Tuesday,
December 18 - December 24 , 2012 > Volume 13 > Issue 04



বিশেষ সাক্ষাৎকারে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

  • PDF

জনগণকে স্বাধীকার বা স্বায়ত্ত্বশাসনের জন্য প্রস্তুত করার প্রধান দায়িত্বটি পালন করেছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ

এখন সময় রিপোর্ট : বাংলাদেশে মিডিয়া জগতে একজন সুপরিচিত ব্যক্তি হচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক। গত প্রায় চৌদ্দ বছর যাবত তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করছেন। গত প্রায় দশ বছর যাবত তিনি ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও সোচ্চার। গত সাড়ে চার বছর যাবত তিনি রাজনীতিক অঙ্গনে একজন পথিক। একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে এবং জাতি গঠনের আঙ্গিকে একজন চিন্তাশীল ব্যক্তি হিসেবে তিনি বিস্তৃতভাবে সমাদৃত। সম্প্রতি তাঁর নিকট এখনসময়’র পক্ষ থেকে কিছু লিখিত প্রশ্ন রাখা হয়। জেনারেল ইবরাহিম লিখিতভাবেই তার উত্তর দিয়েছেন। অনেকগুলো প্রশ্ন বিধায় আমরা ধারাবাহিকভাবে এই প্রশ্নোত্তর পর্ব পাঠকের নিকট উপস্থাপন করতে চাই।

 

১ম পর্ব

প্রশ্ন-১: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন যোদ্ধা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানের ভূমিকা আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

উত্তর-১: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের দুইটি পর্ব আছে। প্রথম পর্বটি দীর্ঘ যথা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৮-৬৯ এর গণআন্দোলন পর্যন্ত। আরেকটু বিস্তৃত করলে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সন্ধ্যা পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাত্রি থেকে। দ্বিতীয় পর্বটি হচ্ছে সশস্ত্র যুদ্ধের পর্ব প্রথম পর্বটির শেষাংশে, বিশেষত ১৯৬৬ সাল থেকে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীকার বা স্বায়ত্ত্বশাসনের জন্য কিন্তু অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করার প্রধান দায়িত্বটি পালন করেছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। এবং ঐ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অবিসংবাদিত নেতা তথা আন্দোলনের নেতা ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু উপাধীতে অভিষিক্ত হন। তাই একবাক্যে বলা যায় যে, বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করার সিংহভাগ কৃতিত্বই বঙ্গবন্ধুর। অপরপক্ষে ২৫ মার্চ ১৯৭১ এর পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আঙ্গিক লাভ করে। ১৯৭০ সালের শেষ থেকে শুরু করে কিছু সংখ্যক বাঙালি সেনা কর্মকর্তা বাঙালি জাতির ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করতেন। পূর্ব পাকিস্তানের চলমান আন্দোলন তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল বলেই আমার বিশ্বাস। ১৯৭১ এর মার্চ মাসের বিভিন্ন ঘটনাবলীর কারণে ঐরূপ সেনা কর্মকর্তাগণের মধ্যে বাঙালি জাতির অনুকূলে সংগ্রামী চিন্তা সর্বাত্মকভাবে ঘনিভূত হয়। এরকমই একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান। ২৫ মার্চ দিবাগত রাত্রিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা কতটুকু বিস্তৃতভাবে জনগণের নিকট পৌঁছেছিল বা পৌঁছে নাই আমি সে বিষয়ে মন্তব্য করছি না। কিন্তু ২৫ মার্চ দিবাগত রাত ১২টার কয়েক মিনিট পর বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক ব্যক্তিত্ব পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র ও পাকিস্তানী সরকার এবং পাকিস্তানী সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ঐরকম একজন বিদ্রোহী ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টে সৈনিকদের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে ‘আমরা স্বাধীনতা ঘোষণা করছি, আমরা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করছি’। একদিন পরই ২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে চট্টগ্রাম শহর থেকে অল্প দূরে অবস্থিত কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা প্রকাশ করেন। তৎকালীন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাগণের আহ্বানেই তিনি সেই পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি দুইবার স্বাধীনতার ঘোষণা প্রকাশ করেন। প্রথমবার তিনি নিজের নামে কর্তৃত্বে ও দায়িত্বে বলেন; দ্বিতীয়বার বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে বলেন। ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত সময় বাংলাদেশ ছিল একটি রণাঙ্গন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই পূর্ণ সময় পাকিস্তানীদের হাতে বা পাকিস্তানীদের বন্দীশালায় আটক ছিলেন। জিয়াউর রহমান রণাঙ্গনে প্রত্যক্ষভাবে নেতৃত্ব দেন তথা সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন। অষ্টম ্ইস্ট বেঙ্গলকে নিয়ে যুদ্ধের সূচনা করেন, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গলের যুদ্ধক্ষেত্রটি ১নম্বর সেক্টরের আওতাধীন বা দায়িত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং তিনি তার নেতৃত্ব দেন। কয়েক সপ্তাহ পর তাঁকে অন্যত্র দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি প্রথম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, তৃতীয় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর সমন্বয়ে গঠিত জেড ফোর্স এর অধিনায়কত্ব পালন করেন। আমার মূল্যায়নে কারো ভূমিকাকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই এবং কে বড় বা কে ছোট এইরূপ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টাটিও অকাম্য।

প্রশ্ন-২: জাতীয় স্বার্থ ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তার ব্যাপারে আপনার বক্তব্য বিস্তারিত জানতে চাই।

উত্তর-২: একই প্রশ্নের দুইটি আঙ্গিক জড়িত করা হয়েছে। যথা জাতীয় স্বার্থ ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা। জাতীয় স্বার্থ বলতে যা বোঝায় সেখানে অনেকগুলো আঙ্গিক আছে, যেখানে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ আছে। অপরপক্ষে সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা বলতে বাংলাদেশী জাতির সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা অথবা বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা এর উভয়টিকে অথবা যে কোনো একটির দিকে ইঙ্গিত করা সম্ভব। তাই আমি প্রথমে জাতীয় স্বার্থের ব্যাপারে বলবো। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ অনেকগুলো আঙ্গিকে বিচারযোগ্য বা বিশ্লেষণযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ অর্থনৈতিক অঙ্গনের স্বার্থ, বিদেশনীতির অঙ্গনে স্বার্থ, বাণিজ্যিক অঙ্গনের স্বার্থ, প্রতিরক্ষা অঙ্গনের স্বার্থ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্বার্থ। ক্ষুদ্র অবয়বে, প্রত্যেকটি অঙ্গনের স্বার্থ প্রসঙ্গে মন্তব্য করছি।

অর্থনৈতিক অঙ্গনের স্বার্থ

অর্থনৈতিক অঙ্গনের স্বার্থ আলোচনা করতে গেলে প্রথম যে বিষয়টি মনে আসে সেটি হল বাংলাদেশের শিল্প ক্ষেত্রে বিনিয়োগ। বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনটি বিষয় জড়িত। প্রথম বিষয় বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে চাই; দ্বিতীয় বিষয় নিজেদের দেশীয় উদ্যোক্তা বা বিনিয়োগকারীতেও পৃষ্ঠপোষকতা করতে চাই এবং তৃতীয় বিষয় হল দেশের ভিতরে উৎপাদিত পণ্য যেন একই প্রকারের বিদেশ থেকে আমদানী করা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মার না খায় সেটার দিকে খেয়াল রাখতে চাই। এইরূপ একটি ভারসাম্য স্থাপন করা কঠিন কাজ কিন্তু অসম্ভব কাজ নয়। এই ভারসাম্য যে সকল দেশ স্থাপন করতে পারে তাদের অর্থনৈতিক উন্নতি অন্যদের তুলনায় দ্রুততর হয়। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অনেক প্রকারের সুযোগ সুবিধা চায়; অনেক সময় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা জাতীয় স্বার্থকে অবহেলা করে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের কারণে ঐসব সুযোগ সুবিধা দিয়ে দেয়। এইরকম ঘটলে অর্থনৈতিক উন্নতি বিঘিœত হয়। অর্থনৈতিক অঙ্গনের স্বার্থ আলোচনা করতে গেলে দ্বিতীয় যে বিষয়টি মনে আসে সেটি হল, বৈদেশিক সাহায্য। আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় বা সরকারি সঞ্চয় বা বিনিয়োগযোগ্য পূঁজি কম। সাধারণভাবে দেশ চালানোর জন্য আমাদের পূঁজি বা অর্থ আছে। অর্থাৎ একটি গরিবের সংসার চালানোর মতো। দেশের উন্নয়নের জন্য, বিশেষত অবকাঠামো খাতে, অনেক বড় বড় প্রকল্প হাতে নিতে হয়। ঐরূপ বড় বড় প্রকল্পগুলোতে এককালীন অনেক বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। সেই সময় বৈদেশিক সাহায্য লাগে। বৈদেশিক সাহায্যের একটা বড় অংশ সাহায্যদাতা দেশের নিকট ফেরত যায় বিভিন্ন উসিলায় প্রত্যক্ষভাবে বা ছদ্মবেশে। বৈদেশিক সাহায্য থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব। সেই জন্য বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণ করা এবং বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে নীতিগত পর্যায়ে এবং বাস্তবে সততা না থাকলে দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অর্থনৈতিক অঙ্গনের স্বার্থ আলোচনা করতে গিয়ে শেষ পর্যায়ে যে মন্তব্যটি করছি সেটি হল দেশ পরিচালনাকারী নেতৃত্ব, দেশের ব্যবসায়ীক নেতৃত্ব ও সাধারণ জনগনের মধ্যে দেশপ্রেমের মাত্রা সম্পর্কিত। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নেহেরু, বা মালয়েশিয়র সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ হচ্ছেন ঐরূপ নেতৃত্বের উদাহরণ যারা দেশকে অর্থনৈতিক অঙ্গনে স্বাবলম্বী করার জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি স্থাপন করেছেন। নেহেরুর ক্ষেত্রে তার ভিত্তির উপর নির্ভর করেই পরবর্তী নেতারা অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। মাহাথীর এর ক্ষেত্রে তিনি নিজেই নিজের রচিত ভিত্তিকে ব্যবহার করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রসঙ্গে রষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুলাংশে দৃঢ়চেতা ছিলেন। পরবর্তীতে ঐরূপ কঠোর মনোবলসম্পন্ন নেতা চোখে পড়েনি।

বিদেশনীতির অঙ্গনের স্বার্থ

বস্তুত, অর্থনৈতিক অঙ্গনের স্বার্থ, বিদেশ নীতির অঙ্গনের স্বার্থ, বৈদেশিক বাণিজ্য-অঙ্গনের স্বার্থ ইত্যাদি একটির সঙ্গে আরেকটি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত এবং সম্পূর্ণ নির্মোহ দৃষ্টিতে কোনো একটিকে আলোচনা করা দূরহ। বিদেশ নীতির অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বার্থ হচ্ছে বন্ধু সৃষ্টি করা, বন্ধুত্ব বজায় রাখা, বন্ধুর কাছ থেকে উপকার নেওয়া এবং প্রয়োজনে নিজের স্বার্থের ক্ষতি না করে বন্ধুর উপকার করা। প্রশ্ন হচ্ছে কাকে বন্ধু বানাবো এবং কার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখবো? বাংলাদেশ শাসনকারী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক আদর্শ বা রাজনৈতিক চাওয়া-পাওয়ার উপরে নির্ভর করে বন্ধু বানানো ও বন্ধুত্ব বজায় রাখা। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ শাসনকারী দলগুলোর মধ্যে কমিউনিস্ট মতাদর্শ অবলম্বী ছিল না বা এখনও নাই। অতএব, পৃথিবীর যে সকল দেশ কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা শাসিত তাদের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি ও বজায় রাখার ক্ষেত্রে একরকম সিদ্ধান্ত হবে। হয়তোবা সেইসব ক্ষেত্রে আদর্শ থেকেও বেশি মূল্যবান উপাত্ত হবে অর্থনৈতিক অথবা বাণিজ্যিক লাভ বা ক্ষতি। আরেকটি উদাহরণ দেই, বাংলাদেশকে অবশ্যই বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণ করতে হয়। অতএব বৈদেশিক সাহায্য দাতা দেশগুলোর সঙ্গে অথবা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা প্রয়োজন যথা জাপান, পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না, যথা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, যথা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ইত্যাদি। যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীতে একটি বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি অতএব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইঙ্গিতে বা পছন্দে পৃথিবীতে অনেক কিছুই হয়। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা প্রয়োজন। অন্যরকম আরেকটি উদাহরণ দেই। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মুসলিম অধ্যুষিত; বাংলাদেশের শতকরা নব্বই ভাগ জনগণ মুসলমান। সৌদি আরবে অবস্থিত পবিত্র মক্কা ও মদীনা নগরীর সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের সুসম্পর্ক কেয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে এবং রাখতেই হবে। মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলো তেল সমৃদ্ধ, এবং বাংলাদেশকে তেল আমদানি করতেই হবে। পৃথিবীর বহু দেশে শ্রম দেবার মতো জনশক্তি কম তাই তারা অন্যান্য দেশ থেকে শ্রমিক আমদানি করে। শ্রমিক আমদানি করে এমন দেশের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। শ্রমিক রপ্তানি করে এমন দেশগুলোর মধ্যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হল বাংলাদেশ। অতএব, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক রাখাটা একাধিক কারণেই প্রয়োজন। আরেকটি উদাহরণ দেই। ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্জনের সময় ভারত সাহায্য করেছিল; তাই আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু, কৃতজ্ঞতার সীমারেখা গত চল্লিশ বছরে টানা হয়নি। এইজন্য কৃতজ্ঞতার উসিলায় ভারতকে আমরা কতটুকু সুবিধা দিব এই বিষয়টিও নিষ্পত্তি হয়নি। যে কয়েকটি উদাহরণ এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় দিলাম সেটা থেকে এটাই উঠে আসে যে, বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ বহুমুখী এবং একাধিক উপাত্তের উপর নির্ভরশীল। কোন উপাত্তটি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে সেটা নির্ভর করছে সরকার পরিচালনাকারী রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গির উপর। আমার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব তথা দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারটি নির্মোহভাবে বা আবেগ বর্জিতভাবে স্থির করে ফেলতে হবে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের বৈদেশিক নীতির অন্যতম স্তম্ভ। আমরা ভারতকে পছন্দ করি বা না করি, এই স্তম্ভটিকে অস্থিতিশীল রেখে কমপ্রিহেনসিভ বা সার্বিক বৈদেশিক নীতি ডেভেলপ করা দূরহ। বৈদেশিক নীতির আরেকটি অদৃশ্য স্তম্ভ হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষের ধর্ম বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের উপর যেন কোনো বিদেশী বন্ধু অযাচিত প্রভাব বিস্তার না করে। বিদেশ নীতির অঙ্গনে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার জন্য একটি নীতিবাক্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হল নীতি নির্ধারকগণ যেন বলেন আমি প্রথমে একজন বাংলাদেশী অতঃপর আমি একজন বিশ্বের নাগরিক তথা অন্য দেশের বন্ধু।

বাণিজ্যিক অঙ্গনের স্বার্থ

বাণিজ্যিক অঙ্গনের স্বার্থ হচ্ছে, অতি সাদামাটা ভাষায়, কার কাছে আমি বেশি দামে আমার পণ্য বেঁচতে পারবো এবং কার কাছ থেকে আমি তুলনামূলক কম দামে ভালো পণ্য কিনতে পারবো। বাণিজ্যিক অঙ্গনের স্বার্থের আরেকটি দিক হল দেশের মধ্যে যারা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং দেশের স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা। ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িত ব্যক্তিগণ চাইবেন যতবেশি সম্ভব মুনাফা করতে। ব্যবসায়ীগণ সীমাহীন মুনাফা করলে সাধারণ জনগণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সাধারণ জনগণ ক্ষতিগ্রস্থ হলে তারা সরকারের উপর বিরক্ত হয়। সরকার পরিচালনকারী যে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বাণিজ্যিক অঙ্গন ও জনগণের সন্তুষ্টি। অনেক সম্পদশালী বা বিত্তশালী বা সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীগণ আমদানী নির্ভর হতে পছন্দ করেন। কারণ, আমদানীতেই ব্যবসায়ীক ব্যক্তিত্বের দ্রুত উন্নতি সম্ভব। কিন্তু আমদানী নির্ভর অর্থনীতি দেশীয় শিল্পের প্রসারে বাধা। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ হচ্ছে নিজেদের পণ্য বিক্রি করে যেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবো, সেই বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস আমদানী করা। জনগোষ্ঠীর অতি ক্ষুদ্র অংশের সন্তুষ্টির জন্য বৈদেশিক বাণিজ্যে আমাদনীকে প্রাধান্য দেওয়া দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। বিলাসী দ্রব্য ব্যবহারে অনীহা বা অনিচ্ছার সৃষ্টি করাটাও সরকার পরিচালনায় একটি দায়িত্ব। বাণিজ্যিক অঙ্গনের আরেকটি স্বার্থ হল বেশি বেশি সংখ্যক ব্যক্তিকে ব্যবসায় জড়িত করা অর্থাৎ একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ যেন কেউ না পায়। এখানেও সরকার পরিচালনাকারী দল ও দলের নেতৃবৃন্দের সততা ও দেশপ্রেম জড়িত। ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের বিনিময়ে নীতি নির্ধারকগণ কোনো না কোনো ব্যবসায়ীকে খাতির করে দেওয়ার উদাহরণ প্রচুর। সেটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। অথবা ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের বিনিময়ে নীতি নির্ধারকগণ কোনো না কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে অথবা বিদেশী রপ্তানীকারকের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং সেই বিদেশী রাষ্ট্র বা বিদেশী রপ্তানীকারককে অযাচিত সুবিধা দেন। পৃথিবীতে কোনো দেশই সকল প্রকারের বিষয়ে সর্বাঙ্গীনভাবে সেলফ সাফিশিয়েন্ট বা আত্মনির্ভরশীল নয়; হওয়াও উচিত নয়। তাই বাণিজ্যিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বার্থ হচ্ছে দেশীয় দ্রব্য ব্যবহারে প্রাধান্য সৃষ্টি করা, বৈদেশিক মুদ্র ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া এবং বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠীর বিস্তৃতি ঘটানো।

প্রতিরক্ষা অঙ্গনের স্বার্থ

প্রতিরক্ষা অঙ্গনের বাংলাদেশের স্বার্থ হচ্ছে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনী রাখা। শক্তি বলতে শুধু সংখ্যাকে বোঝায় না। অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জামাদির গুণগত মান, সৈনিকগণের প্রশিক্ষণের মান এবং সৈনিকগণের মনোবল তথা দেশরক্ষার জন্য প্রতিজ্ঞার শক্তি---এই তিনটি মিলয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনী। প্রতিরক্ষা অঙ্গনে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সম্বন্ধে আমরা পুরোপুরি অসচেতন নই। বাংলাদেশের অস্তিত্বের ৩৬ বছর আমরা একরকম চিন্তা করেছি এবং বিগত ৪টি বছর অন্যরকম চিন্তা হচ্ছে বলে আম

জনগণকে স্বাধীকার বা স্বায়ত্ত্বশাসনের জন্য প্রস্তুত করার প্রধান

১১ পৃষ্ঠার পর

ার অনুভূতি। পৃথিবীতে একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের সম্পর্ক যত ভালোই হোক না কেন, কোনো দেশই নিজে আত্মরক্ষার বিষয়টিকে অবহেলা করে না। ভারত প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি কী হতে পারে সেটি গত ৪ বছর যাবত আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তোলা মানে এই নয় যে আমি ভারতের শত্রু বা ভারত আমার শত্রু; ঠিক এই বিষয়টি হয়ে উঠেছে বিতর্কিত। প্রতিরক্ষা অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করার কাজটি পুরোপুরি একা করা সম্ভব নয়। এক বা একাধিক বিদেশী রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা লাগবেই। প্রশ্ন হল কার কাছ থেকে সহযোগিতা নিব? নিজেকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আমি ভারতের নিকট থেকে সহযোগিতা গ্রহণের বিপক্ষে। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ নামক দুইটি রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বমূলক সুসম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অথবা দক্ষিণ এশিয়া নামক অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে অবশ্যই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা অঙ্গন এবং ভারতের প্রতিরক্ষা অঙ্গন সহযোগিতা করতে পারে।

ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্বার্থ

ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে কোনো কিছু বলা স্পর্শকাতর। কিন্তু বিষয়টি প্রসঙ্গে বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকাও সমীচীন নয়। আমার নিজস্ব বিশ্বাস ও মূল্যায়নের উপর ভিত্তি করেই আমার বক্তব্য। ধর্মীয় বিশ্বাসে আমি একজন মুসলমান এবং এই বিশ্বাসই আমাকে শিক্ষা দেয় মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে কিভাবে মিলেমিশে সমাজে বসবাস করতে হবে। দ্বীন ইসলামের বিশ্বাস, অন্য যে কোনো ধর্মের বিশ্বাস থেকে ব্যতিক্রমধর্মী। মুসলমানদেরকে একত্রিত রাখার জন্য মহান সৃষ্টিকর্তাই একাধিক বিধান বা নিয়মের প্রচলন বাধ্য করেছেন। পনেরোশত বছরে বিশ্বের পারিপার্শ্বিকতা পরিবর্তিত হলেও, ধর্ম বিশ্বাসের মৌলিক স্তম্ভগুলোতে পরিবর্তনের কোনো অবকাশ নেই। আমি বিশ্বাস করি যে সকল ধর্মের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সকল মানুষের জন্য শান্তিতে বসবাস ও সকলের জন্য কল্যাণ। ধর্ম বিশ্বাসগুলোর মধ্যে নবীনতম হচ্ছে ইসলাম। তাই ইসলামের আদেশ বা বিধিনিষেধগুলো, অন্য ধর্মের তুলনায় অধিকতর বিস্তৃত। এই প্রসঙ্গটি অনেকেই ভুল বোঝেন। পুরো বিশ্ব মুসলমানদের নিয়মে চলবে না এটা আমি বিশ্বাস করি এবং স্বীকার করি। কিন্তু, মুসলমানগণ নিজেদের বিশ্বাস মোতাবেক চলতে পারে এবং চলতে পারবেন যদি তারা চান এটাও আমি বিশ্বাস করি। পৃথিবীর শতকরা ৯৯ ভাগের মতো মুসলমান হচ্ছে জন্মসূত্রে মুসলমান। যারা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হচ্ছেন তাদের চিন্তা চেতনা, জন্মসূত্রের মুসলমানদের তুলনায় অধিকতর প্রণিধানযোগ্য। ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি। ধর্মের সবকিছুই সংস্কৃতির অংশ নয়, আবার যা-ই কিছু সংস্কৃতির অংশ সেগুলো সবই ধর্মের বিধান নয়। ভূগোলের কারণে, পরিবেশের কারণে, আবহাওয়ার কারণে, যুদ্ধবিগ্রহের কারণে তথা ইত্যাদি কারণে ধর্মীয় বিধানাবলী পালনের উপর যে প্রভাব পড়বে বা পড়তে পারে সেই প্রসঙ্গে শুরুতেই ব্যাখ্যা করা আছে। উদাহরণস্বরূপ চৌদ্দশত বা পনেরোশত বছর পূর্বেই বলা আছে সমুদ্রে চলাচলের সময় বা ভ্রমণের সময় বা যুদ্ধের সময় নামাজ রোজা এবং মানবাধিকার কিভাবে পালিত হবে। অপরপক্ষে সাংস্কৃতিক কর্মকা- প্রতিনিয়তই পরিশীলিত বা রূপান্তরিত হচ্ছে। সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের উপরে ভূগোলের প্রভাব, পরিবেশের প্রভাব, প্রতিবেশির প্রভাব, টেকনোলোজীর প্রভাব পড়তে বাধ্য এবং পড়ছেই। আমি মনে করি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা শতভাগ অর্জন সম্ভব নয়; এই মুহূর্তে শতভাগ নাইও। তবে সাংস্কৃতিক নিরাপত্তার প্রতি হুমকীর উৎপত্তিস্থল যদি আমাদের জানা থাকে তাহলে সেই হুমকী মোকাবিলা করা সহজ। সাংস্কৃতিক কর্মকা- বলতে যা বোঝায় তার মধ্যে চিত্রকলা, ললিতকলা ও সঙ্গীত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অপ্রতিরোধ্য বাহন ও প্রচারক হয়ে দাঁড়িয়েছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং টেকনোলোজী। জাতীয় পর্যায়ের নীতি নির্ধারকগণ যদি সচেতন না হন তাহলে অতি সহজেই সাংস্কৃতিক প্রগতির উসিলায় ধর্মীয় নীতি বিসর্জন যাবে। বাংলাদেশের জনগণের প্রায় ৯৮ ভাগই হলেন বাঙালি। প্রতিবেশী রাজ্য ভারতের অন্যতম প্রদেশ পশ্চিম বঙ্গের জনগণের প্রায় ৯৬ ভাগই হলেন বাঙালি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ মিলে জনসংখ্যা প্রায় ২৭ কোটি। আরো প্রায় ২ বা ৩ কোটি বাঙালি পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি হোমোজিনিয়াস বা একই গড়নের নয়। কারণ, এদের নিজস্ব ধর্মীয় চিন্তা চেতনা এদেরকে প্রভাবান্বিত করে, পৃথিবীর কোথায় বসবাস করছে সেটাও এদেরকে প্রভাবান্বিত করে। অপরপক্ষে পৃথিবীতে মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটি। এরা ৩০টির মতো বড় দেশে  বিস্তৃত আবার একজনও মুসলমান নেই এমন দেশও পৃথিবীতে নেই। এদের ভৌগলিক পরিবেশের মধ্যে পার্থক্য আছে, ভাষায় পার্থক্য আছে, রাষ্ট্রীয় পরিবেশে পার্থক্য আছে। সবকিছু মিলিয়ে এদের ধর্ম বিশ্বাস এদের সংস্কৃতির কর্মকা-ের উপর প্রভাব বিস্তার করে। প্রশ্ন হল, ধর্মীয় বিশ্বাস সংস্কৃতির উপর বেশি প্রভাব বিস্তার করবে নাকি সংস্কৃতিক অভ্যাস বা আচার ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রভাবান্বিত করবে? সংস্কৃতিক বিশ্বাসে মোট একটি জীবন যথা এই পৃথিবীর জীবন। মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসে দুইটি জীবন যথা এই দুনিয়া ও আখেরাত। যেই ব্যক্তি আখেরাতকে বেশি প্রাধান্য দিবে সে ধর্মকে বেশি মান্য করবে এবং সংস্কৃতিক কর্মকা- দ্বারা ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রভাবান্বিত হতে দেবে না। অপরপক্ষে যেই ব্যক্তি দুনিয়াকে প্রাধান্য দেবে তিনি সংস্কৃতি কর্মকা- বা আচার বা বিশ্বাসকে বেশি প্রাধান্য দিবেন। যারা মধ্যপন্থী তারা উভয় কূল রক্ষা করে চলবেন। শিক্ষিত বিবেকবান ধর্মাবলম্বীদের জন্য মধ্যপন্থা অবলম্বন সহজতর। চূড়ান্ত পর্যায়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ হচ্ছে সমঝোতার পরিবেশ রাখা যেন সকল ধর্মের বিশ্বাসীগণই নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারে ও নিজ নিজ ধর্মের প্রসার ঘটাতে পারে। অপরপক্ষে মানুষ যেন স্বাধীনভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতে পারে। বাংলাদেশের জনগণ বিদেশী সংস্কৃতিক কর্মকা-ের বা সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কতটুকু প্রভাবান্বিত হবেন বা হবেন না এটা নির্ভর করছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিবেশের উপর। আমাদের স্বার্থ হচ্ছে সকল মানুষকে সহঅবস্থানে রাখা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশে রাখা।

 

 

২য় পর্ব

প্রশ্ন-৩: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সার্বভৌম প্রতিরক্ষার আলোকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিত?

 

উত্তর-৩: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির তিনটি স্তম্ভ আছে বলে আমি মনি করি। প্রত্যেকটি স্তম্ভই গুরুত্বপূর্ণ। বিগত ৪১ বছরে বিভিন্ন সরকারের আমলে পররাষ্ট্র নীতি একটি সরলরেখায় পরিচালিত হয়নি। না হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, পররাষ্ট্র নীতি সমকালীন বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে এবং জাতীয় প্রয়োজনে ঊনিশ-বিশ হতে পারে বা ডানে-বামে যেতে পারে। কিন্তু মূল স্তম্ভগুলোকে মান্য করে বা গ্রাহ্য করেই চলতে হবে।

আমার দৃষ্টিতে প্রথম স্তম্ভ হচ্ছে ভৌগলিকভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা বা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা। নিদেনপক্ষে ভালোমন্দ মিশিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখা। অর্থাৎ, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরীতার সম্পর্ক না রাখা। বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হচ্ছে ভারত। ভারত বাংলাদেশের তিনদিকে  বিস্তৃত। ভারত এই মুহূর্তে উদীয়মান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শক্তি ও সামরিক শক্তি। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হওয়ার সুবাদে, ভারত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শক্তিতেও পরিণত হয়েছে। এশিয়া মহাদেশে ভারতের প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে চীন, এবং বিশ্ব অঙ্গনে যুগপৎ প্রতিযোগী ও সহযোগী হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভৌগলিকভাবে এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে ভারত বাংলাদেশ থেকে অনেক বড়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে, ভারত প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে সৈনিকের রক্ত দিয়ে, অস্ত্র-গোলাবারূদ দিয়ে, প্রশিক্ষণ সুবিধা দিয়ে এবং এককোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে। ১৯৭১ সালের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনুকূলে শান্তিপূর্ণ জোরালো প্রচারণা চালিয়েছে ভারত। সার্বিকভাবে বাংলাদেশ ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এই কৃতজ্ঞতার সীমারেখা বিশেষভাবে আলোচিত হয়নি। কৃতজ্ঞতা এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় যে, চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী করা যায় না। কৃতজ্ঞতা রাবার-ব্যান্ড এর মতো ইলাস্টিক। অতএব, কৃতজ্ঞতার ইলাসটিসিটি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আমাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে মায়ানমার অন্যতম। মায়ানমার থেকে সুবিধা নেয়ার জন্য এই মুহূর্তে পৃথিবী উন্মুখ। আমরা যথেষ্ঠ উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারিনি, পারা উচিত। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত আমরা ছিলাম পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অংশ। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অনিয়মিতভাবে এবং বিদঘুটেভাবে ওঠানামা করে বা উষ্ণ থেকে শীতল, শীতল থেকে উষ্ণ এরকম হতে থাকে। পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র সংঘের তথা ওআইসি’র একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। অন্য নিকট প্রতিবেশীরা হচ্ছে নেপাল, ভুটান, চীন, থাইল্যান্ড এবং আফগানিস্তান। এদের সকলের প্রসঙ্গে বিস্তারিত বক্তব্য রাখছি না। চীন প্রসঙ্গে বলতে হয় যে, চীন মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিরোধীতা করেছিল কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীকাল থেকেই আমাদের সাথে সুসম্পর্ক রেখেছে। অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করেছে। উপহারস্বরূপ ভৌতকাঠামো উন্নয়নে অবদান রেখেছে। বাণিজ্যিকভাবে বড় অংশীদার হয়েছে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম স্তম্ভ আলোচনা করতে গিয়ে শেষ বাক্যে বলতে চাই যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে যথা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীন; কোনো একটির দিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকে যাওয়া বিপদজনক। যেই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, সেই প্রশ্নের বাক্য বিন্যাসে তিনটি শব্দ আছে যথা সার্বভৌম প্রতিরক্ষার আলোকে। এই কথাটির ব্যাখ্যায় বলতে চাই যে একটি দেশের প্রতিরক্ষার প্রথম অস্ত্র বা প্রথম সারির বুহ্য হল, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত কূটনীতি। আশা করি এই অনুচ্ছেদের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার হবে যে, আমরা কার কার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চাই এবং ঐ সুসম্পর্ক রাখার ফলশ্র“তিতে বৈরীতা যখন দূর হবে তখন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার নিমিত্তে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহজতর হবে।

আমার দৃষ্টিতে দ্বিতীয় স্তম্ভ হচ্ছে, মুসলিম বিশ্বের  সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর যে সংস্থা আছে তার নাম অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কনফারেন্স। এই মুহূর্তে এই সংস্থার মহাসচিব হচ্ছেন তুরস্কের একজন প্রখ্যাত সাবেক মন্ত্রী। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে যখন এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল তখনও, বাংলাদেশ এর সদস্য হয়নি। সেই সময় পর্যন্ত পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিও দেয়নি। স্বীকৃতি প্রদান সাপেক্ষে বাংলাদেশ ঐ সম্মেলনে উপস্থিত হতে সম্মত হয়েছিল ওআইসির সদস্যগণ পাকিস্তানকে চাপ দিয়েছিল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে, এর বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই থেকে ওআইসির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুরু। ওআইসির অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো। আবার এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সৌদি আরব। সৌদি আরবে আছে পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদীনা নগরী। পৃথিবীর মুসলমানগণ সৌদি নেতাকে পছন্দ করুন বা না করুন, অথবা সৌদি আরবের কোনো নেতা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের নেতাকে পছন্দ করুন বা না করুন, বাস্তবতা হল মক্কা ও মদীনার সঙ্গে পৃথিবীর সকল মুসলমানের যে আত্মীক সম্পর্ক সেটা কোনোদিনই বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। মুসলিম বিশ্বের জনগণের মধ্যে আত্মীক সম্পর্ক মক্কা ও মদীনা নগরী কেন্দ্রীক। অতএব, বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার নিমিত্তেই মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে তথা বজায় রাখতে হবে। একটি ঐতিহাসিক তথ্য হচ্ছে ১৯৭১ সালে আমেরিকা ও চীন এর মতো, সৌদি আরব বা মুসলিম বিশ্বের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশও, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দেননি; তারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন। এই অজুহাতে বাংলাদেশের চিন্তাশীল জনগোষ্ঠীর একটি অংশ কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে মুসলিম বিশ্ব থেকে দূরে রাখতে আগ্রহী। আরেকটি ভৌগলিক তথ্য হচ্ছে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কো থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো পরস্পরের লাগোয়া। পাকিস্তানের পরে, ভারতের উপস্থিতির কারণে, বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। আবার, বাংলাদেশের পরে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড এর উপস্থিতির কারণে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। মালয়েশিয়ার সঙ্গে সমুদ্রের অল্প পানি ব্যতীত ইন্দোনেশিয়ার কোনো দূরত্ব নেই। ইন্দোনেশিয়া হচেছ মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পূর্বে অবস্থিত দেশ। এই ভৌগলিক অবস্থানের প্রভাব বাংলাদেশের জনগণের মনস্তাত্ত্বিকতার উপর পড়ে। যাহোক, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দ্বিতীয় স্তম্ভ প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য হচ্ছে আমরা মুসলিম বিশ্ব থেকে দূরে থাকাটা অনুচিত।

আমার মূল্যায়নে পররাষ্ট্র নীতির তৃতীয় স্তম্ভ হচ্ছে অর্থনৈতিক তথা বাণিজ্যিক স্বার্থ। পৃথিবীর যেই দেশের সঙ্গে বা যেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে আমার দেশের অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লাভ আছে, বাংলাদেশকে সেই সম্পর্কটি রাখতে হবে। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একবার বলেছি যে, একটি দেশের প্রতিরক্ষার অলিখিত প্রথম বুহ্য হচ্ছে কূটনীতি বা পররাষ্ট্রনীতি। বৈরীতা অবসানে যখন কূটনীতি ব্যর্থ হয় তখন যুদ্ধ লাগে এবং যুদ্ধের সময় প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রয়োজন। অনুরূপ সফল কূটনীতির আনুষঙ্গিক ফল হলো সফল বাণিজ্যিক সম্পর্ক। বাণিজ্যকে সম্প্রসারিত করার জন্য সর্বপ্রকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয়। উদাহরণ দিয়ে বলি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন এদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার জন্য শক্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সর্ববৃহত বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক অব্যাহত রাখতেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। উল্লেখযোগ্য বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারগণ দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ নয় অথবা মুসলিম বিশ্বের কোনো দেশ নয়। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শেষ পর্যায়ে এসে আমি সারমর্মে বলতে চাই যে, তিনটি স্তম্ভের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করেই পররাষ্ট্র নীতি গড়ে তুলতে হয়। তবে এই মুহূর্তে (২০১২) মানুষের নিকট দৃশ্যমান পররাষ্ট্রনীতির স্তম্ভ হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং বাংলাদেশ-আমেরিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের সার্বভৌম প্রতিরক্ষার আলোকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত এবং এমনই আছে যে, ভারত আমাদেরকে স্বশরীরে বা সরেজমিনে আক্রমণ করবে না, তবে ভারত যে আমাদের সার্বভৌমত্বের সম্মান করবে তার নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে অনেক অমিমাংসিত বিষয় আছে যার জন্য ভারতের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি এবং বাংলাদেশের ভারতের প্রতি নতজানু পররাষ্ট্রনীতিকে দায়ী করা হয়।

 

প্রশ্ন-৪: বাঙালি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্কের অবসান কীভাবে সম্ভব?

উত্তর-৪: আমি জন্মসূত্রে বাঙালি। আমি জন্মসূত্রে একজন মুসলমান। আমি আগে বাঙালি নাকি আগে মুসলমান সেটা নিয়ে বিতর্ক করা যেতেই পারে, তবে এই মুহূর্তে করছি না। আমার বাঙালিত্ব এবং আমার মুসলমানিত্ব কোনটির উপর আমি গুরুত্ব বেশি দিব সেটা নিয়েও বিতর্ক করা যেতেই পারে, তবে এই মুহূতে করছি না। আলোচনার খাতিরে আমরা সম্মানিত পাঠককে ১৯৫০ এর দশকে বা ১৯৬০ এর দশকে মানসিকভাবে নিয়ে যাই। সে সময় পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্র ছিল যার দুইটি প্রদেশ ছিল। একটি প্রদেশের নাম ছিল পশ্চিম পাকিস্তান এবং অপর প্রদেশটির নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। দুই প্রদেশের মানুষের মধ্যে ভাষার মিল ছিল না, খাওয়া দাওয়ার অভ্যাসে আংশিক মিল ছিল না, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সামাজিক প্রথাবলীতে আংশিক মিল ছিল না। দুই প্রদেশের মানুষের মিল ছিল এমন বিষয় খুব কম ছিল। একমাত্র দ্বীন ইসলাম বা ধর্ম বিশ্বাসই উল্লেখযোগ্য মিল এর বিষয় ছিল। দ্বীন ইসলাম এর শিক্ষা হচ্ছে ন্যায় পরায়নতা, সুবিচার এবং ত্যাগ। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে যে কোনো কারণেই হোক শাসন ক্ষমতা তথা নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা মূলত পশ্চিম পাকিস্তানী নাগরিকদের হাতে ছিল। সেই শাসক নাগরিকগণ দ্বীন ইসলামের নীতি অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকগণ বিবিধ আঙ্গিকে অবিচার, শোষণ, অসম্মান ও অন্যায়ের শিকার হয়েছিল। এই বিবিধ আঙ্গিকের অবিচার-শোষণ-অসম্মান-অন্যায়ের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ক্রমে ক্রমে প্রতিবাদমুখী হয়ে উঠেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বলতে শতকরা ৯৯ ভাগ বাঙালি। তাহলে অনেকটা এরকম দাঁড়ায় যে, বাঙালিরাই নির্যাতিত, নিপীড়িত হওয়ার কারণে রাষ্ট্রের অবাঙালি অংশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখী হয়ে উঠেছিল। ঐ প্রতিবাদের একাধিক আঙ্গিক ছিল যথা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক। রাজনৈতিক প্রতিবাদের চূড়ান্ত ধাপ ছিল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করা যেখানে মানুষে মানুষে অন্যায়, নিপীড়িন, শোষণ দূরীভূত হবে। নতুন রাষ্ট্রের নাম স্থির করা হয়েছিল বাংলাদেশ। অতএব এটা বলা যায় যে, নিপীড়িত, নির্যাতিত বাঙালিগণ দীর্ঘ সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্থাপন করলো একটি নতুন রাষ্ট্র যার নাম বাংলাদেশ।

নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে বা ভাষাগত পরিচয়ে আমরা বাঙালি, রাজনৈতিক ও নাগরিকত্বের পরিচয়ে আমরা বাংলাদেশী। ১৯৭০ এর দশকের শেষাংশে, আশির দশকের কিছু সময় এবং নব্বই দশকের কিছু সময় আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী এই নিয়ে বিতর্ক চালু রাখা হয়েছিল। একপক্ষ বলতেন, আমরা বাঙালি, অপরপক্ষ বলতেন আমরা বাংলাদেশী। আমি যখন লেখার সুযোগ পাওয়া শুরু করলাম, তখন থেকেই বলা শুরু করলাম আমার মধ্যে চারটি পরিচয় বিদ্যমান যথা আমি বাঙালি, আমি মুসলমান, আমি মুক্তিযোদ্ধা এবং আমি বাংলাদেশী। অতি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যায় বলি, আমি জন্মসূত্রে বাঙালি এবং জন্মসূত্রে মুসলমান। আমি আমার বাঙালি ও মুসলমানিত্বের পরিচয় অব্যাহত রেখেছি নিজ ইচ্ছায় আনন্দের সঙ্গে। বাঙালি হওয়ার কারণে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে আমি নির্যাতন ও অন্যায়ের শিকার হয়েছিলাম তাই, আমি প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। প্রতিবাদের চূড়ান্ত রূপ ছিল মুক্তিযুদ্ধ। আমি নিজ ইচ্ছায় মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম (যেমনটি হাজার হাজার লোক নিজ ইচ্ছায় যায়নি)। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশের নাম বাংলাদেশ। অতএব আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশী। কোনো একটি পরিচয়কে বাদ দিয়ে অন্য পরিচয়কে নিয়ে মাতামাতি করার সুযোগ নেই।

তবে আমার মতে অলংঘনীয় দুটি যুক্তি আছে। প্রথম যুক্তি হচ্ছে বাংলাদেশী হলে বাঙালিত্ব অপসারিত হয় না। কিন্তু বাংলাদেশীদের মধ্যে প্রচুর অবাঙালিও আছেন। আধুনিক নেশন-স্টেইট বা জাতি-রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বা ভাষাভিত্তিক বা বিশ্বাসভিত্তিক বহুমাত্রিকত। বাংলাদেশও এর থেকে ব্যতিক্রম হতে পারে না। বাংলাদেশী সকল প্রকার নাগরিকের সমন্বিত কর্মকাণ্ডের প্রকাশকে বাংলাদেশী সংস্কৃতি বা বাংলাদেশী রাজনীতি বা বাংলাদেশী ঐতিহ্য বলা যাবে। তবে যেহেতু বাংলাদেশীগণের মধ্যে বাঙালিরাই প্রায় শতকরা ৯৭ ভাগ তাই বাঙালি চিন্তা-চেতনা-কর্মপদ্ধতি-ঐতিহ্য বাংলাদেশীত্বের মধ্যে প্রাধান্য পাবে। আমার এই প্রশ্নের উত্তর শেষ করছি এই বলে যে, আমাদের ধর্মবিশ্বাস মতে এই পৃথিবীর জীবন অতি সংক্ষিপ্ত এবং প্রত্যেকের জন্য অনির্ধারিত মেয়াদের, অপরপক্ষে মৃত্যু-পরবর্তী জীবন হচ্ছে সীমাহীন এবং অনন্ত। তাই আমরা বাংলাদেশী এবং বাঙালি যাই হই না কেন, সেই চেতনার প্রকাশে ধর্ম বিশ্বাসের এই আঙ্গিকটি অবশ্যই প্রভাব বিস্তার করবে কম হোক বেশি হোক। অতএব এই প্রশ্নের ভাষা মোতাবেক, বাঙালি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে হলে, সময় লাগবে, ধৈর্য লাগবে এবং চলমান বিশ্বের বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে।

 

প্রশ্ন-৫: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়টির স্থায়ী সমাধানের পথে কি আন্তর্জাতিক কোনো ষড়যন্ত্র আছে? বিস্তারিত জানতে চাই।

উত্তর-৫: এই প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর অনেক দীর্ঘ হবে। তাই এই প্রশ্নের উত্তরের প্রথম অংশ আজকে দিচ্ছি এবং আগামীবারে এই প্রশ্নের উত্তরেরই ধারাবাহিকতা দিয়ে শুরু করবো। এখন ২০১২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শব্দযুগল দিয়ে আমরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি ভূখণ্ডকে তথা তিনটি প্রশাসনিক জেলাকে বুঝাই। জেলাগুলোর নাম খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন সরকারের উন্নয়নমুখী একটি সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র বাংলাদেশে যতগুলো মহকুমা ছিল, সবগুলোকে আপগ্রেইড বা মান-উন্নতি করে জেলায় রূপান্তরিত করা হয়েছিল। ঐ মর্মেই পার্বত্য চট্টগ্রাম নামক জেলাটির তিনটি মহকুমা তিনটি নতুন জেলায় পরিণত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম নামক জেলা সৃষ্টি হয়েছিল ১৮৬০ সালে তৎকালীন বৃটিশ ভারতীয় সরকারের সিদ্ধান্তে। মূল জেলার নাম ছিল চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম জেলার পূর্ব অংশ পাহাড়ী বা পার্বত্য ছিল বিধায় প্রশাসনিক কাজে অসুবিধা হতো। তাই চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়ী বা পার্বত্য অংশকে আলাদা জেলা করা হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম নাম দিয়ে। ঐ আমল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ নৃতাত্ত্বিকভাবে চট্টগ্রাম বা তৎকালীন বঙ্গপ্রদেশের জনগণ থেকে আলাদা ছিল।

বৃটিশরা ভারত শাসন শুরু করেছিল ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে। শাসনভার প্রত্যক্ষভাবে লন্ডনে অবস্থিত বৃটিশ সরকারের হাতে যায় ১৮৫৭ সালের পরে। তৎকালীন (মানে দেড়শো পোনে দুইশত বছর আগে) ভারতের উত্তর-পশ্চিম অংশ এবং উত্তর-পূর্ব অংশ ভৌগলিকভাবে পাহাড়ী বা পার্বত্য ছিল। ঐ এলাকাগুলোর মানুষগুলোও নৃতাত্ত্বিকভাবে আলাদা ছিল। বৃহত্তর ভারতের মানুষ ছিল আর্য সম্প্রদায়ভুক্ত এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষগুলো ছিল মঙ্গলয়েড জনগোষ্ঠীর। ১৮৫৭ সালের পর থেকেই বৃটিশ সরকার ভারত সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তার করা শুরু করে এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা শুরু করে। এইরূপভাবে অর্জিত, ভৌগলিক ও নৃতাত্ত্বিকভাবে ভিন্নতর এলাকাগুলোর জন্য তথা ঐ এলাকার জনগোষ্ঠীর জন্য বৃটিশ সরকার সাধারণ প্রশাসন থেকে একটু ভিন্ন প্রশাসন চালু করেছিলেন। আমার এই বক্তব্য পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্যও প্রযোজ্য।

১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান ও ভারত নামক দুইটি আলাদা রাষ্ট্র সৃষ্টি হয় তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের ভাগে পড়ে। ১৯৪৭ এর পূর্বে ৫-৭ বছর যাবত এই স্বাধীনতা নিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তৎকালীন নেতাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলে এবং বৃটিশ সরকারের সঙ্গে দেন-দরবার চলে। সেই সময়, বৃটিশ সরকার এবং তার মিত্রগণ বারবার চিন্তা করেছিলেন যে, বৃটিশ শাসন কোনো না কোনোদিন অবসান হবেই কিন্তু অবসানের পরেও অনাগত ভবিষ্যতে বৃটিশ বা তাদের শুভাকাক্সক্ষীদের স্বার্থ কী নিয়মে রক্ষা করা যায় তার কোনো না কোনো বন্দোবস্ত করা উচিত। বৃটিশরা চলে গেলে ভারত ভূখণ্ডের রাজনৈতিক পরিচয় কী হবে সেই নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছিল। অনেকগুলো প্রকাশিত বা আধা প্রকাশিত প্রস্তাবের মধ্যে একটি প্রস্তাবের একটি অংশের নাম ছিল ক্রাউন-কলোনী স্থাপন। ক্রাউন-কলোনী মানে ছিল এই মর্মে যে, তৎকালীন উত্তর পূর্ব ভারত এর পাহাড়ী অঞ্চল তথা ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগণকে নিয়ে একটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হবে। এই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্রের উত্তর সীমানা হবে চীন এর সীমান্ত এবং দক্ষিণ-পূর্ব সীমানা হবে বঙ্গপোসাগর। এই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বতম ভূখণ্ড হওয়ার কথা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম। সম্মানিত পাঠক, নিজের কল্পনাকে যদি ১৯৩৭ বা ৩৮ সালে ফেরত নিয়ে যান তাহলে সেই অবস্থান থেকে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখবেন যে, সেই আমলের বৃটিশ সরকার ২০১২ কিংবা ২০২৫ কিংবা ২০৫০ সালের দিকে তাকাচ্ছিলেন। এর ব্যাখ্যা একটু পরে দিব।

যাহোক, ১৯৪০ এর দশকে প্রথম ছয় বছর এমন আলোচনা ও তৎপরতা চলে যে, ক্রাউন-কলোনী স্থাপন প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। উত্তর-পূর্ব ভারত মূলত ভারতের অংশ থাকে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত। পরিকল্পনা বাতিল হলেও বৃটিশ সরকার বা তাদের মিত্রদের মনের অভ্যন্তরে লুকায়িত দূরদর্শী পরিকল্পনা বাতিল হয়েছে বলা সম্ভব নয়। যেই অবস্থায় বৃটিশগন উত্তর-পূর্ব ভারতকে তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী দুইটি রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়ে যায়, সেই অবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বা হচ্ছে অশান্তি, অসংহতি, অসংগতি এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ। এইরূপ সশস্ত্র বিদ্রোহীগুলোর বিভিন্ন নাম আছে। যারা বিদ্রোহ করে সংগঠিত করে এবং যারা বিদ্রোহী হয়ে নিজেদের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দেয় তারা এই বিদ্রোহগুলোকে বলে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম। যাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তারা এগুলোকে বলে রাষ্ট্রদ্রোহীতা এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বা শান্তি ও সংঘর্ষ বিজ্ঞান অধ্যায়নের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ইনসার্জেন্সি এবং এর নিরসন প্রক্রিয়াকে বলা হয় কাউন্টার ইনসার্জেন্সী। অতএব ঐ বিদ্রোহ বা ইনসার্জেন্সীগুলোর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিও শামিল। ১৯৫২ সালে প্রথমবার উত্তর-পূর্ব ভারতের তৎকালীন আসাম প্রদেশের নাগা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। সেই নাগা বিদ্রোহ এখনও চলছে, তবে অনেক স্তিমিত পর্যায়ে। একদশক পর শুরু হয়েছিল বৃহত্তর আসামের অহমিয়া জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহ যাদের মধ্যে অন্যতম বিদ্রোহী জনগোষ্ঠী হচ্ছে এখনকার সুপরিচিত উফলা (তথা ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম)। অনুরূপ মিজো জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্রোহ হয়েছে, ত্রিপুরা বা ত্রিপুরী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্রোহ হয়েছে এবং এখনও চলছে, এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মূলত চাকমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্রোহ হয়েছিল। চাকমা জনগোষ্ঠী প্রসঙ্গে, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এই প্রেক্ষাপট আমাকে বর্ণনা করতে হয়েছে কারণ বিশ্ব রাজনীতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উত্তর-পূর্ব ভারত সমগোত্রীয় সূতায় বাঁধা যদিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নিয়মে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশ নামক আলাদা রাষ্ট্রের অংশ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহীদের নাম ছিল শান্তিবাহিনী। শান্তিবাহিনী হলো সশস্ত্র বিদ্রোহীদের নাম। তারা যেই রাজনৈতিক দলের অংশ সেই দলের নাম হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল ১৯৭৫ এর একদম শেষাংশে। বিদ্রোহ কাগজে কলমে শেষ হয়েছে ১৯৯৭ এর একদম শেষাংশে। বিদ্রোহ এখনও সরেজমিনে শেষ হয়েছে, একথা বলা যাবে না। বিদ্রোহের কারণগুলো দূরীভূত হয়েছে তাও বলা যাবে না। সরকারি ভাষায় বিদ্রোহ দমন হয়েছে তাও বলা যাবে না। আবার বিদ্রোহ হবে না, এমন নিশ্চয়তাও দেওয়া যাবে না। এতগুলো ‘না’ বলার কারণ হচ্ছে এর পেছনে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ কিছু কারণ, দক্ষিণ-এশীয় আঞ্চলিক কারণ এবং আন্তর্জাতিক কারণ আছে বলে আমি মনে করি। এর ব্যাখ্যা আগামী কিস্তিতে দিবার আশা রাখি। এই প্রশ্নের উত্তর আগামী কিস্তিতে শেষ করবো ইনশাআল্লাহ এবং অন্য আরও তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিব আশা করি।

 

তৃতীয় পর্ব

প্রশ্ন-৬:  বাংলাদেশের সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু বলুন।

উত্তর: বাংলাদেশের সংবাদপত্র বা মিডিয়া আক্ষরিক অর্থে স্বাধীন। অর্থাৎ সংবাদপত্রে খবর প্রকাশ করা বা টেলিভিশনে কোনো সংবাদ প্রকাশ করার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো গুরুতর নিষেধাজ্ঞা নেই। তথা, এমন কোনো আইন নেই যে সংবাদ প্রকাশ করার পূর্বে সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। যারা পত্রিকায় কলাম লিখেন তাঁরা হচ্ছেন কলামিস্ট এবং যারা টেলিভিশনের টক-শো-তে অংশগ্রহণ করেন তাঁরা হচ্ছেন অংশগ্রহণকারী। কলামিস্ট এবং টক-শো-তে অংশগ্রহণকারীগণ একই ক্যাটাগরীর অর্থাৎ একজন কলমের মাধ্যমে বক্তব্য রাখছেন অপরজন মৌখিকভাবে রাখছেন। তাঁরা কী লিখতে পারবেন বা কী বলতে পারবেন সেটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি বিদ্যমান সেটা আইনানুগ নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি কঠোর। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই একটি টেলিভিশন চ্যানেল পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। যমুনা টিভি নামক একটি টিভি চ্যানেল প্রকাশিত হওয়ার জন্য আজ প্রায় আট বছর সময় অপেক্ষা করছে। আদালতের মাধ্যমে চূড়ান্ত রায় পাওয়ার পরেও, সরকারি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে চ্যানেলটির প্রকাশ বন্ধ রাখা হয়েছে। বছরখানিক পূর্বে আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, পরবর্তী আদালতের মাধ্যমে আইনী প্রক্রিয়ায় পত্রিকাটি প্রকাশনা অব্যাহত রাখার সুযোগ পায়। বাংলাদেশে যতগুলো টেলিভিশন চ্যানেল আছে প্রত্যেকটিতেই বিভিন্ন প্রকারের টক-শো অনুষ্ঠিত হয়। মাঝে মধ্যে টক-শো লাইভ-প্রচার বা সরাসরি সম্প্রচার যেন করা না হয় তার জন্য পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। একুশে টিভি, ইসলামিক টিভি এবং বাংলাভিষণ এই ধরণের চাপের মুখে পড়েছিল বলে আমরা অনুধাবন করেছিলাম। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে একটা আতঙ্কের মধ্যে রাখা হয়েছিল এই মর্মে যে, “তোমরা যদি উল্টাপাল্টা করো তথা তোমাদের চ্যানেলের মাধ্যমে যদি উল্টাপাল্টা বক্তব্য প্রকাশিত হয় তাহলে তোমাদের খবর আছে”! খবর মানে প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সাংবাদিক সমাজের উপরে বিভিন্ন প্রকারের চাপ সক্রিয় আছে। একটি হচ্ছে আদালত অবমাননার আতংক। আরেকটি হচ্ছে সাংবাদিক হত্যা হওয়ার আতংক। অপরটি হচ্ছে সাংবাদিক গুম হয়ে যাওয়ার আতংক। আরও একটি হচ্ছে সাংবাদিক আহত হয়ে আক্রান্ত হওয়ার আতংক। দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশের পক্ষ থেকে মারাত্মক পিটানি খাওয়া বা পুলিশের মতো দেখতে রাজনৈতিক ক্যাডারের হাতে মারাত্মক পিটানি খাওয়ার আতংকও বিদ্যমান।

 

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর স্বাধীনতা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের কারণে খর্ব হয়ে যায়। বিরোধী দলীয় নেত্রীর অনুষ্ঠান বা বক্তব্য চাইলেও অনেক টেলিভিশন চ্যানেলকে সরাসরি সম্প্রচার করতে দেয়া হয়নি বলে আমরা শুনতে পেয়েছি; যতটুকু অনুধাবন করতে পেরেছি তাতে মনে হয় ঘটনা সত্য। গুরুত্বপূর্ণ দূর্নীতির বিষয়ে রিপোর্ট করতে গেলেই টেলিভিশন সাংবাদিকগণ বিপদে পড়েন। সাধারণ জনগণের মধ্যে এই মুহূর্তের প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে যে, সাংবাদিক দম্পতি সাগর ও রুনী নিহত হওয়ার পিছনে বড় কারণ হচ্ছে তারা অনেক বড় দুর্নীতির অনুসন্ধান করছিলেন। গত তিন বছর ছয় মাসে সাংবাদিক নিহত হওয়ার সংখ্যা প্রায় দেড় ডজন, আহত হওয়ার সংখ্যা প্রায় দেড়শত এবং সম্পাদকসহ জেলে গিয়েছেন এমন সংখ্যাও যথেষ্ট।

 

১৯৭৫ সালের ১৬ জুন তারিখটি বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের ইতিহাসে তথা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ইতিহাসে, একটি কলো দিবস। বঙ্গবন্ধুর মতো একজন গণতান্ত্রিক ব্যক্তির হাতে মিডিয়া নিহত হবে, এই বিষয়টি ঘটে যাওয়ার পূর্বে কেইউ কল্পনাও করেনি। তাই সেই সময় যেমন মানুষ আতংকিত ছিল, এখনও মানুষ আতংকিত। আমার চূড়ান্ত মূল্যায়নে বাংলাদেশের মিডিয়া জগত এই মুহূর্তে আপাতত স্বাধীনতা ভোগ করছে কিন্তু বাস্তবিক স্বাধীনতা ভোগ করছে না বরং পরাধীনতার নাগপাশে বন্দি।

 

প্রশ্ন-৭:  পদ্মা সেতুর অর্থায়ন দুর্নীতির কারণে বিশ্ব ব্যাংক বন্ধ করে দিয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

 

উত্তর: পদ্মা সেতুর নির্মাণ এখনও শুরু হয়নি। প্রস্তুতি পর্ব চলছে। আমার জানামতে, বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই মর্মে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কনসালটেন্ট নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি হয়েছে। পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, বিশ্ব ব্যাংক তাদের হাতে মজুদ দুর্নীতি প্রসঙ্গে প্রমাণাদি বা কাগজপত্র বাংলাদেশ সরকারের নিকট হস্তান্তর করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সেখানে কী আছে সেটা দেশবাসীকে জানতে দেননি। সরকার বলছেন দুর্নীতি হয়নি, বিশ্ব ব্যাংক বলছেন দুর্নীতি হয়েছে। উভয় পক্ষ বক্তব্য উপস্থাপন করছেন বিশ্ববাসীর সামনে তথা বাংলাদেশীদের সামনে এবং উপস্থাপন করছেন মিডিয়ার মাধ্যমে। উভয় পক্ষ যদি জনগণকে আস্থায় নিয়ে প্রমাণাদি জনগণের সামনে দিতেন তাহলে জনগণ স্পষ্ট ধারণা পেতেন এবং আন্তরিকভাবে মন্তব্য করতে পারতেন।

 

বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুতে তাদের অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছে, আপাতত। আগামী জুলাই ২০১২তে এই প্রসঙ্গে চূড়ান্ত মত বিনিময় এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে বলে শুনেছি বা জেনেছি মিডিয়ার মাধ্যমে। ইতোমধ্যে সরকার জনাব আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে বদলী করে অন্যত্র দেয়ায় এটা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেই নেয়া হয়েছে যে, হয় যোগাযোগ মন্ত্রণালয় অথবা জনাব আবুল হোসেন ব্যক্তিগতভাবে কোনো না কোনো দুর্নীতি (অথবা অনিয়ম)-এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আমি যদি সরকার প্রধান হতাম, আমি বিষয়টিকে উন্মুক্তভাবে মোকাবিলা করতাম। যদি আমার মন্ত্রী দুর্নীতিতে জড়িত থাকতেন তাঁকে যেমন বিতাড়িত করতাম, অপরপক্ষে যদি জড়িত না থাকতেন তাহলে বিশ্ব ব্যাংককেও ভদ্রজনোচিত কঠোর উত্তর দিতাম। স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরে বিশ্ব ব্যাংকের হস্তক্ষেপ অনিয়ন্ত্রিত থাকতে পারে না। তবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আত্মসম্মানবোধ থাকতে হবে। আত্মসম্মানবোধ তখনই থাকতে পারে যখন আপনি দুর্নীতিমুক্ত হন এবং সৎ হন।

 

প্রশ্ন-৮:  সম্প্রতি সরকার কয়েকটি ব্যাংকের অনুমতি দিয়েছে- এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

উত্তর: আমার সংক্ষিপ্ত মন্তব্য হচ্ছে যে, এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। দলীয় ব্যক্তিদেরকে সুযোগ সুবিধা দেয়ার যে প্রক্রিয়া একটি রাজনৈতিক সরকার অনুসরণ করে, তারই ধারাবাহিকতায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীতহ হয়েছে। এই মুহূর্তে তথ্য প্রমাণ দিয়ে আমার পক্ষে উপস্থাপন করা সম্ভব নয় কিন্তু আমার আশংকা বা অনুভূতি হচ্ছে যে, বাংলাদেশের অর্থনীতিেিত, সরকার দলীয় ব্যক্তিদের বলয়ে যেই পরিমাণ কালো টাকা ঘোরাঘুরি করছে সেই কালো টাকা সাদা করার একটি আইনানুগ মাধ্যম সৃষ্টি করা হল নতুন ব্যাংকের অনুমতি দিয়ে। আগামী নির্বাচনের পূর্বে একান্তভাবেই সরকার অনুগত এই নতুন ব্যাংকগুলো কী ভূমিকা রাখবেন সে প্রসঙ্গে সকলের সজাগ দৃষ্টি প্রয়োজন।

 

 

Share this post

Add comment




You are here: প্রথম পৃষ্ঠা বিশেষ সাক্ষাৎকারে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক