Tuesday,
December 18 - December 24 , 2012 > Volume 13 > Issue 04



টান

  • PDF

পেপি চেীধুরী

পর্ব-৩

ড্রেসিং রুমের দরজা বন্ধ করে বড় আয়নাটার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখতে থাকে মিতা। এই মুহূর্তে নিজের ভাগ্যকে নিজেরই ইর্ষা হয়। কপালের দিকে তাকিয়ে ভাবে, এতটুকু কপালে বিধাতা কী এত সুখ লিখেছিলেন!

হঠাৎ দরজায় টোকার শব্দে সম্বিত ফিরে আসে। দ্রুত গোলাপি শাড়ি-ব্লাউজ পাল্টে পরে নেয় কালো জামদানী শাড়ি। আয়নার সামনে বার বার ঘুরে ফিরে দেখে নিজেকে।

পুনরায় টোকা পড়ে দরজায়। ড্রেসিং রুমের দরজা খুলে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে মিতা। লজ্জাবনত দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকে দরজার সামনে।

ক্যামেরা হাতে তৈরিই ছিল পলাশ। পটাপট কয়েকটি ছবি তুলে নেয় মিতার। এরপর ওর হাত ধরে কাছে টেনে নিয়ে আসে। গহনার বাক্স খুলে গলায় মোটা চেনটা পরিয়ে দিতে দিতে বলে, এটার নাম কি জানিস?

মিতা না-সূচক মাথা নাড়ে।

প্রেম ফাঁস। তোকে চিরদিনের মতো প্রেমের ফাঁসে বেঁধে রাখলাম।

সম্মোহিতের ন্যায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে মিতা। টিপের পাতা থেকে একটি কালো টিপ নিয়ে মিতার কপালে পরিয়ে দেয় পলাশ। এরপর দু’হাতে মিতার মুখ তুলে ধরে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে। পলাশের দু’হাতের মাঝে কেঁপে ওঠে মিতার মুখ। নিজের ভিতর এক ধরণের অস্থিরতা অনুভব করে পলাশ। রক্তের মাঝে শুরু হয়ে যায় তোলপাড়।

হঠাৎ সম্বিত ফিরে আসে পলাশের। এ কী করছে সে! যে শুধুই তার, যাকে সে দু’দিন পর নিজের ঘরে তুলছে, কেন তাকে... ! না, নিজের ভালবাসাকে এভাবে কলুষিত করবে না সে। নিজেকে সংযত করে পলাশ। মিতাকে ছেড়ে দিয়ে বলে, আজ তোর হাতের তৈরি চা খাবো, চল একটু চা করবি।

 

ড্রইং রুমে মুখোমুখি সোফায় বসে আছে মিতা এবং পলাশ। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পলাশ বলে,

গ্রামের কথা বল। কেমন আছে কাকীমা, মামুন?

ওদের খবর ভালোই, তবে জানো, রমিজ চাচাকে না কে যেন খুন করেছে! সেই যেদিন তোমার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল, সেদিন রাতের ঘটনা।

মুহূর্তে পলাশের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়।

কে খুন করেছে, জানতে পারলি কিছু?

জানবো কিভাবে? তবে গ্রামের লোকজন বলছে, এ ঘটনায় চেয়ারম্যান চাচার হাত আছে। কারণ জমিজমা নিয়া তার সাথে রমিজ চাচার কয়েক দিন আগে ঝগড়া হয়েছিল।

তাই নাকি!

হ্যাঁ। দেখো, সামনের বছর ইলেকশনে কেউ আর চেয়ারম্যান চাচারে ভোট দেবে না।

রমিজ চাচার মৃত্যুর জন্য?

তা তো আছেই, তাছাড়া তার সম্পর্কে গ্রামের মানুষ নানান কথা বলাবলি করছে...

কী বলছে?

সে নাকি চোরাচালান আরও কী সব কাজের সাথে জড়িত। তার নাকি একটা ক্যাডার বাহিনী আছে, তাগো দিয়াই সব অপকর্ম করায়। ছিঃ এমন মানুষকে  আবার কেউ ভোট দেয়!

তুইও তাকে ঘৃণা করিস?

করবো না? অমন একটা ভালো মানুষরে যে ক্যাডার দিয়া খুন করাতে পারে তার মত খারাপ মানুষ আর কে আছে?

ক্রমে মলিন হয়ে আসে পলাশের মুখমন্ডল। উৎসাহ হারিয়ে ফেলে কথাবার্তায়। বিষন্ন মনে কী যেন চিন্তা করতে থাকে। ওর সে বিষন্নতা লক্ষ্য করে মিতা বলে,

রমিজ চাচার মৃত্যুর খবরটা দিয়ে তোমার মনটা খারাপ করে দিলাম!

হয়তো! ম্লান কন্ঠে বলে পলাশ।

কথাবার্তা আর তেমন জমে না। একসময় পলাশ বলে,

বেলা পড়ে আসছে, চল তোকে পৌছে দিয়ে আসি।

দাঁড়াও আমি জামা কাপড় পাল্টে আসি।

সে কী! তাহলে আমি এসব কিনলাম কার জন্য!

বিস্ময়ে আকাশ থেকে পড়ে পলাশ।

বারে, তোমাকে না তখন বললাম সে কথা!

আমি তো ভেবেছি, তুই দুষ্টুমি করছিস!

তুমি কেন বুঝতে পারছো না, আমাদের মতো অভাবী পরিবারের মেয়ে হঠাৎ এত দামী পোশাক-আসাক নিয়ে বাড়ি ফিরলে মানুষ নানান কথা বলবে। আর মাকে তো জানোই, আমাকে মেরে ফেলবে!

ঠিক আছে, তাহলে এটা তো নিতে পারিস?

এটা আবার কী! একরাশ বিস্ময় ঝরে পড়ে মিতার কন্ঠ হতে।

একটা মোবাইল সেট।

তুমি কেন বুঝতে চাইছো না আমার সমস্যা!

আমি তোর সমস্যা বুঝতে পারছি। কিন্তু তোর সাথে যোগাযোগের আর তো কোন উপায় নেই। প্রথম বার দেখা হওয়ার দুই মাস তের দিন পর দ্বিতীয়বার দেখা হলো। এ ক’টা দিন আমার কীভাবে কেটেছে সে তুই বুঝতে পারবি না। সারাক্ষণ ছটফট করেছি তোকে একটিবার দেখার জন্য, অথচ... !

কেন, সোজা চলে যেতে আমাদের বাড়ি। গিয়ে মাকে নিজের পরিচয়টা দিয়ে দিতে।

এই মুহূর্তে গ্রামে যাওয়ায় আমার একটু অসুবিধা আছে। তবে আশা করছি মাস খানেকের ভিতর সব সমস্যা মিটে যাবে। কিন্তু ততদিন তোকে না দেখে, তোর সাথে কথা না বলে থাকতে পারবো না।

তোমাকে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না! নিজের গ্রামে যেতে তোমার সমস্যাটা কোথায়?

তোকে আমি পরে সব খুলে বলবো।

সে তো প্রথম দিন থেকেই বলছো, কিন্তু বলছো কই?

বলবো রে বলবো! আরে পাগলী তোকে বলবো না তো আর কাকে বলবো? তুই ছাড়া এ পৃথিবীতে আমার আপনজন আর কেউ আছে? নে এবার মোবাইল অপারেট করার নিয়মটা মন দিয়ে দেখে নে।

না, আমি দেখবো না...

কেন?

তুমি বুঝতে পারছো না, এটা যখন বেজে উঠবে তখনই তো আমি ধরা পড়ে যাবো!

তুই যাতে ধরা না পড়িস সে ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি।

কিভাবে?

মিতার প্রশ্নে পলাশ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,

শোন, তোর মোবাইল কখনও বাজবে না। এটাতে ভাইব্রেশান দেয়া থাকবে। সারাদিন তুই এটা বন্ধ করে রাখবি। রাতে কাকীমারা সবাই ঘুমিয়ে গেলে তুই এটা অন্ করে আমাকে একটা মিসকল দিবি। আমি তোকে ফোন করবো। কিন্তু তোর মোবাইলে কোন শব্দ হবে না, কেবল কাঁপবে। তখন তুই এই সুইচটা অন করে আমার সঙ্গে কথা বলবি। কথা শেষ হয়ে গেলে আবার এইভাবে সুইচ টিপে অফ্ করে রাখবি। আবার দিনের বেলা কখনও তোর হয়তো আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করলো, তখন ঠিক এইভাবে আমায় মিসকল দিবি। আর রাতের বেলা মাঝে মাঝে এভাবে চার্জ দিবি।

এতক্ষণে মিতার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। উৎফুল্ল কন্ঠে বলে,

সত্যি একটা মোবাইলের আমার খুব প্রয়োজন ছিল। এখন থেকে যখন ইচ্ছে তোমার সাথে কথা বলতে পারবো। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

থাক আর পাকামো করতে হবে না। এবার চল তোকে পৌঁছে দিয়ে আসি। তবে তার আগে আমাকে একটা সত্যি কথা বলে যা।

কী?

ইতস্তত: করে পলাশ বলে, তুই যদি কখনও জানতে পারিস, তুই যে পলাশকে চিনিস তার অন্য একটি পরিচয় আছে। যদি কখনও  জানতে পারিস আমি খুব খারাপ একজন মানুষজ্জতখন কী করবি?

কী সব আজেবাজে কথা বলছো, তুমি খারাপ হতে যাবে কেন! আমি জানি, তুমি কখনও খারাপ কোন কাজ করতে পারো না। নাও এবার চলো তো, সন্ধ্যা হয়ে আসছে।

গাড়িতে বসে আর তেমন কোন কথা হয় না দুজনের। কোথায় যেন তাল কেটে গেছে! মিতাকে কিছু বলতে চায় পলাশ, যা তার একান্ত নিজের কথা! তার কষ্টের কথা, তার গ্লানির কথা! যা কেবল মাত্র মিতাকেই বলা যায়, কারণ এ পৃথিবীতে মিতাই তার একমাত্র আপন জন!

অনেক চেষ্টা করেও মনের কথাটি মুখে আনতে পারে না পলাশ। কয়েক বার অ্যাক্সিডেন্ট করতে করতে সামলে নেয় নিজেকে। ভয়ে আঁতকে ওঠে মিতা। ভাবে,

রমিজ চাচার মৃত্যুতে মনে বড় কষ্ট পেয়েছে পলাশ! আসলে ওর মনটা খুবই কোমল!

পলাশ ভাবে, মিতা সন্ত্রাসীদের ঘৃণা করে!

মিতাকে পৌঁছে দিয়ে পলাশ যখন নিজের ফ্লাটে পৌঁছায় তখন রাত প্রায় ন’টার কাছাকাছি। ঘরে প্রবেশ করে মনটা বার বার আনমনা হয়ে যায়। কেবলই মনে হতে থাকে, মিতা যেদিন জানবে তার আসল পরিচয়, সেদিন কী হবে! ওর কথাবার্তা থেকে যেটুকু বুঝেছে, তাতে মনে হয়েছে, ও কখনও স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে না বিষয়টি। তাছাড়া ও কবির কাকার মেয়ে। কবির কাকা ছিলেন অসম্ভব সৎ এবং নীতিবান একজন মানুষ। তার মেয়ে কোন অন্যায়কে মেনে নেবে না এটাই তো স্বাভাবিক!

ভাবতে ভাবতে একরাশ হতাশায় মনটা ছেয়ে যায়। ক্লান্তিতে হাত পা অবশ হয়ে আসে। খাটের পরে শুতে গিয়ে চোখে পড়ে, বিছানার কোণে মিতা তার শাড়ি-গহনা পরিপাটি করে গুছিয়ে রেখে গেছে। স্টীল আলমারীতে সে সব তুলে রেখে বিছানায় দেহ এলিয়ে দেয় পলাশ। বড় অস্থির লাগে তার। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভয়ংকর কিছু স্মৃতি।

(চলবে)

Share this post

Add comment




You are here: ফিচার সাহিত্য টান