
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, নতুন চুক্তির প্রস্তাব
ঢাকা অফিস : প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির কারণে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণচুক্তি বাতিল করায় মহাজোট সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে। একই সঙ্গে দলটি বিশ্বব্যাংকের তথ্য মোতাবেক এ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত মন্ত্রী-এমপি ও কর্মকর্তাদের শাস্তি দিয়ে ঋণচুক্তি ‘পুনরুজ্জীবিত’ করার উদ্যোগ নিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেছে, বাণিজ্যিক ঋণ দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। তাই অপেক্ষাকৃত কঠিন শর্তে বিকল্প অর্থায়নের সন্ধান না করার আহ্বান জানায় দলটি। গতকাল বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিলের তিন দিন পর দলের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন।
এম কে আনোয়ার সরকারকে সততা ও জনকল্যাণের পথে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকার দুর্নীতির পক্ষে অবস্থান নেয়ায় পদ্মা সেতুর নির্মাণচুক্তি বিশ্বব্যাংক বাতিল করেছে। ফলে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্নীতির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এটি শুধু পদ্মা সেতু প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প, উন্নয়ন সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোও প্রভাবিত হবে। ফলে অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।
সাবেক এই ক্যাবিনেট সচিব মনে করেন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে সরকারকে এখনই ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া উচিত। সরকার এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দুর্নীতিবাজ। বিশ্বব্যাংক এখন সরকারকে সেই দুর্নীতির সার্টিফিকেট দিয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের কয়েক ব্যক্তির উগ্র অর্থ লালসার শিকার হয়েছে ১৫ কোটি মানুষের মানমর্যাদা। এটি সমগ্র জাতির জন্য দুর্ভাগ্য ও কলঙ্কজনক। তাই সরকারকে পদত্যাগ করা উচিত।
আনোয়ার বলেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত ঋণের শর্ত হতে বাণিজ্যিক ঋণের শর্ত কঠিন বা বিরূপ হলে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এ-সংক্রান্ত সব চুক্তি জনস্বার্থে বাতিল করবে। একইসঙ্গে ক্ষমতায় গেলে দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে বলে আবারও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
এই বিএনপি নেতা বলেন, দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করে বিশ্বব্যাংক বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরোধ করলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। অভিযুক্ত মন্ত্রীকে মন্ত্রণালয় বদলি করে বিষয়টির ইতি টানতে চেয়েছিল, যা বিশ্বব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। বরং সরকার দুর্নীতির বিষয়টি উপেক্ষা করে তদন্তের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে দুর্নীতিবাজদের রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন বলেই যা ঘটার তা-ই ঘটেছে।
তার মতে, সরকার দুর্নীতির বিষয়টি অস্বীকার করলেও দুর্নীতির যে তথ্য বিশ্বব্যাংক দিয়েছে, তা জনসমক্ষে প্রকাশের অস্বীকৃতি সরকারের দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতারই ইঙ্গিত বহন করে। মন্ত্রী, কর্মকর্তা এবং দলীয় লোকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেয়ার পরও যথাযথ তদন্তে অনীহা এ দুর্নীতির সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে অনেকে মনে করেন।
এম কে আনোয়ার বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিলের পর সরকার অন্য খাত থেকে অর্থ সংগ্রহের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার সমালোচনা করে বলেন, দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেয়ার পরিবর্তে কঠিন শর্তে অন্য উত্স থেকে সেতু নির্মাণের অর্থের জোগান দেয়া হলে তা দেশের স্বার্থ পরিপন্থী হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তার ব্যয় দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ১০ বছরে গ্রেস পিরিয়র্ডসহ ৪০ বছরে পরিশোধযোগ্য। অন্য যেকোনো উত্স থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হলে সুদের হার ৬ শতাংশের কম হবে না। নির্মাণ ব্যয়ও কয়েকগুণ বাড়তে পারে। বাণিজ্য ঋণ নেয়া হলে প্রকল্পের ব্যয় চার গুণ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ব্যয় ও সুদ পরিশোধের দায় জনগণের ওপর বর্তাবে, যা দেশকে দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে ফেলবে। এ সঙ্কট কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র সৃষ্ট সঙ্কটের চেয়েও গুরুতর হবে। ফলে দেশের অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
রোববার তার মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে যোগাযোগ ও রেলমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত আগেই আঁচ করতে পেরে সরকার বিকল্প অর্থায়নের উত্স খুঁজেছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে মালয়েশিয়া প্রস্তাব দিয়েছে এবং আরও দুটি দেশও আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানান তিনি।
এম কে আনোয়ার সরকারকে পরামর্শ দেন, দেশকে এ সঙ্কটে না ফেলে বিশ্বব্যাংকের দেয়া দুর্নীতির তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করে ‘দুর্নীতিবাজদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিষয়টি সমাধান করে বাতিলকৃত চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করে পদ্মা সেতু নির্মাণের সুযোগ এখনো রয়েছে। শুধু ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে একগুঁয়েমি ও দুর্নীতির পথ অনুসরণ না করে সততা ও দেশের স্বার্থে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পদ্মা সেতুর প্রকল্প বাস্তবায়ন জনগণের জন্য মঙ্গলজনক হবে।
তবে জাতীয় প্রয়োজনে এবং জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে তুলনামূলক সহজ শর্তে বিকল্প সূত্র থেকে অর্থ সংগ্রহ করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হলে কারও আপত্তি থাকবে না বলে মনে করেন সাবেক এ সচিব। একইসঙ্গে বিকল্প উত্স থেকে অর্থ জোগানের ব্যয় ও শর্তাবলি জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি বলেন, তারা হয়তো বিকল্প উত্স থেকে অর্থ সংগ্রহের চিন্তা করে বলছেন, যেকোনো মূল্যে সেতুর কাজ শুরু করবেন। অক্টোবরে কার্যাদেশ দেয়া হবে। কিন্তু দেখতে হবে বিকল্প অর্থের ব্যয় ও শর্ত বিশ্বব্যাংকের ঋণের সমতুল্য কি না। সমতুল্য না হলে বুঝতে হবে, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বিকল্প উত্স থেকে ঋণ নিয়ে দলীয় লোকদের দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করতেই এ উদ্যোগ বলে মনে করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মুশফিকুর রহমান, ড. ওসমান ফারুক, সাবেক সচিব ইসমাঈল জবিউল্লাহ, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, সহ-দফতর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি প্রমুখ।







