Tuesday,
December 18 - December 24 , 2012 > Volume 13 > Issue 04



সময়ের দর্পন

  • PDF

একজন কিংবদন্তি অভিনেতার অন্তর্ধান

জাহাঙ্গীর আলম সরকার

প্রতিভাবান কিংবদন্তী অভিনেতা হুমায়ন ফরিদির জীবন অন্য দশজন মানুষের থেকে ভিন্নতর। গভীর ব্যাক্তিত্য স¤পূর্ণ এ মানুষটি ছিলো অসামান্য প্রতিভার অধিকারী। এ কথা সত্য যে বিশ্বের বেশীর ভাগ প্রতিভাবান মানুষেরা ব্যাক্তি জীবনে সুখি হতে পারেনি। জীবন সম্পর্কে তাদের ভাবনার সাথে অন্যদের ভাবনার এখানেই বিস্তর তফাৎ। ফলে ট্রাজেডি অনিবার্য হয়ে দেখা দেয় জীবনে। বেচে থাকার জন্য সকল বিষয়ের সাথে নিজেকে জরিয়ে ফেলতে হবে এমনটা বোধ করি এ সকল মানুষের জন্য খানিকটা অস্বস্তিকর।

হুমায়ুন ফরিদী ১৯৫২ সালের ২৯শে মে ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করেন। চাঁদপুর সরকারি কলেজ হতে উচ্চ মাধ্যমিক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে অনার্স ও এমএ পাস করেন। তার নাট্যচর্চার শুরু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালে তিনি বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব সেলিম আল-দীনের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করেন। মূল সংগঠক হিসাবে বিশেষ ভূমিকা রাখেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নাট্য উৎসব আয়োজনে। এ সময়েই তিনি ঢাকা থিয়েটারের সাথে সম্পৃক্ত হন। এর পর তাকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। একের পর এক মঞ্চ ও টিভি নাটকে অভিনয় করে অভিভূত করে রেখেছিলেন কোটি দর্শকের মন।

বাংলা চল”িত্রের বড়ো পর্দায়ও তিনি তার এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়াও পেয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সম্মাননাও। তবে হুমায়ুন ফরিদীর মতো গুণী শিল্পীদের জন্য যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির চাইতে বড়ো স্বীকৃতি হল মানুষের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় তিনি আমৃত্যু সিক্ত।

আমরা বাংলা সংস্কৃতির একটি উজ্জল নক্ষত্রকে হাড়ালাম। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির আকাশ থেকে একটি নক্ষত্রের পতন হল। উত্থান-পতনে ভরা হুমায়ন ফরিদির জীবন। অনেকটা নিভৃতে-নিরবে অকালেই চলে গেলেন শক্তিশালী অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী। অসাধারন অভিনয় গুণে দশকের পর দশক ধরে হুমায়ন ফরিদি বিশ্বের অগণিত ভক্ত-অনুরাগীর হৃদয়কে আনন্দে উদ্ভাসিত করেছেন। বাংলাদেশের নাটক ও চলচ্চিত্রে যুক্ত করেছিলেন ভিন্ন মাত্রা। সংস্কৃতি অঙ্গনের এই গুনি মানুষটিকেও এভাবে চলে যেতে হবে তা বোধ করি কেউ অনুমানও করতে পারেননি।

হুমায়ন ফরিদির মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বাংলা সংস্কৃতি অঙ্গনে। তবে শোকের অভিঘাত যে শুধু শিল্প-সংস্কৃতির চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ তা নয়। গত তিন দশকের অভিনয় জীবনে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চল”িত্র সহ যেখানেই তিনি অভিনয়  করেছেন, তার প্রতিভার ছোঁয়ায় সেখানেই সোনা ফলেছে। শিল্প-সংস্কৃতির উঁচু স্তরের বোদ্ধা দর্শক-সমালোচক হতে শুরু করে আম-জনতার মনও জয় করে নিয়েছিলেন তিনি। একজন কিংবদন্তি শিল্পীর পক্ষেই কেবল এটা সম্ভব। হুমায়ুন ফরিদীর মৃত্যুতে যে বাংলা সংস্কৃতির যে অপূরনিয় ক্ষতি হয়েছে তা কোন দিনই পূরণ হইবার নয়।

অভিনয় তো অনেকেই করে থাকেন তবে হুমায়ন ফরিদির অভিনয় ভঙ্গি মানেই ভিন্নতর কিছু। প্রতিভাবান শিল্পী হুমায়ুন ফরিদী নিজ বৈশিষ্টে অনন্য। যারা তার অভিনয় দেখেছেন সকলেই এক বাক্যে এ বিষয়টি অন্তত: স্বীকার করিবেন বলে আমার বিশ্বাস। ভবিষ্যতে আমরা অনেক অভিনেতাই হয়তো পাবো তবে, আমাদের এই প্রিয় হুমায়ন ফরিদিকে আর পাবোনা। কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে হুমায়ন ফরিদি বেচে থাকবে মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায়।

লেখক: আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

ধফাংধমধৎ২৯@মসধরষ.পড়স

Share this post

Add comment




You are here: ফিচার লেখক মঞ্চ সময়ের দর্পন