ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:৩০ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

হাসিনা ইস্যুতে আটকে থাকবে না আগামীর সম্পর্ক—ভারত নিয়ে মির্জা ফখরুলের বার্তা

হাসিনা ইস্যুতে আটকে থাকবে না আগামীর সম্পর্ক—ভারত নিয়ে মির্জা ফখরুলের বার্তা

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কোনো একক ব্যক্তি বা বিশেষ ইস্যুতে ‘বন্দী’ হয়ে থাকা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে দলের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও তা দুই দেশের মধ্যকার বিস্তৃত ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ার পথে কোনো অন্তরায় হবে না। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে ভারতের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারত্ব ও ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও তিনি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন।

সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গত আগস্টের গণ-আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে আহ্বান জানানো হয়েছে এবং এটি একটি চলমান আইনি প্রক্রিয়া। তবে তিনি যুক্ত করেন, “ভারত যদি শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর নাও করে, তবুও বাণিজ্য, ব্যবসা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বৃহত্তর ক্ষেত্রগুলোতে আমরা স্থবিরতা চাই না। আমরা ভারতের সঙ্গে আরও গভীর ও কার্যকর সম্পর্ক গড়তে চাই।” উদাহরণ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৈরী সম্পর্কের মধ্যেও চলমান অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ভারত-বাংলাদেশকেও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বিএনপি মহাসচিব স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে যখন শেখ হাসিনা দিল্লিতে আশ্রিত ছিলেন, তখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ও ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে রাষ্ট্রনায়কসুলভ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। আগামীর চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন, ফারাক্কা বাঁধ এবং সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে আলোচনার টেবিলে সমাধানের ওপর জোর দেন। তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, “যারা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের কথা বলে, তারা পাগলের মতো কথা বলে। আমাদের পথ হবে আলোচনার, সংঘাতের নয়।”

বিশ্লেষণমূলক পর্যবেক্ষণ:

মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন ও পরিণত সমীকরণ ফুটে উঠেছে। দীর্ঘকাল ধরে আওয়ামী লীগ নিজেকে ভারতের একমাত্র ‘অকৃত্রিম বন্ধু’ হিসেবে তুলে ধরলেও, বিএনপি এখন প্রমাণ করতে চাইছে যে তারা ভারতের জন্য আরও বেশি নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল অংশীদার হতে পারে। বিশেষ করে ‘৩১ দফা’ কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং কারিগরি শিক্ষায় ভারতের সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আদর্শিক সংঘাতের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে আওয়ামী আমলের মেগা প্রকল্পগুলোর পুনর্মূল্যায়ন এবং ভারতের কারিগরি সম্পদের ব্যবহারের প্রস্তাবটি একাধারে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং কৌশলগত মিত্রতা বাড়ানোর একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রয়াস। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রতিহিংসার রাজনীতি এড়িয়ে সমঝোতার পথে হাঁটার এই আহ্বান ভারতের নীতি-নির্ধারকদের কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার আইনি লড়াই জারি রেখেও বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আলাদা রাখা মির্জা ফখরুলের এক দূরদর্শী রাজনৈতিক কূটকৌশলেরই বহিঃপ্রকাশ।