
ঢাকা অফিস: পাঁচ কারণে ‘নিখোঁজ’ হয়ে থাকতে পারেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী। সিলেটের মানুষ অন্তত তাই মনে করেন। দল মত নির্বিশেষে সবাই বলেছেন, ইলিয়াস আলীকে সিলেটের রাজনীতি ও উন্নয়নের জন্য দরকার। যেমনটা বলছিলেন, গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো: গোলাম নবী ভূঁইয়া। তার মতে, সিলেটের আবদুস সামাদ আজাদ ও সাইফুর রহমান মারা যাওয়ার পর বড় কোনো নেতা আর দেখা যাচ্ছিল না। ইলিয়াস আলী সে স্থান পূরণ করতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তার ‘নিখোঁজ’ হওয়া উদ্বেগ ও আতঙ্কের। বিরোধী দলের মতো আমরা সরকারি দলের লোকজনও চাই তিনি উদ্ধার হোন।
ভূঁইয়া তামাবিলের চুনাপাথর, পাথর ও কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতিও। তিনি বলেন, আমরা ব্যবসায় করি, হরতাল করলে ব্যবসায়ের ক্ষতি হয়। তাই আমরা হরতালের বিপ।ে তবে ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারে আমরা সহমত জানাই। একই রকম কথা শোনা গেছে ইলিয়াস আলীর নিজের থানা বিশ্বনাথ ছাড়াও সিলেটের সবখানে।
ইলিয়াস আলী নির্দিষ্ট কয়েকটি কারণে ‘নিখোঁজ’ হয়ে থাকতে পারেনÑ এমন মন্তব্য করে বয়োজ্যেষ্ঠ গোলাপগঞ্জের আবদুল মুহিত চৌধুরী বলেন, ইলিয়াস কয়েকটি ইস্যু নিয়ে বেশ ‘গরম’ আন্দোলন করছিলেন। তাই বিরোধীরা তাকে গুম করে থাকতে পারে। তবে ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও সর্বশেষ বাংলাদেশ আমলে জীবন যাপন করা মুহিত চৌধুরীর মতে, এটা কোনো ভালো কাজ হতে পারে না। তিনি বলেন, এসব অসভ্যতা ছাড়া কিছু নয়। বিরোধী মত দমনের এ রকম উদাহরণ সবার জন্যই খারাপ।
সিলেটের মানুষের সাথে কথা বলে ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পেছনে যেসব কারণের কথা জানা গেছে সেগুলো হচ্ছে :
এক. সিলেটে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। সে জমির জরিপ হয়েছে গত বছর জুনে। ওই সব স্থানে যেসব আন্দোলন হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, তাতে ইলিয়াস আলী সক্রিয় ভূমিকা রাখছিলেন।
দুই. ভারতের পক্ষ থেকে বরাক নদীর উজানে টিপাইমুখ বাঁধ দেয়ার বিপে ইলিয়াস আলী আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তাই দেশে ও বিদেশে তার শত্রু বেড়েছে।
তিন. সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সিলেট সফরের সময় ইলিয়াস আলী বর্তমান সরকারের পাঁচজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন।
চার. সিলেট জেলা ছাত্রদলের ‘নিখোঁজ’ সহসাধারণ সম্পাদক দিনার ও ছাত্রদল কর্মী জুনেদের উদ্ধার বিষয়ে সরকারের বিশেষ একটি বাহিনীর সাথে তার কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এ নিয়ে তিনি বেশ সরব হয়ে ওঠেন এবং যেকোনো মূল্যে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন।
পাঁচ. ইলিয়াস আলীর জনপ্রিয়তা। পুরো সিলেটের মানুষের মধ্যে বেশির ভাগেরই ধারণা ইলিয়াস আলীর অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তাই তার কাল হয়েছে। সে জন্য তাকে গুম করা হয়ে থাকতে পারে। তিনি টিকে থাকলে সামনে সরকারি দলের জন্য সিলেটে রাজনীতি করা মুশকিল হয়ে পড়তে পারে, সে আশঙ্কা থেকেই তাকে গুম করা হয়ে থাকতে পারে।
ইলিয়াস আলীর ভাই আওলাদ হোসেন বলেন, তার ভাইয়ের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চেয়ে তার জনপ্রিয়তা কারো কারো ভালো লাগেনি। তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অনেকে মেনে নিতে পারেনি। সে জন্য তাকে সরিয়ে দেয়ার একটা পরিকল্পনা হয়ে থাকতে পারে। তবে আন্দাজে তিনি কাউকে সন্দেহ করতে রাজি নন।
মুহিত চৌধুরী বলেন, টিপাইমুখ বাঁধ ও সীমান্তের ভূমি বিরোধই ইলিয়াসের জন্য কাল হয়েছে। এতে সরকার যে রকম তার বিরুদ্ধে গেছে তেমনি ভারতও। তার মতে, আমরা তো ভারতনির্ভর দেশ, ভারত পেলে কারো রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই।
বিশ্বনাথের আবদুল গফুর বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কথা বলা তার জন্য কাল হয়ে থাকতে পারে। তা ছাড়া ইলিয়াস আলীর কারণে স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান এলাকায় খুব একটা পাত্তা পান না। ‘তাইনে নিজের অবস্থা’ ভালো করার সুযোগ পাইছেন এখন। সিলেট উপশহরের হাসান বলেন, দিনার ও জুনেদের উদ্ধারের ব্যাপারে ইলিয়াস আলীর উদ্যোগ নেয়াটাও এর একটা কারণ হতে পারে। তবে যে কারণেই তিনি নিখোঁজ হন না কেন তাকে উদ্ধার করতে হবেÑএ কথা সিলেটের সবারই।
বিশ্বনাথ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজাম্মিল আলী বলেন, আমরা ইলিয়াস আলীর উদ্ধার চাই। কিন্তু তাকে উদ্ধারের নামে হরতালের পক্ষে আমরা নই। গত সপ্তাহের সোমবার বিশ্বনাথে পুলিশ ও সরকারদলীয় ক্যাডারেরা মিলে তিন বিএনপি কর্মীকে হত্যা করেছিল। অভিযোগ রয়েছে, মুজাম্মিল আলীর ছেলে পিস্তল নিয়ে ওই সময় বিএনপির মিছিলে গুলি চালিয়েছেন। যদিও মুজাম্মিল সেটি স্বীকার করতে চাননি।
বিশ্বনাথের আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন কর্মী বলেছেন, তারা ইলিয়াস আলীকে পছন্দ করেন। স্থানীয় সাংবাদিকেরা জানান, গত সপ্তাহের রোববার হরতালের দিন রশিদপুরে রাস্তা অবরোধে ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক আওয়ামী লীগ কর্মীও অংশ নিয়েছেন। এটি তারা কেবল ইলিয়াস আলীর কারণেই করেছেন। পরে অবশ্য দলীয় সিদ্ধান্ত আসার পর তারা সরে যান। পরদিন সোমবার আওয়ামী লীগের ক্যাডারেরা বিএনপির মিছিলে হামলা করে। গুলিবিদ্ধ কর্মীদের শরীরের ওপর পৈশাচিক হামলা চালিয়েছিল তারা।







