এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০৯ নভেম্বার ২০২৫, ১২:৫৯ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

১৯৪৭ সালে জম্মুতে লুকানো হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস

১৯৪৭ সালে জম্মুতে লুকানো হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস

এখন সময় ডেস্ক

ভারত বিভাজনের বছর ১৯৪৭—যখন পাঞ্জাব ও বাংলায় রক্তপাত ও গণহত্যা ছড়িয়ে পড়ে, তখন কাশ্মীর উপত্যকায় তুলনামূলক শান্তি বিরাজ করেছিল। কিন্তু জম্মু প্রদেশে ঘটেছিল এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, যা বহু বছর ইতিহাসের আড়ালে চাপা ছিল।

সেই সময় জম্মু ছিল জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ, যেখানে উপত্যকার মতো মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না। রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিক বেদ ভাসিন, যিনি পরবর্তীতে দৈনিক *কাশ্মীর টাইমস*-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক হন, তাঁর রচনাগুলোয় সেই সময়কার ঘটনাবলির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি ২০০৩ সালে জম্মু বিশ্ববিদ্যালয়ে “বিভাজনের অভিজ্ঞতা: জম্মু ১৯৪৭” শিরোনামের গবেষণাপত্রে লেখেন, মাউন্টব্যাটেনের বিভাজন পরিকল্পনা ঘোষণার পর জম্মুতে দ্রুত সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

ভাসিনের বর্ণনায়, পুঞ্চ অঞ্চলে মহারাজা হরি সিংয়ের কর আরোপের বিরুদ্ধে প্রথমে অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন শুরু হলেও, প্রশাসনের দমননীতি সেটিকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে পরিণত করে। মহারাজার প্রশাসন মুসলিম সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর অবিশ্বাস প্রকাশ করে তাদের ক্ষমতা কেড়ে নেয়। শহরে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে মুসলমানরা অস্ত্র তুলে নিতে চলেছে, এবং এই গুজবই পরবর্তী হত্যাযজ্ঞের অজুহাত তৈরি করে।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বিসনা, আরএসপুরা ও আখনুরের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে বহু মুসলিম পাকিস্তানের শিয়ালকোটে পালিয়ে যান। অন্যদিকে উধমপুর, চেনানি, রামনগর, রিয়াসি ও ভাদেরওয়াহ অঞ্চলে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটে। বেদ ভাসিনের মতে, এসব হামলায় আরএসএস কর্মীরা ও সশস্ত্র শিখ উদ্বাস্তুরা অংশ নেয়, যারা হাতে তলোয়ার নিয়ে শহরে ঘুরে বেড়াত।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রশাসন হত্যাযজ্ঞ থামানোর পরিবর্তে উল্টো সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করে ও অস্ত্র সরবরাহ করে। শহরে কারফিউ জারি করা হলেও, দাঙ্গায় জড়িত লোকজন অবাধে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন করত। ভাসিন বলেন, “এই কারফিউ জারি করা হয়েছিল মুসলিমদের চলাচল বন্ধের জন্য।”

সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটে জম্মু শহরের তালাব খাতিকান এলাকায়। প্রশাসন স্থানীয় মুসলিমদের আত্মসমর্পণ করতে বলে, পরে তাদের লরিতে বোঝাই করে “নিরাপত্তার জন্য” পাকিস্তানের পথে পাঠানোর কথা জানায়। প্রথম দফায় প্রায় ৬০টি লরিতে হাজারো মানুষ তোলা হয়। কিন্তু শহরের উপকণ্ঠে চাট্টা এলাকায় পৌঁছানোর পর আরএসএস সদস্য ও শিখ উদ্বাস্তুরা গাড়িগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়, সবাইকে নামিয়ে নির্বিচারে হত্যা করে। সৈন্যরা তখন হয় অংশ নেয়, নয়তো নীরব দর্শক হয়ে থাকে।

এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক সংখ্যা অজানা, তবে ধারণা করা হয় নিহতের সংখ্যা ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৩৭ হাজারের মধ্যে। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বাধ্য হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। ফলে জম্মুতে মুসলিম জনসংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। ১৯৪১ সালে জম্মুর জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ ছিল মুসলিম, যা ১৯৬১ সালে নেমে আসে মাত্র ১০ শতাংশে।

ব্রিটিশ কূটনীতিক সিবি ডিউক এবং সাংবাদিক ইয়ান স্টিফেন্স তাঁদের লেখায় এই হত্যাযজ্ঞের সাক্ষ্য দিয়েছেন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নথিতেও উল্লেখ আছে যে মহারাজার নেতৃত্বে ডোগরা বাহিনী ও হিন্দু-শিখ গোষ্ঠীগুলোর সহায়তায় ২ লাখ ৩৭ হাজার মুসলিম হয় নিহত হয় বা সীমান্ত পেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

বেদ ভাসিনের বক্তব্য অনুযায়ী, মহারাজার প্রশাসন শুধু এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল না, বরং শহরের হিন্দু বাড়িগুলোকে সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করে সেখান থেকে মুসলিম পাড়ায় গুলি চালায়। তিনি জানান, নারী ও শিশুদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি—নারীদের ধর্ষণ ও পুরুষদের হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে রাজৌরি ও মিরপুর অঞ্চলে হিন্দু ও শিখদের ওপরও আক্রমণ হয়। তবুও জম্মু অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞের ব্যাপকতা ও প্রশাসনিক সমর্থন একে ইতিহাসের অন্যতম পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে।

মহাত্মা গান্ধী ১৯৪৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর বলেন, “জম্মুর হিন্দু, শিখ এবং বাইরে থেকে আসা লোকেরা মুসলমানদের হত্যা করেছে। এর জন্য দায়ী কাশ্মীরের মহারাজা।”

ইতিহাসবিদ ও গবেষক ইদ্রিস কান্ট জানান, ডোগরা সরকার পরবর্তীতে এই ঘটনার অনেক নথি নষ্ট করে গণহত্যা আড়াল করার চেষ্টা চালায়। গবেষক পি.জি. রসুলের মতে, নেহরু ও শেখ আবদুল্লাহ জম্মু হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন, কিন্তু নীরব ছিলেন—কারণ জম্মু হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাখা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে উপকারী ছিল।

জম্মুর এই হত্যাযজ্ঞের পরই পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী উপজাতি মিলিশিয়া কাশ্মীর আক্রমণ করে এবং মহারাজা হরি সিং দিল্লির সঙ্গে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’-এ স্বাক্ষর করেন। এর ফলেই শুরু হয় প্রথম ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ।

আজও প্রতি বছর ৬ নভেম্বর জম্মু ও কাশ্মীরের দুই প্রান্তের মানুষ এই গণহত্যাকে স্মরণ করে—যে দিন ইতিহাসের পৃষ্ঠায় গভীরভাবে খোদাই হয়ে আছে রক্ত, নীরবতা এবং হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্প।

সূত্র: বিবিসি