডেল তালিকায় নিজেদের শীর্ষের স্থান ধরে রাখতে পারেনি। ৩৮ স্বর্ণ, ২৭টি রুপা এবং ২৩টি ব্রোঞ্জসহ মোট ৮৮টি মেডেল নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থেকে এবারের আসর শেষ করেছে মাও সেতুংয়ের দেশ। আসরের প্রথম দিকে পিছিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত পদক তালিকায় সম্মানজনক অবস্থানে থেকেই লন্ডন অলিম্পিক শেষ করল স্বাগতিক ব্রিটেনের অ্যাথলেটরা। ২৯টি স্বর্ণ, ১৭টি রুপা এবং ১৯টি ব্রোঞ্জসহ ৬৫টি পদক নিয়ে তৃতীয় স্থানে থেকে আসর শেষ করেছে তারা। ২৪টি স্বর্ণসহ ৮২টি মেডেল নিয়ে চতুর্থ স্থানে থেকে লন্ডন অলিম্পিকের ইতি টেনেছে রাশিয়ান অ্যাটলেটরা। ১৩টি স্বর্ণসহ ২৮টি মেডেল নিয়ে তালিকায় পঞ্চম স্থানে আছে দক্ষিণ কোরিয়া। সমান ১১টি স্বর্ণ নিয়ে ষষ্ঠ ও সপ্তম স্থানে থেকে আসর শেষ করেছে জার্মানি ও ফ্রান্স।

অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘শো’ নতুন কিছু নয়। সেই ১৮৯৬ সালে এথেন্স অলিম্পিকে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। মাঝখানে ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বেশ কয়েকবার যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করলেও অলিম্পিকে দেশটির আধিপত্য কমাতে পারেনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বলতে গেলে অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অবশ্য গত বেইজিং অলিম্পিকে মেডেল তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে প্রথমবারের মতো শীর্ষস্থান দখল করে চমক দেখায় চীন। বেইজিং অলিম্পিকে ৫১টি স্বর্ণ, ২১টি রুপা এবং ২৮টি ব্রোঞ্জ নিয়ে পদক তালিকার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয় স্বাগতিক চীন। এবারও শ্রেষ্ঠত্বের পথে হাঁটলেও যুক্তরাষ্ট্রকে আর পেছনে ফেলতে পারেনি বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এ দেশটি।

লন্ডন অলিম্পিকে বিশ্বের মোট ২০৪টি দেশের ১০ হাজার ৮২০ জন অ্যাথলেট অংশগ্রহণ করে। ২৬টি খেলার ৩০২টি ইভেন্টে স্বর্ণ জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামে তারা। এবারের অলিম্পিকে বাংলাদেশ থেকে পাঁচটি ইভেন্টে পাঁচজন অ্যাথলেট অংশগ্রহণ করে। তারা হলেন সাইক সিজার, শারমীন রতœা, মহফিজুর রহমান সাগর এবং মোহাম্মদ মিলন। এদের কেউই নিজ নিজ ইভেন্টে বাছাই পর্বই উতরাতে পারেননি।

Share this post

Add comment




You are here: প্রথম পৃষ্ঠা বিদায় লন্ডন স্বাগত রিও