ঢাকা অফিস : বাবার অসমাপ্ত ডায়েরির মতো আমাদের দু’বোনের জীবনও তো অসমাপ্ত। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবে আমি বইয়ের বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। এটা অন্য যারা আছেন আলোচনা করবেন। পঁচাত্তর সালে বাবা, মা, ভাইদের হারিয়ে বেঁচে আছি আমরা দু’টি বোন। সে সময়ে আর কতই বা আমাদের বয়স। বিদেশের মাটিতে দু’বোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছি।
একজন আরেক জনকে সান্ত¦না দিয়েছি। আমরা চিন্তায় ছিলাম আর কোন দিন দেশে ফিরতে পারবো কি না? ৩২ নম্বরের বাড়িতে যেতে পারবো কি না? আর কোন দিন টুঙ্গিপাড়া যেতে পারবো কি না? কথাগুলো বলছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা।
গত সোমবার বিকাল সাড়ে চারটায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবে শেখ রেহানা এ কথা বলেন। আবেগ আপ্লুত শেখ রেহানা বলেন, ভাবতাম যে দেশটা স্বাধীন করার জন্য আমার আব্বা জীবনভর এত কষ্ট করলো সেই বাংলাদেশে আমরা আর ফিরতে পারবো না?
৮১ সালে আপা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পর দেশে ফিরলেন। তাকে ৩২ নম্বরের বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হয়নি। আপা বাড়ির সামনের রাস্তায় মিলাদ পড়িয়েছিলেন। ৮৩ সালে আমি দেশে ফেরার পরও ৩২ নম্বরের বাড়িতে যেতে পারিনি। যে বাড়িটি ছিল বাঙালি জাতির আন্দোলন-সংগ্রামের মিলন স্থল, কত মানুষ ওই বাড়িতে আসতো আব্বার কাছে অথচ সে বাড়িতে আমাদের ঢুকতে দেয়নি। শেখ রেহানা বলেন, আব্বার লেখা খাতাগুলো পাওয়ার পর দু’বোন মিলে বারবার পাতাগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে কেঁদেছি আব্বার সংস্পর্শ অনুভব করেছি। আজকের এই অনুষ্ঠানে এসে বারবার মনে হচ্ছে, স্মৃতি কত মধুর স্মৃতি কত বেদনার। শেখ রেহানা বলেন, ওই খাতাটি পাওয়ার আগে বুঝতে পারিনি আব্বার জীবনটা কত বিচিত্রতায় ভরা। সত্য কথাকে তিনি সোজা করে বলেছেন, নিজেকে জাহির করেননি আবার সত্য আড়াল করেননি। বইটি সকলকে পড়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ রেহানা বলেন বইটি আপনারা পড়লে আব্বার আত্মা শান্তি পাবে। তার সম্পর্কে জানা যাবে। তিনি বলেন, খাতাগুলো আমরা যতœ করে রেখেছিলাম, আজ তা আপনাদের সম্পদ হয়ে গেলে।
প্রকাশনা উৎসবে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রেহেনা যে বক্তব্য রেখেছে এর পর আমার খুব একটা বক্তব্য নেই। বঙ্গবন্ধু আমার পিতা কিন্তু তিনি দেশ ও জনগণের সম্পদ। তার লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী জনগণের সম্পদ- আজ আমরা সেই সম্পদকে জনগণের হাতে তুলে দিলাম। এতে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। বঙ্গবন্ধু কতটা মহান ছিলেন, কতটা উদার ছিলেন, অসামপ্রদায়িক ছিলেন রাজনীতির জন্য, মানুষের জন্য কতটা কষ্ট করেছেন বইটি পড়লে তা জানা যাবে। শেখ হাসিনা বলেন আমি যেদিন ইউপিএল এর মহিউদ্দিন সাহেবের কাছে খাতাগুলো তুলে দিই সেদিন মনে হচ্ছিলো বুকটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, কি যেন হারিয়ে ফেলছি। মনে হচ্ছিল কি অমূল্য সম্পদ যেন তুলে দিলাম। শেখ হাসিনা বলেন, আব্বাকে লেখার জন্য খাতা কিনে দিয়ে আসতেন মা, আবার জেল থেকে বের হওয়ার সময় মা গিয়ে খোঁজ নিতেন খাতা গুলোর। তিনি খাতাগুলো গুছিয়ে আনতেন। অনেক যতœ করে মা খাতাগুলো রেখেছেন। একাত্তর সালে যাতে লেখার খাতাগুলো নষ্ট না হয়, না হারিয়ে যায় সেজন্য মা খাতাগুলোকে বেঁধে মুরগির ঘরে রেখে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা জানান বঙ্গবন্ধুর লেখা স্মৃতির পাতা থেকে এবং তার চীন ভ্রমণ নিয়ে লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশ করা হবে। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থটি একই সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ভারত ও পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত বইয়ের কপি সমাবেশকে দেখান।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রকাশনা অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। আরও আলোচনা করেন বইয়ের প্রকাশক ইউপিএল এর স্বত্বাধিকারী মহিউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ফকরুল আলম, বেবী মওদুদ এমপি, কবি সৈয়দ শামসুল হক, অধ্যাপক মোস্তফা নুরুল ইসলাম। অসমাপ্ত আত্মজীবনী বই থেকে কিছু অংশ পাঠ করে শোনান রামেন্দু মজুমদার। প্রকাশনা উৎসবের দ্বিতীয় পর্বে বঙ্গবন্ধুর পছন্দের কবিতা আবৃত্তি করেন আসাদুজ্জামান নুর এবং বঙ্গবন্ধুর পছন্দের গান পরিবেশন করেন মোস্তফা জামান আব্বাসীসহ শিল্পীরা।









