Tuesday,
December 18 - December 24 , 2012 > Volume 13 > Issue 04



পদ্মা সেতুর ভাগ্য অনিশ্চিত

  • PDF

ঢাকা অফিস : বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে পদ্মা সেতু নির্মাণে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ বিশ্বব্যাংকের পর পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে ঋণ-সহায়তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এ প্রকল্পের আরেক উন্নয়ন সহযোগী জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) জাপান সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর অর্থায়নের ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানাবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যেখানে বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে অর্থায়ন করা থেকে সরে গেছে সেখানে অন্য দাতাগোষ্ঠীও সরে যাবেÑএটাই স্বাভাবিক। তারা বলেছেন, এর ফলে কম খরচে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হবে না।

 

আর যদি মালয়েশিয়া বা অন্য কোন দেশের অর্থে পদ্মা সেতু করা হয়, তা হবে জাতির জন্য বোঝা। কারণ মালয়েশিয়া বা অন্য যে কেউ পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থায়ন করলে তারা বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এদেশে বিনিয়োগ করবে। কিভাবে বেশি মুনাফা করা যায়, সেটাই থাকবে তাদের প্রধান লক্ষ্য।

এবিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, বিশ্বব্যাংক যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করা থেকে তারা সরে যাবে, এর আগে অবশ্যই সহযোগী অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে তারা পরামর্শ করেছে।

বিশ্বব্যাংক প্রধান অর্থায়নকারী হিসেবে চুক্তি বাতিল করেছে। একইভাবে কো-ফাইন্যান্সর হিসেবে এডিবি, জাইকাসহ অন্যান্য সংস্থাও চুক্তি বাতিল করবে।

সুতরাং, এটা অপ্রত্যাশিত কোন ঘটনা নয়। এটা প্রত্যাশিত ঘটনা। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক পুনর্বিবেচনা না করলে বিকল্প অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে হবে।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়া বা অন্য যে কেউ পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থায়ন করলে তারা বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিনিয়োগ করবে। তারা বাণিজ্য করার জন্য আসবে। কিভাবে বেশি মুনাফা করা যায়, সেটাই থাকবে তাদের প্রধান লক্ষ্য। বাংলাদেশের মানুষের কথা তারা চিন্তা করবে না। তারা দেখবে তাদের লাভ। তিনি বলেন, দক্ষ নির্মাণ এবং ব্যয় কম হওয়ার জন্য সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। এখন তারা যেহেতু সরে গেছে, অন্য সোর্স থেকে অর্থ নিলে ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে ?ঠিকভাবে নির্মাণ হবে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এম মনিরুজ্জামান মিয়া বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে যেহেতু বিশ্বব্যাংক সরে গেছে, কাজেই অন্য দাতাগোষ্ঠীও সরে যাবেÑ এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক বিনা কারণে দুনীর্তির অভিযোগ তোলেনি। নিশ্চয়ই এর পেছনে সলিড এভিডেন্স রয়েছে। এছাড়া দুর্নীতির বিষয়ে কয়েকবার চিঠি দিয়েছে সরকারকে। কিন্তু সরকার বিষয়টাকে আমলে নেয়নি।

তাই বাধ্য হয়ে হয়তো বিশ্বব্যাংক চুক্তি বাতিল করেছে। এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের মতো দাতাগোষ্ঠীকে পাত্তা না দেয়ার কারণে তাদের কাছে অস্বস্তিকর মনে হয়েছে। এর ফলে পদ্মা সেতু নির্মাণে চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে দুর্নীতির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক যেহেতু অস্বস্তিতে পড়ে চুক্তি বাতিল করেছে, কাজেই নতুন করে হয়তো পুনঃচুক্তি করা সম্ভব হবে না। তবে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যে চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার, তাতে পদ্মা সেতু নির্মাণে খরচ বেড়ে যাওয়ার আশংকা থাকবে। এর দায়ভার বহন করতে হবে পুরো জাতিকে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে এডিবিসহ অন্যান্য দাতাগোষ্ঠী বিশ্বব্যাংককে নেতা মানে। কাজেই বিশ্বব্যাংক যেহেতু চুক্তি বাতিল করেছে, অন্যরাও করতে পারে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক চুক্তি বাতিল করলেও বাংলাদেশ সুতা ধরে আছে। কাজেই মনে হচ্ছে, সরকার বিশ্বব্যাংকের আশা ছাড়ছে না। বিশ্বব্যাংক যাতে পুনর্বিবেচনা করে সে জন্য সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রেসিডেন্ট কি সিদ্ধান্ত নেন, সে সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সরকার বলছে, পদ্মা সেতু বিষয়ে বিশ্বব্যাংক যে বিবৃতি দিয়েছে তা বিশ্বব্যাংকের নয়। ওটি বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী প্রেসিডেন্টের নিজস্ব বিবৃতি। এমএম আকাশ বলেন, বিশ্বব্যাংকের ২৯ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করার উচিত ছিল, কারণ সরকার তাদের দেয়া শর্ত পালনের জন্য ২৯ জুলাই পর্যন্ত সময় চেয়েছিল।

এ বিষয়ে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ড. মাহবুব হোসেন বলেন, সরকারের উচিত ছিল আগেই বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বিষয়টি চুকিয়ে ফেলা। যেহেতু সরকার এটাকে দীর্ঘায়িত করেছে, সেহেতু এ পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, দুর্নীতির যে কালিমা লেপে দেয়া হয়েছে তাতে শুধু বিশ্বব্যাংকই নয়, অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীও সরকারকে নানাভাবে চাপ দেয়ার চেষ্টা করবে।

সরকারের মেয়াদকালে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, যেহেতু বিশ্বব্যাংক সরে গেছে, অন্য দাতারাও সরে যাবে। আর পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সরকারের ইমেজের প্রশ্ন। অর্থনীতির প্রয়োজনে পদ্মা সেতু হওয়া জরুরি। কিন্তু তাড়াহুড়া করে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়া বা চায়নার সহায়তায় পদ্মা সেতু করতে গেলে খরচ বেড়ে যাবে। এতে টোলও বেড়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পদ্মা সেতু হলে যে খরচ হতো, বেসরকারিভাবে সেটা করতে গেলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। কারণ তারা ১৫ বছরের মধ্যে খরচ তুলে নেয়ার চেষ্টা করবে। ড. মাহবুব বলেন, যতকিছুই হোক, সরকারের পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে আসা ঠিক হবে না। সামনে এগিয়ে যাওয়াই ভালো। তবে যত কম খরচে করা যায়।

Share this post

Add comment




You are here: প্রথম পৃষ্ঠা পদ্মা সেতুর ভাগ্য অনিশ্চিত