১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সেই ঝোড়ো ভোরে যার কণ্ঠ প্রথম ধ্বনিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় বেতারে, সেই বিতর্কিত ও আলোচিত সামরিক কর্মকর্তা লেফটেনেন্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) শরিফুল হক ডালিম বর্তমানে প্রবাসে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকের সাথে এক দীর্ঘ ও বিশেষ সাক্ষাৎকারে মিলিত হয়েছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক পতন নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।
হাসিনাই ১৫ই আগস্টের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছেন
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই মেজর ডালিম বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, “শেখ হাসিনা গত ১৫ বছরে যে ধরনের শাসন চালিয়েছেন, তা মূলত ১৯৭৫-এর বাকশালেরই একটি বর্ধিত ও ভয়ংকর রূপ। আজ বর্তমান প্রজন্ম যে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে, তা প্রমাণ করে যে ৭-ই নভেম্বরের সিপাহী জনতার বিপ্লব এবং ১৫ই আগস্টের পরিবর্তন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কতটুকু জরুরি ছিল। দৈব কারণে শেখ হাসিনা বেঁচে না থাকলে এই প্রজন্ম জানতেই পারতো না কেন ১৫ই আগস্টের অভ্যুত্থান অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।”
ভারতীয় আধিপত্যবাদের নীল নকশা ও মুক্তিযুদ্ধ
সাক্ষাৎকারে ডালিম ভারতের আধিপত্যবাদ নিয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ভারত বাংলাদেশকে একটি ‘করদ রাজ্যে’ পরিণত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। ডালিমের মতে:
মুজিব বাহিনী গঠন: ভারত মূল মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি প্যারালালভাবে ‘মুজিব বাহিনী’ (BLF) গঠন করেছিল যাতে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকে।
সাত দফা দাসত্বমূলক চুক্তি: প্রবাসী সরকারের সাথে করা চুক্তির মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তাকে খর্ব করতে চেয়েছিল।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW): যুদ্ধ চলাকালীন থেকেই ‘র’-এর কার্যক্রম বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে সক্রিয় ছিল যা দেশ স্বাধীনের পর বাকশাল গঠনে সহায়তা করে।
ডালিম স্পষ্টভাবে বলেন, “আমরা পাকিস্তানিদের থেকে মুক্ত হয়ে ভারতের অধীনে থাকতে চাইনি। এক সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি পেয়ে অন্য সাম্রাজ্যবাদের কবলে পড়া কোনো সত্যিকারের স্বাধীনতা নয়।”
গোপন সংগঠন ‘সেনা পরিষদ’ ও সার্বভৌমত্বের লড়াই
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ডালিম ও তার সমমনা কর্মকর্তারা ‘সেনা পরিষদ’ নামে একটি গোপন সংগঠন গড়ে তোলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হওয়ার পর যদি ভারত বাংলাদেশকে গ্রাস করার চেষ্টা করে, তবে পুনরায় লড়াই করা। ডালিম জানান, ১৫ই আগস্টের অভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল এই সেনা পরিষদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল যা দেশকে ভারতের বলয় থেকে বের করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম সত্তা দিতে চেয়েছিল।
স্ত্রীকে অপহরণ ও শেখ মুজিবের বিতর্কিত ভূমিকা
ডালিম তার ব্যক্তিগত জীবনের একটি মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন যা তাকে সরাসরি সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। ঢাকার লেডিস ক্লাবে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে তৎকালীন রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান ও শেখ মুজিবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ গাজী গোলাম মোস্তফার সশস্ত্র মাস্তানরা ডালিম ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করে ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে নিয়ে যায়। ডালিম অভিযোগ করেন, সেখানে শেখ মুজিব উপস্থিত থাকলেও তিনি অপরাধীদের কোনো বিচার করেননি, বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। এর কিছুকাল পরেই ডালিমসহ বেশ কয়েকজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধাকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়, যা সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
জিয়াউর রহমানকে অপসারণের চেষ্টা ও ডালিমদের প্রতিরোধ
সাক্ষাৎকারে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে ডালিম বলেন, শেখ মুজিব চেয়েছিলেন জিয়াউর রহমানকে মায়ানমারের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠিয়ে সেনাবাহিনী থেকে চিরতরে বিদায় দিতে। কিন্তু সেনা পরিষদের তীব্র প্রতিবাদ ও চাপের মুখে মুজিব পিছু হটতে বাধ্য হন এবং পরবর্তীতে জিয়ার জন্য ‘উপ-প্রধান’ পদটি তৈরি করতে বাধ্য হন।
৩রা নভেম্বর ও কেন তারা দেশ ত্যাগ করেছিলেন?
১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থান সম্পর্কে ডালিম বলেন, খালেদ মোশাররফ ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং ভারতের প্ররোচনায় তিনি অস্থিরতা তৈরি করেছিলেন। ডালিম ও তার সাথীরা সেদিন রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ এড়াতে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সমঝোতার মাধ্যমে দেশ ত্যাগ করেন। তবে তিনি দাবি করেন, যাওয়ার আগেই তারা সৈনিকদের মাঝে এমন বীজ বপন করে গিয়েছিলেন যার ফলে ৭ই নভেম্বর সিপাহী জনতা রাজপথে নেমে আসে এবং ভারতীয় দালালি নস্যাৎ করে দেয়।
মুক্তির পথ: একটি চতুর্থ রিপাবলিক
ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়ার উপায় হিসেবে ডালিম একটি ‘চতুর্থ রিপাবলিক’ গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা এবং দেশপ্রেমিক সৈনিকদের সম্মিলিত শক্তিতে এমন একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে যা আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। জনগণকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে যাতে বিদেশি কোনো শক্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।