রানা রায়হান : হুমায়ূন আহমেদের সম্পত্তি নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করার ব্যাপারে জটিলতা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। এ পর্যন্ত ট্রাস্ট গঠন বিষয়ে আইন এবং লেখকের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।
নিউইয়র্ক থেকে ফিরে গণমাধ্যমের কাছে শাওন জানান, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদ তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি দেখভালের জন্য একটি বোর্ড অব ট্রাস্টি গঠনের কথা বলে গেছেন। তিনি লেখকের স্বপ্নপূরণ করবেন বলেও জানান।
হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব বিষয়টি নিয়ে বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “মৃত্যুর আগে বড় ভাই ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের বিষয়ে কথা বলে গেছেন। তার ইচ্ছা ছিল জীবদ্দশায় এমন একটি বোর্ড করার। কিন্তু তিনি তা করে যেতে পারলেন না।”
আহসান হাবীব বলেন, “হুমায়ূন আহমেদের সম্পত্তির যারা উত্তরাধিকারী তারাই এ বিষয়ে কথা বলতে পারবেন। আমি তো আর উত্তরাধিকারী নই।”
তবে এ বিষয়ে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন আহসান হাবীব।
হুমায়ূন আহমেদের আরেক ছোটভাই, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশিষ্ট লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল অবশ্য টেলিফোনে এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে, ট্রাস্ট গঠন বিষয়ে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বাংলানিউজকে বলেন, “হুমায়ূন আহমেদের সম্পত্তির যারা ওয়ারিশ, তারা চাইলে ট্রাস্ট হতে পারে। তবে সবাই না চাইলে এটা হবে না। সেক্ষেত্রে একজনও যদি ট্রাস্ট করার ব্যাপারে আপত্তি জানায়, তাহলে সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে হবে।”
ব্যারিস্টার রফিকের মতে, “মেহের আফরোজ শাওনের একার সিদ্ধান্তে ট্রাস্ট গঠন সম্ভব না। তবে শাওন যদি তার ভাগে পাওয়া সম্পত্তি নিয়ে ট্রাস্ট করেন, তবে তা হবে।”
তিনি জানান, হুমায়ূনের অপর পক্ষের (গুলতেকিনের) চার ছেলেমেয়ে তার উত্তরাধিকারী হবেন। বিচ্ছেদ হওয়ায় গুলতেকিন কোনো অংশ পাবেন না। এছাড়া শাওন ও তার দুই ছোট ছেলেও সম্পত্তির ওয়ারিশ।
বোর্ড অব ট্রাস্টি গঠন বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাড. আহসানুল করিম বাংলানিউজকে বলেন, “মৃত্যুর আগে হুমায়ূন আহমেদ ট্রাস্ট গঠন না করে গেলে, তার সব সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে।”
তিনি বলেন, “লেখক যদি কারো নামে সম্পত্তি গিফট করে যান, সেই সম্পত্তির নামে ট্রাস্ট হতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা যতদূর জানি, হুমায়ূন আহমেদ কাউকে কোনো সম্পত্তি গিফট করে যাননি। সেকারণে মেহের আফরোজ শাওন তার একার সিদ্ধান্তে ট্রাস্ট গঠন করলে তা আইনসিদ্ধ হবে না।”
বিষয়টিতে কথা বলতে মেহের আফরোজ শাওনকে ফোন করা হলে শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তবে তার সঙ্গে থাকা ঘনিষ্ঠ একজনের মাধ্যমে শাওন এই প্রতিবেদককে বলেন, “হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্ন পূরণের অংশ হিসেবে ট্রাস্ট গঠন করা হবে। হুমায়ূনের স্বপ্ন পূরণ করতে যা কিছু করা দরকার তা তিনি করবেন।”
শাওনের মা তহুরা আলী এমপি বাংলানিউজকে বলেন, “এ মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা অত্যন্ত কষ্টকর। তবুও শাওন সংবাদ মাধ্যমের কাছে অনেক কথাই বলেছে। সেটা আপনারাও শুনেছেন। তবে হুমায়ূনের চিন্তা ছিল ট্রাস্ট গঠন করার ব্যাপারে।”
তিনি আরও বলেন, “আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়। আইন অনুযায়ী সবকিছু করা হবে।”
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, হুমায়ূনের লেখা বই এবং চলচ্চিত্র ইত্যাদি নিয়ে ব্যবসা করার দূরভিসন্ধি নিয়েই বোর্ড অব ট্রাস্টি গঠন করার কথা বলা হচ্ছে। মৃত্যুর আগে প্রায় ৩২২টি বই লিখে গেছেন হুমায়ূন। এছাড়া তার পরিচালিত সাতটি চলচ্চিত্র রয়েছে।
এর আগে হুমায়ূন আহমেদের নিজের হাতে গড়া নুহাশপল্লীকে ট্রাস্টে পরিণত করবেন বলে জানান মেহের আফরোজ শাওন। গত মঙ্গলবার দুপুরে নুহাশপল্লীর লিচুতলায় দাফন শেষে শাওন সাংবাদিকদের বলেন, “এই নুহাশপল্লীকে একটি ট্রাস্ট করতে চেয়েছিলেন হুমায়ূন। কিন্তু তিনি তা করে যেতে পারলেন না।”
“আমার যদি কোনো সুযোগ থাকে তাহলে তার ইচ্ছা পূরণে আমি চেষ্টা করব।” নুহাশপল্লীকে হুমায়ূন একটি ইনস্টিটিউট হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন বলেও জানান শাওন।
১৯৯৭ সালে ৪০ বিঘা জমির ওপর নুহাশপল্লী নামের একটি বাগান বাড়ি গড়ে তোলেন হুমায়ূন। প্রায় ৩০০ প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছের এই বাগান।
গত ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে মারা যান ক্যান্সারে আক্রান্ত হুমায়ূন আহমেদ। তিনি প্রথম স্ত্রীর গর্ভজাত নোভা, শিলা ও বিপাশা নামে তিন মেয়ে ও নুহাশ নামে এক পুত্র এবং দ্বিতীয় স্ত্রী শাওনের পক্ষের দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিতকে রেখে গেছেন। প্রথম স্ত্রী গুলতেকিনের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হয় হুমায়ূন আহমেদের।
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম





