
ঢাকা অফিস : জননন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকে তার সবচেয়ে প্রিয়স্থান গাজীপুরের নুহাশ পল্লীর লিচুতলার শীতল ছায়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে বাংলাদেশ সময় বেলা ১টা ৪০ মিনিটে। বাংলাদেশে সময় দুপুর ২টায় মধ্যে তার পুরো দাফন কাজ সম্পন্ন হয়। দাফনের সময় কবরের পাশে উপস্থিত ছিলেন তার পরিবারের সদস্যরা। তাদের মধ্যে ছিলেন তার মা আয়েশা ফয়েজ, স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও তার দুই পুত্র সন্তান নিষাদ ও নিনিত এবং প্রথম পক্ষের সন্তান নোভা, শিলা, ও নুহাশ। আরও ছিলেন তার ছোট ভাই অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, তার স্ত্রী ইয়াসমিন হক, আরেক ভাই আহসান হাবীব।
অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধু সালেহ চৌধুরী, অন্যপ্রকাশের সত্ত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলামসহ টিভি ও চলচ্চিত্রের তারকাবৃন্দ।
দাফনের আগে নুহাশ পল্লীতে দুপুর দেড়টায় তার তৃতীয় ও শেষ নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ জানাজায় অংশ নেন এবং লেখকের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন। জানাজা পড়ান মুন্সি মজিবুর রহমান।
জানাজায় অংশ নেন স্থানীয় এমপি ও গাজীপুর জেলার আওয়ামী লীগ সভাপতি আকম মোজাম্মেল হক, জেলা প্রশাসক নূরুল ইসলাম, জেলা পরিষদের প্রশাসক আত্তারুজ্জামানসহ হাজারো মানুষ।
দাফনের পর হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন সাংবাদিকদের বলেন, হুমায়ূন আহমেদের শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করায় আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি কৃতজ্ঞ আমার শাশুড়ি, পরিবারের সদস্য ও মিডিয়ার কাছে। কারণ বিষয়টি উপলদ্ধি করে সবাই তাকে তার প্রিয় স্থানে দাফন করতে অবদান রেখেছেন।
তিনি বলেন, নুহাশ পল্লীকে বিশ্ব সাহিত্য ইনস্টিটিউট করার উদ্যোগ নেয়া হবে। এতে তিনি পরিবারের সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি নুহাশ পল্লীকে ট্রাস্টি করার জন্যও পরিবারের সকলের সহযোগিতা চান।
এদিকে সোমবার দিনভর দাফনের বিষয়টি চূড়ান্ত না হওয়ায় লেখককে কোথায় সমাহিত করা হবে তা নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছিল। গভীর রাত পর্যন্ত মতবিরোধ চলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে।
পরিবারের মতদ্বৈততার অবসান ঘটাতে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতারা কয়েক দফা দুই পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তার স্ত্রী শাওনের ইচ্ছাকেই মেনে নিতে হয় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের।
রাত আড়াইটায় সংসদ ভবন এলাকায় নানকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে হুমায়ূনের ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল সাংবাদিকদের বলেন, নুহাশ পল্লীতেই দাফনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি জানান, তার ভাইয়ের প্রথম পক্ষের সন্তানরা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফনের ইচ্ছা ব্যক্ত করলেও তা আর গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তার স্ত্রীর ইচ্ছা অনুয়ায়ী আজ মঙ্গলবার বাদ জোহর তাকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করার কথা তিনি জানান।
মধ্য রাতের এ ঘোষণার পর মঙ্গলবার ভোর থেকেই নুহাশ পল্লীতে জনতার ভিড় বাড়তে থাকে। শুভানুধ্যায়ী ও ভক্তসহ সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে। তার মরদেহ দুপুর সোয়া ১২টার দিকে নুহাশ পল্লীতে পৌঁছলে এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
তাকে এক নজর দেখার জন্য সেখানে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। শোকের ছায়ায় ঢেকে যায় নুহাশ পল্লীসহ পুরো গাজীপুর জেলা।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও থানা থেকে তার ভক্তরা তাদের প্রিয় লেখকের শেষযাত্রায় অংশ নিয়ে প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কাঁদতে থাকেন অনেকে।
হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ পৌঁছার আগেই নুহাশ পল্লীতে যান তার প্রথম পক্ষের সন্তান মেয়ে নোভা ও শীলা এবং পুত্র নুহাশ। তাদের সঙ্গে আরও ছিলেন লেখকের ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও আহসান হাবীবসহ অন্য স্বজনেরা।
আর হুমায়ূন আহমেদের মরদেহের সঙ্গে যান স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও তার পরিবারের সদস্যরা।
নুহাশ পল্লীর ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বুলবুল সাংবাদিকদের জানান, জীবদ্দশায় হুমায়ূন আহমেদ যেমন এখানে থাকতে ভালোবাসতেন, তেমনি মৃত্যুর পরও এখানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তার সে ইচ্ছা আজ পূরণ হলো।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সময় গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ২০ মিনিটে হুমায়ূন আহমেদ আমেরিকার নিউ ইয়র্কে ম্যানহাটন বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ সময় তার পাশে ছিলেন স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, ছোটভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং বন্ধু মাজহারুল ইসলামসহ আরো স্বজনরা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর।
তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন তার সৃজনশীল প্রতিভা দ্বারা।









