
হিলারি-প্রণব সফর : রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা থেকে : যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরের মাধ্যমে প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এ সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রাপ্তি তেমন নেই বললেই চলে। তবে নিজ স্বার্থরক্ষায় সফলতা নিয়ে ঢাকা ঘুরে গেলেন হিলারি ক্লিনটন। আর প্রণব মুখার্জিও অমীমাংসিত ইস্যুতে ঢাকাকে নতুন কোন বার্তা দিতে পারেননি। অমীমাংসিত ইস্যু অমীমাংসিতই রয়ে গেল।
এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা থাকলেও কূটনীতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রভাবশালী দু’দেশের মন্ত্রীদের সফরের মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চাপ বেড়েছে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সর্বগ্রাহ্য নির্বাচনের দাবিটিও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তবে ব্যবসায়ী মহলে হতাশা, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের বিষয়টি নিয়ে তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। অশুল্ক বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে ভারতের বাজারে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করার কোন অঙ্গীকার আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে ঢাকা। প্রায় দু’বছর আগে করা ঋণ চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়ার শুধু আশ্বাসই মিলেছে। আর তিস্তা চুক্তির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা মেলেনি, কোন অগ্রগতিও হয়নি। শুনতে হল শুধুই আশার বাণী।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তার দেশের স্বার্থেই নিজ উদ্যোগে ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকা সফরকালে তিনি মার্কিন স্বার্থরক্ষা করেই ফিরে গেছেন।
তবে ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির সফরে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বা ব্যবসা-বাণিজ্য ইস্যুতে কোন সুখবর পায়নি বাংলাদেশ। এসব ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান আগের মতো আছে। ফলে ব্যবসায়ীরা হতাশই হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আনু মুহাম্মদ বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশে এসেছিলেন তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য। তাদের এ সফরে বাংলাদেশের কোন উপকার হয়নি। এমনকি বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোন আলোচনাই হয়নি। সীমান্তে প্রতিদিন বিএসএফ কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশীদের পাখির মতো হত্যা করা হচ্ছে। সে ব্যাপারে কোন আলোচনাই হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এম মনিরুজ্জামান মিয়া বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমরা ভারতকে শুধু দিয়েই গেলাম। কিন্তু কিছুই পেলাম না। প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোন কিছুই পায়নি বাংলাদেশ। বিশেষ করে সীমান্তে ভারত বাংলাদেশের নিরীহ মানুষকে প্রতিদিন হত্যা করলেও সরকার সে বিষয়ে কোন কথাই বলল না। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক বিষয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে ভারত। বর্তমান সরকারের সঙ্গে দিল্লীর বন্ধুত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্ধুত্বের খাতিরে বাংলাদেশের পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশে সুযোগ করে দেয়া উচিত। একইভাবে বিএসএফের সীমান্তে নিরীহ মানুষ হত্যা বন্ধ করা উচিত।
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি এফবিসিসিআই সভাপতি একে আজাদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভারতের অর্থমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক যোগসূত্র তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, দু’দেশের ক্ষেত্রেই অশুল্ক বাধা দূর করার বিষয়ে আলোচনা হলে ভালো হতো। তবে তিনি আশা করেন, এ সফরের ফলে ভারতে ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সম্প্রতি ৩টি বড় দেশের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা আমাদের দেশ সফর করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ভারত। তিন দেশের নেতারা মোট ৫টি বার্তা দিয়েছেন। এগুলো হলÑঅবকাঠামো উন্নয়ন না হলে বিনিয়োগ নয়, দুর্নীতি দূর করতে হবে, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, রাজনৈতিক সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ জরুরি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দল নয় রাষ্ট্রের সঙ্গে। আর এগুলো বাস্তবায়ন করলেই অর্থনীতিতে গতি আসবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, হিলারি ক্লিনটন নিজের তাগিদেই ঢাকা সফরে এসেছিলেন। বাংলাদেশের স্বার্থে ঢাকায় এলে তিনি অনেক আগেই সরকারের প্রথমদিকে আসতে পারতেন। কিন্তু সরকারের শেষ দিকে আসার অর্থই হচ্ছে তার দেশের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে আসা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আগামী নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তিনি বলে গেছেন। আবার গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূস বিষয়ে তাদের অবস্থান যে পরিবর্তন হয়নি বা আগের অবস্থানেই রয়েছে সেটাও পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন হিলারি ক্লিনটন।
তিনি জানিয়েছেন, একতরফা নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্র মানবে না। আগামী নির্বাচন অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এ জন্য সংসদের বাইরে বা ভেতরে বসে একটি গ্রহণযোগ্য উপায় খুঁজে বের করতে হবে। যাতে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ থাকতে হবে এবং প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধায়ক বা অন্য যে নামেই হোক তা নিরপেক্ষ হতে হবে। হিলারির ঢাকা সফরে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের ওপর অবশ্যই চাপ সৃষ্টি হল বলে মনে করছেন তিনি। সফরকালে হিলারি ড. ইউনূস ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে কথা বলে সুশীল সমাজের মনোভাব জেনে গেছেন। তারা জানিয়েছেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বিরোধী দল মানবে না। তবে তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তারা মানবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে পার্টনারশিপ ডায়ালগের বিষয়টিও ছিল হিলারির ঢাকা আসার লক্ষ্য। তিনি আরও জানান, সফরকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে প্রণব মুখার্জিও একই সুরে কথা বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর জানান, হিলারি ক্লিনটন ও প্রণব মুখার্জির মতো শীর্ষ নেতাদের সফর আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ। তবে এই সুযোগ যথাযথ কাজে লাগানোর জন্য আমাদের দক্ষতা দেখাতে হবে। সফরকালে হিলারি পরিষ্কার বলে গেছেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সব দলকে আলোচনায় বসতে হবে। গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম যাতে কোন পদক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে ব্যাপারেও তাদের অবস্থান জানিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পার্টনারশিপ ডায়ালগ ঘোষণায় একটি দ্বিপাক্ষিক কাঠামো তৈরি হয়েছে।









