Tuesday,
December 18 - December 24 , 2012 > Volume 13 > Issue 04



মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্রাদারহুড প্রার্থী ড. মুরসির বিজয়

  • PDF

আবুল কালাম আজাদ, মিসর থেকে : মোবারকপন্থীদের ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপি সত্তে¦ও মিসরের দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইখওয়ানুল মুসলিমিন বা মুসলিম ব্রাদারহুড প্রার্থী ড. মুহাম্মদ মুরসি ‘আরব বসন্তের’ প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়লাভ করেছেন। তিনি তার প্রতিদ্বন্দ¦ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ শফিকের চেয়ে ৯ লাখ ৩০ হাজার ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিজয় লাভ করেন। পাঁচ কোটি ৯০০ ভোটারের মধ্যে ৫০ শতাংশ ভোটার নির্বাচনে অংশ নেন।

মিসরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মোট ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসী জয়ী হয়েছেন বলে দাবি করেছে তার দল। এছাড়া বেসরকারিভাবে প্রকাশিত ফলাফলেও তিনি এগিয়ে রয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। শনিবার ও রোববার দুদিনে মিসরে দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন হয়। বেসরকারিভাবে পাওয়া নির্বাচনী ফলাফলে জানা যায়, মুসলিম ব্রাদারহুড প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসী তার প্রতিদ্বন্দ্বী মোবারক আমলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ শফিকের চেয়ে ১০ লক্ষাধিক ভোট বেশি পেয়ে প্রেসিডেন্ট হবার পথে অনেকখানি এগিয়ে রয়েছেন।

গতকাল সোমবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে মুসলিম ব্রাদারহুড নির্বাচনে এখন পর্যন্ত তাদের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসী বেসরকারিভাবে পাওয়া ফলাফলে জয় লাভ করেছেন বলে জানায়। দেশজুড়ে মোট ১৩ হাজার ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১২ হাজার ৯৯৩ টি কেন্দ্রেই তিনি আহমেদ শফিকের চেয়ে বিপুল ভোটে এগিয়ে আছেন। বেসরকারিভাবে পাওয়া এক ফলাফলে জানা যায়, এ পর্যন্ত মুরসী পেয়েছেন মোট এক কোটি ৩২ লাখ ৩৭ হাজার ভোট। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বনদ্বী আহমদ শফিক পেয়েছেন এক কোটি ২৩ লাখ ৩৮ হাজার ভোট।

কায়রো থেকে রয়টার্স জানায়, মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যবেক্ষক কমিটির একজন সদস্য সোমবার নিশ্চিত করেছেন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী মুরসী এগিয়ে রয়েছেন। তবে ইতোমধ্যে ব্রাদারহুডের ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি তাদের ওয়েবসাইটে মুরসী জয়ী হয়েছেন বলে দাবি করেছে। ওয়েবসাইটে তারা দাবি করেছে, মুরসী হলেন মিসরের প্রথম সরকারিভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। কায়রোতে ব্রাদারহুড কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মুরসীর প্রচার কর্মকর্তা আহমদ আব্দেল আপত্তি জানান, মুরসী ৫২.৫ শতাংশ ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আহমদ শফিক ৪৭.৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। আর এটা হলো ৯৮ শতাংশ ভোট কেন্দ্রের ভোট গণনার পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষিত প্রাথমিক ফলাফল। ফলাফল ঘোষণার পর ‘সামরিক শাসনের পতন বলে চিৎকার করে ওঠে তাদের সমর্থকরা।

সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ মুরসী মিসরের সব মানুষের প্রেসিডেন্ট হওয়ার অঙ্গীকার করে জানান, তিনি কোনো প্রতিশোধ নেবেন না।এদিকে বেসরকারিভাবে পাওয়া ফলাফল জানাজানি হতেই মুরসির সমর্থকরা সকাল থেকে কায়রোসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আনন্দ প্রকাশ করছে। তারা মিছিল করে মুরসির নামে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। এই বিশাল জয়ে মোহাম্মদ মুরসিও তার সমর্থক শুভানুধ্যায়ীদের ধন্যবাদ জানাতে ভুলেননি।

এক প্রতিক্রিয়ায় মুরসি বলেন, আল্লাহকে ধন্যবাদ যে তিনি মিসরের জনগণকে সঠিক, স্বাধীন এবং গণতন্ত্রের পথে যাবার নিক নিন্দেশনা দিয়েছেন। তিনি নির্বাচনে জয়ের পেছনে তার দলের কর্মী, সমর্থক এবং পরিবারের সদস্যদেরও ধন্যবাদ দেন। তিনি একটি গণতান্ত্রিক সাংবিধাকি এবং আধুনিক মিসর গড়তে কাজ করে যাবেন বলে জানান। মুরসি দেশে বিগত সময়ের জন্য কোনো ধরনের প্রতিশোধে না গিয়ে মিসরের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন।

অন্যদিকে নির্বাচনী ফলাফরের ব্যাপারে আরেক প্রার্থী ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক হোসনি মুবারকের আমলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ শফিকের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এদিকে মিসরের নির্বাচন নিয়ে গত দুদিন সবার মাঝে বেশ উৎকণ্ঠা থাকলেও পরে সেসব কেটে গেছে। দেশটির কোথাও থেকে তেমন কোনো গোলোযোগের সংবাদ পাওয়া যায়নি। জনগণকে গত দুদিন শান্তিপূর্ণ এবং সুশৃংখলভাবে ভোট দিতে দেখা গেছে। চলতি সপ্তাহের শেষে সরকারিভাবে মিসরে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। এরপর জুলাইয়ের নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাতে বর্তমান সামরিক সরকার ক্ষমতা তুলে দেয়ার কথা রয়েছে।

এর আগে গতমাসে মিসরে প্রথম দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কোনো প্রার্থী একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রথমদফা নির্বাচনেও মোহাম্মদ মুরসি আহমেদ শফিকের চেয়ে ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।

আল জাজিরা জানায়, মুসলিম ব্রাদারহুড মোহাম্মদ মুরসিকে মিসরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দাবি করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উৎফুল্ল জনতা। কায়রোর তাহরির স্কোয়ারে সমবেত হতে থাকে। তাহরির স্কোয়ারে সংঘঠিত তীব্র গণআন্দোলনের ফলে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পদত্যাগ করতেও বাধ্য হন। কায়রো থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা জানায়, ২১ জুন প্রেসিডেন্ট নির্বচানের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তবে আমরা আগের বহু নির্বাচনে দেখেছি নির্বাচনী কেন্দ্রসমূহে প্রভাবশালী মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিনিধি থাকেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের দেয়া তথ্যই নিখুঁত হয়ে থাকে।

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর দেয়া তথ্যমতে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুডের মুরসি।

আহমেদ শফিকের সমর্থকরা অবশ্য মুসলিম ব্রাদারহুডের ঘোষিত এ ফলাফল মেনে নেবে না বলে জানিয়েছেন। তারা চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে চায়।

মিসরের খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে মুরসি বলেন, আমি কোন প্রতিশোধ নিতে চাই না। বরং আমি সকল মিসরীয়র জন্য কাজ করার শপথ করছি।

এদিকে গত রোববার নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সংক্রান্ত নতুন সাংবাবিধানিক অধ্যাদেশ জারি করেছে মিসরের সুপ্রিম কাউন্সিল অব দ্যা আর্মড ফোর্সেস (এসসিএএফ)। নতুন এ অধ্যাদেশ অনুসারে প্রেসিডেন্ট এসসিএএফর অনুমতি সাপেক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনীকে আহবান করার ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে প্রেসিডেন্টকে। তবে খসড়া সংবিধানটির ৫৬ অনুচ্ছেদের প্রথম ধারা অনুসারে নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত দেশের শাসনভার এসসিএএফর হাতেই থাকবে। প্রসঙ্গত, সাবেক স্বৈরাচারী শাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর পুরনো সংবিধানকে বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে নতুন সংবিধান প্রণয়নের চেষ্টা করেও মতৈক্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয় মিসরের রাজনৈতিক দলগুলো। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার এসসিএএফ একটি খসড়া সংবিধান প্রকাশ করে। সংবিধান প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করার জন্য পার্লামেন্টে ১শ জনের একটি দলকে অনুমোদন দেয়া হবে বলে জানা যায়। তবে মুসলিম ব্রাদারহুড তাদের এক তাৎক্ষণিক টুইটার বার্তায় এসসিএএফর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সংক্রান্ত ঘোষণাকে অসাংবিধানিক এবং অকার্যকর বলে অভিহিত করেছে।

এ দিকে মিসরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রধান ড. মোহাম্মদ বদিই বলেন বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে ড. মুরসির বিজয় লাভ করা সময়ের খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়ার শেষ নেই। মুসরির বিজয়ের খবর শোনার জন্য দলের নেতাকর্মীরা সারা রাত জেগে ভোর ৪টার দিকে এ বিজয়ের খবর শুনতে পান ড. মুরসির সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যাতে করে ব্যর্থ করে দিতে না পারে সে জন্য তাহরির স্কয়ারে উপস্থিত হয়ে মানুষ আনন্দ-উৎসব, রঙ ছিটাছিটি আর জামায়াতের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করে সমস্বরে তাকবির দিয়ে বিজয় বলবৎ রাখতে নানা ধরনের স্লোগান দেয়।

বিজয়ের ঘোষণা দিয়ে মুরসি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। এতে তিনি বলেন, মুবারকবিরোধী গণ-আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন আইন করে তিনি তাদের পরিবারের অধিকার সংরক্ষিত করবেন।

এ ছাড়া মিসরের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কপ্টিক খ্রিষ্টানদের উদ্দেশেও কথা বলেন মুরসি। তিনি বলেন, মিসরের সব মানুষকে তিনি নিজ পরিবারের সদস্যের মতো দেখবেন। কোনো প্রতিশোধ নেয়া হবে না বলেও জোরালো প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে মুরসি বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য তিনি সেবক হয়ে কাজ করবেন।

মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে মোহাম্মদ মুরসি একটি সুশীল, সংবিধানভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক আধুনিক মিসর গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

এ দিকে আহমাদ শফিক এ বেসরকারি ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন। তিনি সরকারি ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করবেন বলে জানিয়েছেন। সরকারি ফলাফল প্রকাশ হতে আরো কয়েক দিন লেগে যাবে।

গত বৃহস্পতিবার মিসরের সাংবিধানিক আদালত পার্লামেন্টের এক-তৃতীয়াংশ আসনের নির্বাচন অবৈধ ঘোষণা করে পার্লামেন্ট বাতিল করে দেয়। সুপ্রিম সামরিক কাউন্সিল সেটা সাথে সাথে কার্যকর করে।

মুরসির সংক্ষিপ্ত পরিচয় : ৬০ বছর বয়স্ক মুরসি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। তিনি প্রকৌশলের একজন অধ্যাপক। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির (এফজেপি) প্রধান। তিনি ২০০০-০৫ মেয়াদে স্বতন্ত্র হিসেবে পার্লামেন্ট সদস্য ছিলেন। মৃদুভাষণের কারণে অনেকে মনে করেন যে তার ক্যারিশমার অভাব রয়েছে। তিনি ইসলামি ব্যানারে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।

তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশলে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮২ সালে সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত তিনি ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৮৫ সালে দেশে ফিরে জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন। তার সন্তানদের ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্ম এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।

এই নির্বাচনে তার প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল না। ব্রাদারহুডের প্রার্থী ছিলেন খাইরাত আর শাতার। কিন্তু তার প্রার্থিতা বাতিল করা হলে মুরসি প্রতিদ্বন্দি¦তায় অবতীর্ণ হন।

Share this post

Add comment




You are here: প্রথম পৃষ্ঠা মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্রাদারহুড প্রার্থী ড. মুরসির বিজয়