শান্তা মারিয়া
আমরা যে বিশ্ব সংস্কৃতির যুগে বাস করছি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বোধহয় বিশ্বব্যাপী ভ্যালেনটাইনস ডে বা ভালবাসা দিবসের উদযাপন। দু’তিন দশক আগেও হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া ভ্যালেনটাইনস্ ডে কেউ পালন করতেন না। পালন দূরে থাকুক আমজনতা এর নামই শোনেনি। কিন্তু এখন দেশী-বিদেশী টিভি চ্যানেলগুলোর কল্যাণে ভ্যালেনটাইনস ডে সম্পর্কে না জেনে উপায় নেই। এই উপলক্ষে রমরমা ব্যবসা করছে কার্ডশপ, গিফট শপ, বুটিক হাউস আর ফুলের দোকানগুলো। ভালবাসা দিবস উদ্যাপনের রীতিটা যদিও পাশ্চাত্য থেকে আসা তবে ভারতীয় উপমহাদেশে কিছুটা ভিন্ন রূপে বা ভিন্ন আঙ্গিকে এই ধরনের উৎসব ছিল।
প্রাচীন রোমে ১৪ ফেব্রুয়ারীতে দেবরানী জুনোর সম্মানে ছুটি এবং উৎসব পালন করা হতো। প্রাচীন গ্রীসে বসন্ত উৎসব ও তরুণ-তরুণীদের উৎসব পালনের রীতি ছিল। প্রাচীন রোমে ১৫ ফেব্রুয়ারী ছিল লুপারকালিয়া উৎসব। এই উৎসবগুলো ছিল তরুণ-তরুণীদের উৎসব এবং বাধাহীনভাবে মেলামেশার দিন। অনেকেরই প্রেমের সম্পর্কেও সূত্রপাত ঘটত এদিনে। বলা হতো, এ দিন নাকি পাখিরা জোড়া বাঁধে। তবে ভ্যালেনটাইন দিবসের নামকরণটি হয় সেন্ট ভ্যালেনটাইনের নামে।
২৬৯ খৃষ্টাব্দে রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের সময় এক তরুণ দয়াপ্রাণ যাজক ছিলেন সেন্ট ভ্যালেনটাইন। সম্রাট ক্লডিয়াস সৈন্যদের বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেন। তরুণদের বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে পাঠানো হতো এবং তাদের প্রেম ও বিয়ে নিষিদ্ধ ছিল। সেন্ট ভ্যালেনটাইন এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন। তিনি গোপনে তরুণ-তরুণীদের বিয়েতে পৌরহিত্য করতেন। এই অপরাধে সেন্ট ভ্যালেনটাইনকে কারাবন্দী করা হয়। কিন্তু ভালবাসা সেখানেও পথ করে নেয়। কারা প্রধানের অন্ধ মেয়ে প্রেমে পড়ে সেন্ট ভ্যালেনটাইনের। তিনি মেয়েটির অন্ধত্ব দূর করেন এবং তার সঙ্গে গভীর ভালবাসায় জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু বিধি বাম। নিষ্ঠুর সম্রাটের আদেশে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় তার। মৃত্যুর আগে প্রেমিকার উদ্দেশ্যে আবেগপূর্ণ একটি চিঠি লেখেন তিনি। চিঠির নিচে নাম সই করেন ফ্রম ইয়োর ভ্যালেন্টাইন। তাঁর মৃত্যুদন্ডের দিনটি ছিল ১৪ ফ্রেব্রুয়ারি। সাধু ভ্যালেন্টাইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ৪৯৬ খৃষ্টাব্দে রোম সম্রাট জেলাসিয়াস ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেনটাইন ডে হিসাবে ঘোষণা করেন। প্রাচীন গ্রীস ও রোমে যে উৎসব ছিল তাতে অবাধ শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি প্রাধান্য পেত। মধ্যযুগে সমাজের নৈতিকতা রক্ষার স্বার্থে শারীরিক মেলামেশাকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং ভালবাসা দিবসে উপহার আদান-প্রদানের রীতি প্রচলিত হয়।
রাশ উৎসব, ভারতীয় উপমহাদেশে বসন্ত উৎসব, দোলপূর্ণিমা, হোলি ইত্যাদি উৎসবে আবির ছড়ানো, রঙ খেলাম মিষ্টি খাওয়াসহ বিভিন্ন রকম আচার অনুষ্ঠান পালন করা হতো।
পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত বরণের রেওয়াজ বাংলা ভূ-খন্ডে আবহমানকাল থেকেই ছিল। লালপাড় বাসন্তী রঙের শাড়ি পওে নারীরা বসন্তকে বরণ করেছেন সাদরে। এখনও পহেলা ফাল্গুনে অসংখ্য বাঙালী নারী বসন্তকে বরণ করার উদ্দেশ্যে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরেন সযতেœ। এ যুগ বিশ্বায়নের বিশ্ব সংস্কৃতির। ভ্যালেন্টাইনস ডে, বা ভালবাসা দিবস আর পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি বলে দূরে ঠেলে রাখার উপায় নেই। এখন বরং প্রয়োজন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেল বন্ধনের। বসন্ত বরণের রীতিতে বা বাঙালীর নিজস্ব রীতিতে যদি ভালবাসা দিবসকে বরণ করা যায় তা হবে আমাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
ভালবাসার অনুভূতি মানবসমাজের সর্বজনীন। প্রতিটি সমাজ জাতি গোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব প্রেমকাহিনী। সাহিত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছে মানুষের ভালবাসার গল্প। শিরি-ফরহাদ, হিররঞ্জা, লাইলী-মজনু, ত্রিস্তান-আইসোল্ডে, সাইকী-কিউপিড, রোমিও-জুলিয়েট, দান্তে-বিয়েত্রিচের প্রেম কাহিনী যুগ যুগ ধরে বিশ্বের অগণিত নর-নারীকে ভালবাসতে প্রেরণা যুগিয়েছে। বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ মংমনসিংহ গীতিকায় মহুয়া-নদের চাঁদের প্রেম কাহিনী, ভেলুয়া, মলুয়ার গীত জয়চন্দ্র-চন্দ্রাবতীর কাব্য কত পালাগান, কবিগানের আসরে শ্রোতা দর্শককে চোখের জলে ভাসিয়েছে।
বৈষ্ণব পদাবলীর ছত্রে ছত্রে রয়েছে রাধা-কৃষ্ণের ভালবাসার অমর কাহিনী। ইউসুফ-জুলেখা, চন্ডীদাস-রজকিনী, গুনাই বিবির গাঁথা, সোনাই-মাধবের পালাগান ও পুঁথি বাংলা সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ।
পুরনো কিংবদন্তির গন্ডি ছড়িয়ে ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যাবে নর-নারীর প্রেম বহু দেশের ইতিহাসে ওলটপালট ঘটিয়েছে। বিংশ শতকেও প্রেমিকার জন্য সিংহাসন ত্যাগ করে পৃথিবীকে বিস্মিত করেছেন অষ্টম এডোয়ার্ড।
সেলুলয়েডের ফিতায় সৃষ্টি হয়েছে বহু অমর প্রেমের গল্প। রোমান হলিডে, সানফ্লাওয়ার, গান উইথ দ্য উইন্ড, কাম সেপ্টেম্বর, ক্লিওপেট্রা-এ্যান্টনিও, লাভ স্টোরি, নটিং হিল, টাইটানিকের মতো অসংখ্য চলচ্চিত্রে ভালবাসার চিত্রায়ন ঘটেছে।
যুদ্ধবিগ্রহ, দাঙ্গা, হানাহানি, অশান্তির পৃথিবীতে ভালবাসাই এনে দিতে পারে শান্তির স্পর্শ। ভালবাসার শক্তিতেই পৃথিবীর যাবতীয় ঘৃণাকে অতিক্রম করে যাওয়া সম্ভব। সে হিসাবে ভালবাসা দিবস পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিবস। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ও ভালবাসা জয় হোক। স্বার্থক হোক প্রেম। অমর হোক সাধু ভ্যালেনটাইনের আত্মত্যাগ। পাঠকদের ভ্যালেনটাইনস ডে’র শুভেচ্ছা।









