ভোটার বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে
ঢাকা অফিস : দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চলমান ছবিসহ ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে হ-য-ব-র-ল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের অনুমিত হিসাবের চেয়ে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে ভোটার সংখ্যা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পছন্দের ব্যক্তিদের ভোটার বানাতে গণহারে জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ভোটার তালিকাভুক্ত করতে চাপ দিচ্ছেন। পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবে বাদ পড়ছেন অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি। মাঠপর্যায়ে ক্রস-ম্যাচিং পদ্ধতি না থাকায় দ্বৈত ভোটার শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থার জন্য ভোটার তথ্য সংগ্রহকারী, সুপারভাইজার ও কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও গাফিলতি, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও নিয়মিত বিদ্যুত্ না থাকা, তথ্য সংগ্রহে দলীয় ব্যক্তি নিয়োগ এবং নির্বাচন কমিশনের প্রশিক্ষণ মাঠ কর্মকর্তাদের যথাযথ না নেয়াই দায়ী বলে মনে করছেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম নিয়ে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো মাঠ কর্মকর্তাদের রিপোর্টে এসব অসঙ্গতি ফুটে উঠেছে। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার রিপোর্টে সুনিন্দিষ্টভাবে ৯টি বড় সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ অবস্থায় চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম নিন্দিষ্ট সময়ে শেষ হওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছে খোদ নির্বাচন কমিশন। এমনকি আজিজ-জাকারিয়া কমিশনের মতো আরেকবার ভোটার তালিকা নিয়ে যে বির্তক তৈরি হয়েছিল, এক্ষেত্রেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারেএমন আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা। নির্বাচন কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ভোটার তালিকাভুক্তির নিয়ম নেই। আইন লঙ্ঘন করে অপ্রাপ্তবয়স্করা ভোটার হলে বা দ্বৈত ভোটার হলে আইনে সাজার বিধান রয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় ভালোভাবে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম চলছে। কোথাও সমস্যা নেই। এর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, হালানাগাদ কাজে কিছুটা ভুলত্রুটি হচ্ছে। এই ভুল এক পর্যায়ে নয়, বিভিন্ন পর্যায়ে আছে। তারপরও ভুলত্রুটি থাকলে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা করার আগে জনসম্মুখে প্রকাশ করে সংশোধন করা হবে।
কমিশন সূত্র জানায়, গত ১০ মার্চ ইসি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৭০ লাখ ভোটারের টার্গেট নিয়ে ৪ ধাপে দেশব্যাপী ভোটার হালনাগাদ কাজ শুরু করে। হালনাগাদ করতে পুরো কাজের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় ৮০ কোটি টাকা। চারটি ধাপে এই কাজ সম্পাদন হবে। এর প্রথম ধাপে ১৪০ উপজেলায় তথ্যসংগ্রহ ১০ মার্চ শুরু হয়ে চলার কথা ২০ মার্চ পর্যন্ত। ছবি তোলা ও নিবন্ধন ২১ মার্চ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত। দ্বিতীয় ধাপে ১৭ মে থেকে ২৬ মে পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করে ১৪০ উপজেলায় ছবি তোলা ও নিবন্ধন চলবে ২৯ মে থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত। তৃতীয় ধাপে ২১ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই তথ্য সংগ্রহ শেষে ৪ আগস্ট থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ছবি তোলা ও নিবন্ধন চলবে আরও ১৪০ উপজেলায়। শেষ ও চতুর্থ ধাপে ৯২টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ চলবে ৮ অক্টোবর থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত। এখানে ছবি তোলা ও নিবন্ধন চলবে ১৭ অক্টোবর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এখন পর্যন্ত প্রথম ধাপের কাজই শেষ হয়নি। দ্বিতীয় ধাপের কাজ গত ১৭ মে থেকে শুরুর নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগে, অথচ এখনও শুরুর তাগিদ নেই। মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, কাজটি শুরু হতেও সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই মাস। এ সময়ক্ষেপণের কারণে পরে দ্রুতগতিতে কাজটি করতে গিয়ে নানা ভুলভ্রান্তি ও দ্বৈত ভোটারের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। এটিও নির্বাচনের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে বর্তমান কমিশনের। এভাবে হালনাগাদ চললে আগামী জুন-জুলাইয়ের আগে শেষ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ভোটার বৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক : ভোটার তালিকা হালনাগাদের চলমান কার্যক্রমে অস্বাভাবিক হারে ভোটার অন্তর্ভুক্তির কাজ চলছে। কোনো কোনো উপজেলায় নির্বাচন কমিশনের অনুমিত হিসাবের চেয়ে ভোটার বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গেছে। কমিশন কর্মকর্তারা জানান, এবার এলাকাভেদে ৫-৮ ভাগ এবং সব মিলিয়ে ৭০ লাখ ভোটার বাড়বে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত পাওয়া রিপোর্টে দেখা গেছে ভোটার বাড়ার হার ১০ শতাংশেরও বেশি। কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় বেড়েছে প্রায় ১৩ ভাগ। এ উপজেলায় নতুন ভোটার নিবন্ধিত হয়েছে ৮ হাজার ৭২৭ জন। এ উপজেলার বিদ্যমান ভোটার ৬৮ হাজার ১৩১ জন এবং ইসির অনুমিত সম্ভাব্য ভোটার নতুন ৫ হাজার ১১০ জন। এ উপজেলায় মোট ভোটার তথ্য সংগৃহীত হয়েছে ৮ হাজার ৯৩৯ জনের। ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় নতুন ভোটার নিবন্ধিত হয়েছে ১০ দশমিক ৬২ ভাগ হারে মোট ৭ হাজার ৩৭০ জন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮৯৭ পুরুষ এবং ২ হাজর ৪৭৩ জন মহিলা। এ উপজেলায় মোট ভোটার তথ্য সংগৃহীত হয়েছে ৭ হাজার ৭১০ জনের। ইসির সম্ভাব্য ভোটার সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২০৭ জন। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে নতুন ভোটার নিবন্ধিত হয়েছে ১০ দশমিক ৫১ ভাগ হারে ৬ হাজার ১০২ জন। এ উপজেলায় মোট ভোটার তথ্য সংগৃহীত হয় ৬ হাজার ২৫৬ জনের। এখানে বিদ্যমান ভোটারের সংখ্যা ৫৮ হাজার ৬০ জন। ৭ দশমিক ৫ ভাগ হারে অনুমিত ভোটার সংখ্যা ৪ হাজার ৩৫৫ জন। কমিশন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এবার বিপুলসংখ্যক ভোটার অন্তর্ভুক্তি হতে পারে।









