জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী : পাকিস্তানের রাজনীতি আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সুপ্রিম কোর্ট একটি অত্যন্ত আলোচিত রায়ে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে অযোগ্য ঘোষণা করেছেন এবং এর ফলশ্রুতিতে দেশের মন্ত্রিসভাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান, তথাপি এটা অনেকটাই স্পষ্ট যে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের কারণে গিলানি আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নন। কী হতে যাচ্ছে দেশটিতে এবং আগামী দিনের চালচিত্র কেমন হতে পারেÑ এটা নিয়েই এখন রয়েছে সীমাহীন আগ্রহ এবং কৌতূহল। তবে এটা একটি দ্রুত ধাবমান পরিস্থিতি। যখন এই কলাম ছাপা হবে, তখন হয়তো পাকিস্তানের চালচিত্রে নতুন উপাদান যুক্ত হবে। দেশের প্রেসিডেন্ট এবং শাসক পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি তার দলের জরুরি সভা আহ্বান করেছেন এবং শাসক কোয়ালিশনের অন্যান্য শরিক দলের সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা করছেন। একজন নতুন প্রধানমন্ত্রীর সন্ধানে তারা রয়েছেন বলে জানা গেছে। এটা সম্ভব হতে পারে যে এরই মাঝে নতুন সরকার প্রধানের নাম ঠিক হয়ে গেছে। নতুন সরকার এই পরিস্থিতিতে খুবই প্রয়োজনীয়। শাসক মোর্চা কোনোভাবেই চাইবে না যে ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যায়, বিশেষ করে যখন তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে জাতীয় পরিষদে। তাছাড়া সুপ্রিম কোর্ট ইউসুফ রাজা গিলানিকে অযোগ্য ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে আশা প্রকাশ করেছে যে, দেশে যেন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। কিন্তু কথা হলো, পাকিস্তানে এই ঘটনা হঠাৎ করে আসেনি। এমনি পরিস্থিতির যে উদ্ভব হতে পারে, সেটা বেশ পূর্বেই অনুধাবন করা গিয়েছিল। কেননা গত ২৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রী গিলানিকে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করেছে। একজন প্রধানমন্ত্রী যখন এমনি পর্যায়ে সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হন, তখন স্বাভাবিকভাবেই এই ধারণার সৃষ্টি হয় যে, তিনি আর স্বপদে আসীন থাকতে পারবেন না। সেই রায়ের আলোকে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেননি এবং সে কারণে এটা প্রায় নিশ্চিত ছিল যে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি নিয়ে আবার আলোকপাত করবেন। সেটাই হয়েছে এবং আদালত বলেছেন গিলানি ২৬ এপ্রিল থেকেই আদালত অবমাননার অভিযোগের কারণে দোষী প্রমাণিত হওয়ার পর থেকে স্বীয় পদে অযোগ্য হয়েছেন। তাই এখন পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহের নতুন অধ্যায় কিভাবে রচিত হয়, সেদিকে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ। তবে একই সঙ্গে এই রায়ের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং কেন সেটা বর্তমান পর্যায় পর্যন্ত গড়িয়েছে, সেই প্রেক্ষিতও আলোচনার দাবি রাখে।
সুপ্রিম কোর্ট বেশ পূর্বেই প্রধানমন্ত্রী গিলানির সরকারকে দেশের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির বিরুদ্ধে পূর্বের দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করা এবং এই লক্ষে সুইস ব্যাংকে এই সংক্রান্ত চিঠি দেয়ার নির্দেশ দেয়। উল্লেখ্য, জারদারির স্ত্রী প্রয়াত বেনজির ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে জারদারির সঙ্গে মিলে সুইস ব্যাংকে কয়েকটি ব্যবসায়িক ‘ডিলের’ কমিশন বাবদ ১২ লাখ ডলার গচ্ছিত রাখেন। বলাবাহুল্য, আসিফ আলী জারদারি প্রধানমন্ত্রীর স্বামী হিসেবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন সেই সময় এবং বড় বড় ব্যবসায় পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকতেন। এই কারণে তাকে বলা হতো ‘মি. টেন পারসেন্ট’ অর্থাৎ তিনি বিভিন্ন ‘ডিলে’ শতকরা ১০ ভাগ কমিশন নিতেন বলে জনশ্রুতি ছিল। সুইস ব্যাংকে তার গচ্ছিত অর্থের ব্যাপারে সরকার নির্দেশ দিলেও জারদারি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এবং তার দল ক্ষমতায় আসার পর সেটা রোধ করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই পিপিপির সরকার জারদারির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার কথা নয়। স্ত্রী বেনজিরের মৃত্যুর পর তিনিই তাদের দলের সবচেয়ে শক্তিধর ব্যক্তি হয়ে আবির্ভূত হন। পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হন।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের প্রধ ান বিচারপতি ইফতেখার মোহাম্মদ চৌধুরীর সঙ্গে পাকিস্তান পিপলস পার্টির সম্পর্ক ভালো নয়। যখন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মুশাররফ ক্ষমতায় ছিলেন, তখন প্রধান বিচারপতির পদ থেকে ইফতেখার চৌধুরীকে অপসারণ করা হয়। কিন্তু গণআন্দোলনের মুখে তিনি তার পদ ফেরত পান। সেই কঠিন সময়ে ইফতেখার চৌধুরীর পাশে মূলত ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ। পিপিপির ভূমিকা ইফতেখার চৌধুরীর জন্য এতোটা অনুকূল ছিল না। সে কারণে জারদারির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির সম্পর্কও খুব একটা ভালো নয়।
জারদারির বিরুদ্ধে পূর্বের দুর্নীতির মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী গিলানি অগ্রাহ্য করায় তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয় এবং পরে তিনি এই ব্যাপারে দোষী সাব্যস্ত হন। গিলানি বলেন যে, প্রেসিডেন্ট জারদারির দুর্নীতি নিয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেবে না এবং সুইস ব্যাংকে এই বিষয়ে কোনো চিঠি দেবে না এই কারণে যে সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রেসিডেন্ট কিছু বিষয়ে ‘ইমমিউনিটি’ পেয়ে থাকেন। তিনি মনে করেন যে, দুর্নীতির ব্যাপারেও প্রেসিডেন্ট জারদারি এমনি সুবিধা পাওয়ার কথা। তবে সুপ্রিম কোর্ট এটা মানেনি এবং প্রধানমন্ত্রীকে আদালত অবমাননার জন্য অভিযুক্ত করেছে। সে কারণে গিলানি স্বীয় পদ হারালেন।
জারদারি-গিলানির সরকার ঘটনাচক্রে দেশের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। বেশ কয়েকটি ইস্যুকে কেন্দ্র করেই এই দুটি বিভাগের সঙ্গে সরকারের টানাপড়েন চলছে বেশ কিছুকাল যাবৎ এবং সেটা প্রায় সংঘর্ষের পর্যায়েই চলে গেছে বলা যায়। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির কারণে পাকিস্তানে ‘ক্যু’ হতে পারে, এমনি সম্ভাবনাও বিদ্যমান ছিল। সেই গুঞ্জন এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গত বছরের মে মাসে পাকিস্তানের অ্যাবোতাবাদে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর থেকে সরকারের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর দূরত্ব সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য লাদেনকে মার্কিন কমান্ডোরা হত্যা করে এবং পাকিস্তানকে অন্ধকারে রেখেই আমেরিকানরা সেই কাজটি সমাধা করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাক-মার্কিন সম্পর্কেরও অবনতি হয়। সেই বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক এখনো ভুল বুঝাবুঝির মাঝ দিয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের সর্বশেষ পরিস্থিতি দেশটির জন্য বলা যায় নতুন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। একদিকে সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগের সঙ্গে সংঘাত, অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি সরকারকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। তাছাড়া ‘তালেবান’ সমস্যা তো আছেই। দেশে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করলে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ অস্বাভাবিক নয়। কেননা দেশটির ইতিহাস সেটাই বলে। পাকিস্তানের আগামী নির্বাচন ২০১৩ সালে হওয়ার কথা। তবে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনাও আছে।
ভোরের কাগজ
২১/০৬/২০১২





