Tuesday,
December 18 - December 24 , 2012 > Volume 13 > Issue 04



বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন চাইলে বাগাড়ম্বরিতা নয়

  • PDF

বিশেষ প্রতিনিধি : পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণচুক্তি প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জাইকা প্রেসিডেন্টের গত ২৬ জুলাইর বৈঠক শেষে কিছুটা আশার আলোক ঝলকানি দেখা দিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ শীর্ষ পর্যায়ে যে উল্টাপাল্টা বক্তব্য হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের মধ্যে বিরক্তির সৃষ্টি করেছে বলে একটি সূত্র জুিনয়েছে। দায়িত্বশীল এই সূত্র বলেছে বিষয়টিতে বিশ্বব্যাংকের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের সুক্ষ পর্যবেক্ষনে রয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিপরীত মুখি নানা বক্ত্যব্য রিভিউ পিটিশনটি বিবেচনার পক্ষে সহায়ক হবে না। এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকগণও এমনটি মনে করছেন। তারা মনে করছেন খোদ বাংলাদেশ সরকারই সেতুর জন্য বিশ্বব্যাংকের ঋণ গ্রহণে আন্তরিক নয়। আর বিশ্বব্যাংকের মন গলাতে হলে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বাগাড়ম্ভিতা বন্ধ করে যথাযথ এক্সপার্ট পর্যায়ে সমাধানের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে। সরকারকে স্ববিরোধিতা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে।

এর আগে রিভিও পিটিশনটি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিশ্বব্যাংক দেখছে এই মর্মে একটি দায়িত্বশীল সূত্র থেকে আভাস পাওয়া গিয়েছিল। গত ২৩ জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্র সফররত জাইকা প্রেসিডেন্ট আকিহিতো তানাকা ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক সদর দপ্তরে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ংয়ের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠকে মিলিত হন। এ বৈঠকে বাংলাদেশ ও পদ্মা সেতু বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিশ্বব্যাংকের কর্পোরেট কম্যুনিকেশন্স ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র কম্যুনিকেশন্স অফিসার ফ্রেড জোনস। এছাড়াও বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন অর্থায়নের বৃহত্তম আশ্রয় বলে খ্যাত এ দু’টি অর্থলগ্নীকারী সংস্থার দুই প্রধানের মধ্যে এ মিটিংয়ে  বিশ্বব্যাপী সংস্থা দু’টির চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বর্তমান গতিপ্রকৃতি এবং ভবিষ্যতে বেশ কিছু প্রকল্পে যৌথ অর্থায়নের বিষয়েও বিশদ আলোচনা হয়। বৈঠকে জাইকা প্রেসিডেন্ট বিশ্বব্যাপী সংস্থা দু’টির পার্টনার কান্ট্রিগুলোতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক, ইউএসআইডিসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে আরও বেশি দক্ষ ও কার্যকর সমন্বয় ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য জাইকার পক্ষ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে ফ্রেড জোন্স জানান, বিশ্বব্যাংক প্রধান ও জাইকা প্রেসিডেন্টের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে আলোচনায় এসেছে, তবে এ বিষয়ে এখনও কোন অফিসিয়াল সিদ্ধান্ত না হওয়ায় সরাসরি কোন মন্তব্যের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছিলেন।

এছাড়া বিশ্বব্যাংকের সাউথ এশিয়া এক্সটার্নাল এফেয়ার্সের ম্যানেজার অ্যানজেলা ওয়াকার এ প্রতিবেদকের সঙ্গে টেলিফোন আলাপ ও ই-মেইল বার্তার বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের পক্ষ থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি বিষয়টি পুনর্বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ সংবলিত চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার এবং বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জাইকার প্রেসিডেন্টের মিটিংয়ে বাংলাদেশ ও পদ্মা সেতু বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। অ্যানজেলা আরও জানান, ঋণচুক্তি পুনর্বিবেচনা বা বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো যদিও কিছুটা সময়সাপেক্ষ তবে দেরিতে হলেও বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ায় বিশ্বব্যাংকের পক্ষে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণচুক্তির বিষয়টি এখন ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছিল এবং সম্ভবত খুব শিগগিরই এ বিষয়ে অফিসিয়ালি বাংলাদেশকে জানানো হবে- জানিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, এর আগে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়টিকে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রতি হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের সমর্থনে বিগত সেপ্টেম্বর ২০১১ এবং এপ্রিল ২০১২ তারিখে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের নিকট বিশ্বব্যাংকের ভাষায় যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত দাখিল করে এবং এর একটি গ্রহণযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানায়। পরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের সঙ্গে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের বিপুল মানুষের আশা আকাঙক্ষা, জীবনমান ও ভাগ্যোন্নয়ন জড়িত থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে ব্যাংকের অবস্থান বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার জন্য ব্যাংকের একটি উচ্চ পর্যায়ের টিম বাংলাদেশ সফর করে। কিন্তু এরপরও সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত বিষয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি না দেখে বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে বাংলাদেশকে সাহায্য করার মানসে একটি তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে কমপক্ষে তিনটি বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নিতে সরকারকে চিঠি দেয়। এ বিষয়গুলো ছিল: ১. তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সকল অভিযুক্তদের চাকরি থেকে ছুটি, ২. তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি স্পেশাল তদন্ত কমিটি গঠন, এবং ৩. সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে পরবর্তী দিকনিন্দেশনার জন্য বিশ্বব্যাংক নিয়োজিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্যানেলের কাছে তদন্ত সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা। পরে বাংলাদেশ সরকার এসব বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যবস্থা নেয়নি উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট তার শেষ কর্মদিবসের আগে বিগত ২৯শে জুন পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল ঘোষণা করে এবং নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিগত ২রা জুলাই ২০১২ বর্তমান প্রেসিডেন্ট কিম ইয়ং বিদায়ী প্রেসিডেন্টের এ সিদ্ধান্তকে যথার্থ বলে মন্তব্য করেন।

এর পর গত সপ্তাহে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করেন। সাবেক যোগাযোগ সচিব মোশাররফ হোসেন ভুইয়াকেও পাঠানো হয় ছুটিতে এবং দুর্নীতির তদন্ত পরিচালনায় গঠিত অনুসন্ধানী দলে বিশ্বব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধির উপস্থিতি মেনে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তিন সদস্যের একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রসিকিউশন ও দক্ষ অনুসন্ধানী টিম গঠনে আনুষ্ঠানিক সম্মতি জানায়। আর এসব তথ্য জানিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণচুক্তি বাতিলের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করে গতকাল বিশ্বব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।

এদিকে বিশ্বব্যাংকের উপরিল্লিখিত দু’টি সূত্রের একটি সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য বিশ্বব্যাংকের দেয়া প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে  বাংলাদেশ সরকারের নেয়া সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো এখন পর্যবেক্ষণ করছে বিশ্বব্যাংক। মূলত এ বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তরিকতার প্রমাণ পাওয়া গেলে এবং আর কোন ফাঁকফোঁকর নেই তা নিশ্চিত হওয়া গেলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তে আসতে পারে বিশ্বব্যাংক। নতুন করে চুক্তি হতে পারে না কি আগের চুক্তিই বহাল থাকবে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় নির্মাণ খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি কি হবে- এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে সূত্রটি জানায় এ বিষয়গুলার জবাব দেয়ার এখনই উপযুক্ত সময় নয়। এ বিষয়ে কলাম্বিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক, যিনি তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন অর্থনীতি এবং জাতিসংঘ মিলেনিয়াম লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করে খ্যাতিলাভ করেছেন, তার এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় এ প্রতিনিধিকে জানান, এরকম পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের উচিত বিশাল জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন আকাঙক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া, এর ফলে তৃতীয় বিশ্বের সরকারগুলোর মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী দায়বদ্ধতা আরও উৎসাহিত হবে।

Share this post

Add comment




You are here: প্রথম পৃষ্ঠা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন চাইলে বাগাড়ম্বরিতা নয়