ইমেজ পুনরুদ্ধারে মরিয়া সরকার

  • PDF

নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু (!) : ডলার সঙ্কট তীব্র হবে : চাপ বাড়বে রিজার্ভে : অসহনীয় হবে মূল্যস্ফীতি

বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্ব ব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিলের ফলে দেশ ও বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের যে ইমেজ ক্ষুণœ হয়েছে তা পুনরুদ্ধারে মরিয়া মহাজোট সরকার। এর আগে গত সাড়ে তিন বছরের নানা ইস্যুতে সরকারের ইমেজ ক্ষুণœ হলেও সব কিছুই যেন চাপা পড়েছে একটির নিচে অন্যটি। কিন্তু পদ্মা সেতুর বিষয়টি ভিন্ন মাত্রায় মোর নিয়েছে। এতে শুধু সরকারের ইমেজের ইমেজই নয়, জাতির ললাটেও অপমানের তিলক লেপ্টে দিয়েছে।

পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির কারণে বিশ্ব ব্যাংকের মুখ ঘুরিয়ে নেয়া, দেশের ভাবমূর্তি ও মহাজোট সরকারের এই ক্ষুণœ ইমেজ পুনরুদ্ধারের জন্য এই মুহূর্তে যে কোন মূল্যে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বহুমুখি সংকটে পড়বে দেশের অর্থনীতি। বিগত কয়েক বছর ধরে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের ফলে এমনিতেই তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশীয় বিনিয়োগে পদ্মা সেতু তৈরি হলে শিল্পে বিনিয়োগ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে এবং উন্নয়ন কর্মকা- বন্ধ হয়ে যাবে। যদিও গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে বলেছেন, উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ রেখে পদ্মা সেতুর টাকা জোগাড় করা হবে।

তিনি মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর অধীনে থাকা চলমান প্রকল্পগুলো রেখে অন্যসব দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প আপাতত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিযেছেন।

সেই সঙ্গে বহুল আলোচিত এ সেতুতে অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংককে আর কোন অনুরোধ না জানানো হবে না বলেও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তারপরও একই দিনে বিকালে দাতা দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মূলত বিশ্বব্যাংককে রাজি করাতে অন্য দাতা সংস্থার সাহায্যও চেয়েছেন-যদিও সে সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষণ বললেই চলে।

এদিকে, দেশের অর্থনীতিবিদরা সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু করা হলে ডলারের সঙ্কট তীব্র হবে, রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি আরও অসহনীয় হবে। এতে মুদ্রাবাজার হবে ভারসাম্যহীন এবং চূড়ান্ত বিচারে এ প্রকল্প টেকসই হবে না। অনেকেই সরকারের এই উদ্যোগকে ‘অপরিপক্ক’ বলে মন্তব্য করেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার দেশকে একটি ভয়ানক অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকা- বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, এত বড় প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের সামর্থ্য আমাদের নেই। কারণ আমাদের সঞ্চয় ও জাতীয় উৎপাদন খুবই কম। পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে বিনিয়োগ করা হলে আমাদের মোট জাতীয় উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয়ে যাবে। এতে আমাদের শিল্পে বিনিয়োগ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে; বন্ধ হয়ে যাবে কলকারখানার কাঁচামাল আমদানি।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলে মুদ্রাবাজারে ভারসাম্যহীনতা নেমে আসবে বলেও মনে করেন ড. সালেহ উদ্দিন। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য অধিকাংশ উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। আর এর মূল্য পরিশোধ করতে হবে ডলারে। এতে রিজার্ভের পরিমাণ অনেক কমে আসবে। এর প্রভাবে বিদেশের অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে বাংলাদেশী মুদ্রার দাম কমে যাবে। এতে অর্থনীতিতে আরেক দফা মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হবে বলে তিনি মনে করেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এ বছর ৩,১৯৭ কোটি টাকা জোগাড় করা কঠিন কিছু নয়। তবে আগামী দুই বছরে বাজেট থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা করে জোগাড় করা কঠিন হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই অর্থ শিক্ষা না স্বাস্থ্য খাত থেকে কাটা হবে তা আমরা জানি না। অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করা হয়নি। এভাবে অর্থের উৎস নিশ্চিত না করে প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব নয়।

এভাবে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন অর্থনৈতিকভাবে কতটা সাশ্রয়ী হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ব্যবহারকারীদের চার্জ কত হবে, একটা গাড়ির জন্য ৩-৪ হাজার টাকা হবে না কি ৫০০ টাকা হবে তা নিশ্চিত নয়। এটা যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত শুধু অর্থায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে কোনো প্রকল্প টেকসই হবে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান বলেন, দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হলে সরকারের দাতাগোষ্ঠীর কাছে ঋণ গ্রহণের জন্য যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। যদি দেশের অভ্যন্তরীণ খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, তাহলে যে খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হবে সেই খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাবে। এর ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। দেশীয় অর্থ ব্যবহার করা হলে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে খরচ করতে হবে। এর প্রভাবে আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিনিযোগ করা হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। অন্যদিকে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি যে টাকার দেয়ার কথা বলছে তা বিনিয়োগ করা আছে। ফলে এ টাকা দেয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই। দিলেও তাদের উচ্চসুদ দিতে হবে। অন্যদিকে দুর্নীতির কারণে বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিল করেছে, ফলে সেই দুর্নীতির বিষয়টি আগে ফয়সালা করতে হবে। নিজস্ব অর্থায়নে যদি পদ্মা সেতু করা সম্ভব হতো তবে বিশ্বব্যাংকের কাছে আগে আমরা যেতাম না। সরকারের উচিত হবে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি সমঝোতায় পৌঁছনো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবহার করে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করা হলে অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ খুবই কম। রিজার্ভ যদি আরও কমে যায় তাহলে বিদেশি মুদ্রার বিপরীতে টাকার মূল্যমান কমে যাবে। এর ফলে আমদানি সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যেতে পারে।

এদিকে, পদ্মা সেতুর অর্থ যোগান দিতে ইতোমধ্যে বিভিন্নস্থানে চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের বিবিএ ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সাড়ে ৬ হাজার টাকা সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের কাছে প্রদান করেছেন।

উল্লেখ্য, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান সোমবার সকালে ক্লাস চলাকালে ‘যার যা কিছু আছে, তা নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ুন’, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক এই আহ্বান উদ্ধৃত করে ছাত্রছাত্রীদের বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য তোমাদের পকেটে যার যা কিছু আছে, তা নিয়ে অংশ নিতে পার। তার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পকেটের সর্বস্ব শিক্ষকের হাতে তুলে দেন। এই টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ৬ হাজার।

এদিকে, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করেছে এবং তাদের কাছে সন্দেহাতীত প্রমাণ রয়েছে বলেও জানিয়েছে। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিম-লে দেশের ভাবমূর্তিও সঙ্কটে পড়েছে। ভাবমূর্তি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আলোচনা হয়েছে আর দেরী না যে কোন মূল্যে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করার জন্য। নচেৎ আগামী নির্বাচনে মহাজোটের ক্ষমতায় আসা কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে দেশের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টাসহ খোদ প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বলেছেন, বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করার কারণে সর্বশ্রেণীর মানুষ দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়েছে। তাই তিনি বলেছেন, আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। মানুষের মধ্যে পদ্মা সেতুর ব্যাপারে একটি উৎসাহ দেখা দিয়েছে।

Share this post

Add comment




Joomla Templates and Joomla Extensions by JoomlaVision.Com
  • পপাত ধরণীতল!!

    পপাত ধরণীতল!!

    সাঈদ তারেকএই ভাটি বেলায় এসে সিটি ইলেকশনের বুদ্ধিটা কে যে দিয়েছিল! কি হতো চার সিটিতে নির্বাচনটা না করালে! মেয়াদ শেষ হয়ে গেছিলো? তো মেয়াদ তো ঢাকারও শেষ হয়ে গেছে পাঁচ…

  • চার সিটি নির্বাচনের ফলাফল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে নাকি বিপক্ষে ?

    চার সিটি নির্বাচনের ফলাফল  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে নাকি বিপক্ষে ?

    জাহিদ হাসান বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে ১৫ জুন রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়ে গেল, এতে সব কয়টা মেয়র ও অধিকাংশ কাউন্সেলর পদে…

  • তারেক জিয়া দেশে ফিরলে বিএনপি’র লাভ-ক্ষতি

    তারেক জিয়া দেশে ফিরলে বিএনপি’র লাভ-ক্ষতি

    সাঈদ তারেক ............ কয়েক দিন আগে দেখা গেল তারেক জিয়া দেশে ফিরে আসছেন- এই এক খবরে সরকারি দলের লোকজনের কাপড়-চোপড় নষ্ট হবার দশা! শুরু হলো স্বভাবসূলভ প্রলাপ বকা। এক মন্ত্রী…

  • বাংলাদেশে শত্রুশক্তির যুদ্ধ

    ফিরোজ মাহবুব কামাল ......... শত্রুপক্ষের রণকৌশল : মুসলমানগণ কোন কালেই শত্রুমুক্ত ছিল না। আজও নয়। যেখানেই মুসলমান আছে সেখানে শয়তান এবং তার দলবল ও রণকৌশলও আছে। কোন বিজন দ্বীপে ঈমানদার…

  • বিরোধী দলকে জুজুর ভয় দেখানো হচ্ছে ১/১১ এর সরকার কি তত্ত্বাবধায়ক ?

    জাহিদ হাসান .......... দেশে আর কয়েক মাস পরেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ৫ বছরের মেয়াদ শেষ হবে, নিয়ম অনুযায়ী বা সংবিধান মেতাবেক ২০১৪ সালের জানুয়ারী মাসের মধ্যে পরবর্তি সংসদ…

You are here: প্রথম পৃষ্ঠা ইমেজ পুনরুদ্ধারে মরিয়া সরকার