এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২১ নভেম্বার ২০২৫, ১১:৪৫ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

হাসিনাকে ঘিরে দিল্লির কূটনৈতিক সংকট

হাসিনাকে ঘিরে দিল্লির কূটনৈতিক সংকট

১৫ বছরের ক্ষমতায় থাকার সময় ভারত তার প্রতিবেশে যেসব বিষয় সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়—স্থিতিশীলতা, যোগাযোগ অবকাঠামো ও ভারতের সঙ্গে স্বার্থের সামঞ্জস্য—সেগুলোই দিলেন শেখ হাসিনা।

 কিন্তু আজ তিনি ভারতের আশ্রয়ে, আর বাংলাদেশের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে শিক্ষার্থী–নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। ওই দমন-পীড়নই শেষ পর্যন্ত তাঁর পতন ডেকে আনে।

২০২৪ সালের আন্দোলনে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার; আগামী বছর অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন।

 এ ঘটনায় সৃষ্টি হয়েছে জটিল কূটনৈতিক সমস্যার। ঢাকা শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ চায়, কিন্তু দিল্লি সে পথে হাঁটতে অনিচ্ছুক—ফলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যত অকার্যকর।

যা মানবিক আশ্রয় হিসেবে ভেবেছিল দিল্লি, তা এখন হয়ে উঠছে দীর্ঘ ও বিব্রতকর পরীক্ষা—ভারত তার পুরোনো মিত্রের জন্য কতদূর যেতে প্রস্তুত, আর কতটা কূটনৈতিক মূল্য দিতে রাজি।

দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগলম্যানের মতে, ভারতের সামনে চারটি অপছন্দনীয় পথ।

 প্রথমত, তাকে হস্তান্তর করা—যা দিল্লি মোটেও চায় না।

 দ্বিতীয়ত, বর্তমান অবস্থাই বজায় রাখা—নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে এতে ঝুঁকি বাড়বে।

 তৃতীয়ত, হাসিনাকে নীরব থাকতে চাপ দেওয়া—যা তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন এবং দিল্লির পক্ষেও প্রয়োগ করা কঠিন।

 শেষ বিকল্প, তাঁকে তৃতীয় দেশে পাঠানো—কিন্তু খুব কম দেশই ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তা চাহিদা ও আইনি জটিলতা নিয়ে এমন ‘হাই-মেইনটেন্যান্স’ অতিথি নিতে রাজি হবে।

হাসিনাকে প্রত্যার্পণ ভারতের কাছে ‘অকল্পনীয়’। সরকার ও বিরোধী শিবির উভয়েই তাঁকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনে করে; ভারত ‘বন্ধুকে বিপদে ফেলে না’—মত কুগলম্যানের।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে দুই দেশের গভীর ও অসম সম্পর্ক, যার শেকড় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার মধ্যে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশ, আর এশিয়ায় বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ভারত। বছরে দুই দেশের বাণিজ্য ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে; বাংলাদেশ এখানে বড় ঘাটতি বহন করে ও ভারতীয় কাঁচামাল, জ্বালানি ও ট্রানজিট রুটের ওপর নির্ভরশীল।

গত এক দশকে ভারত দিয়েছে ৮-১০ বিলিয়ন ডলার কম সুদে ঋণ, শুল্কমুক্ত সুবিধা, রেল–সংযোগ, বিদ্যুৎ ও এলএনজি। এই সম্পর্ক ছিন্ন করা—কোনো পক্ষের পক্ষেই সহজ নয়।

 জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঞ্জয় ভারতোয়াজ বলেন, পানি, বিদ্যুৎসহ নানা ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এতই গভীর যে ভারতের সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।

কিন্তু ইউনুসের নেতৃত্বে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত পররাষ্ট্রনীতি ‘ডি-ইন্ডিয়ানাইজ’ করতে চাইছে বলেই মনে করেন গবেষকরা। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিয়ান সাইয়ের মতে, ঢাকা এখন বিচারিক বিনিময় স্থগিত করছে, জ্বালানিচুক্তি পুনর্বিবেচনা করছে, ভারত–নেতৃত্বাধীন যোগাযোগ প্রকল্পকে ধীর করছে এবং প্রকাশ্যে বেইজিং, ইসলামাবাদ ও আংকারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে—বার্তাটি স্পষ্ট: বাংলাদেশ এখন নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছে।

জনমতেও পরিবর্তন এসেছে। ঢাকাভিত্তিক ‘সেন্টার ফর অলটারনেটিভস’-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশের বেশি বাংলাদেশি এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে ইতিবাচক ভাবছেন—দিল্লির ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ১১ শতাংশ। অনেকেই মনে করেন, শেষ বছরগুলোতে ভারতের সমর্থনেই শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বেড়ে যায়।

তবে অধ্যাপক ভারতোয়াজ মনে করিয়ে দেন, অতীত অভিজ্ঞতা বলে রাজনৈতিক সম্পর্ক শীতল হলেও অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক টিকে থাকে। ২০০১–২০০৬ সালে বিএনপি–জামায়াত সরকারের সময়ও দুই দেশের বাণিজ্য বেড়েছিল।

ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু নির্বাসিত এক মিত্রকে সামলানো নয়, বরং তার নিরাপত্তায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা। ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ অরক্ষিত সীমান্তের ওপারে রাজনৈতিক অস্থিরতা হলে উগ্রপন্থা বা বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

লন্ডনের SOAS-এর অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল মনে করেন, ভারতের উচিত তাড়াহুড়ো না করে ঢাকার মূল রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে নীরব ও সাবধানী কূটনীতি চালিয়ে যাওয়া। আগামী ১২–১৮ মাস সম্পর্ক অস্থির থাকতে পারে; নির্বাচনের পর বিশ্বাসযোগ্য সরকার ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি পুনর্বিন্যাসের সুযোগ তৈরি হবে।

বড় প্রশ্ন হলো—ভারত কীভাবে ‘বন্ধুর পাশে থাকার’ নীতি বজায় রাখবে, আবার একই সঙ্গে মানবাধিকার প্রশ্নে সমালোচনার মুখে পড়বে না? দিল্লির এই সংকট কি অতিরিক্তভাবে হাসিনার ওপর নির্ভর করার ফল?

প্রাক্তন হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আবেগ বা নৈতিকতার ওপর চলে না—ক্ষমতায় যে থাকে, ভারতের স্বার্থ রক্ষায় যে সাহায্য করে, তার সঙ্গেই সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

আগামীতে দুই দেশের সম্পর্কে ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ কীভাবে প্রভাব ফেলবে—তা নির্ভর করছে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ওপর। যদি সম্পর্ককে ওই ইস্যুর ‘জিম্মি’ করা হয়, তবে অগ্রগতি কঠিন হবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা—সম্পর্কে বড় ধরনের সংকট নাও দেখা দিতে পারে, কিন্তু তা নাজুক ও সংবেদনশীল অবস্থায়ই থাকবে।

সূত্রঃ বিবিসি