বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) পুনঃউন্মুক্ত করা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে এক নতুন কৌশলগত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। শনিবার ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহাম্মাদ বাকের জোলকাদর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একাধিক শর্ত তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেছেন যে অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির চাপে ইরান শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে ফিরতে বাধ্য হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে পূর্বঘোষিত ১৭ জুনের দ্বিপাক্ষিক ‘সমঝোতা স্মারক’ (Memorandum of Understanding - MOU) বাস্তবায়নে বাধ্য করাই তেহরানের প্রধান কৌশল।
হরমুজ প্রণালী: ট্রাম্পের ওপর ইরানের 'ড্যামোক্লিসের তলোয়ার'
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের 'ইরান প্রজেক্ট'-এর পরিচালক আলী ওয়ায়েজ ট্রাম্পের ওপর ইরানের এই কৌশলগত চাপকে "ড্যামোক্লিসের তলোয়ার" (Sword of Damocles) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তেহরানের ধারণা, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বা আংশিক খুলে দিলে ট্রাম্প মার্কিন স্বার্থ উদ্ধার করে মূল চুক্তি এবং অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন।
ইরানের রাজনৈতিক কৌশল ও দরকষাকষির মূল দিকগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ত্বরান্বিতকরণ: 'বুরস অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন'-এর প্রতিষ্ঠাতা এসফান্দিয়ার বাতমাঙ্গেলিচ জানান, ইরানি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন যে প্রণালী উন্মুক্ত হলে ওয়াশিংটন পুনর্গঠনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অর্থনৈতিক ছাড় না দিয়েই সংঘাত থেকে বেরিয়ে যাবে। তাই চুক্তি বাস্তবায়নের একটি "নিশ্চয়তা কৌশল" (Commitment Mechanism) হিসেবে প্রণালীটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তেলের আন্তর্জাতিক বাজার ও পারস্য উপসাগরীয় চাপ: হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকার কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম চরম ঊর্ধ্বমুখী। এর ফলে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা তেল রপ্তানির জন্য এই প্রণালীর ওপর শতভাগ নির্ভর করে, তারাও ওয়াশিংটনকে ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরে যেতে চাপ সৃষ্টি করছে।
ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনা: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর প্রযুক্তিগত ও মানচিত্র সংক্রান্ত আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে ওমানের সঙ্গে চুক্তি হলেই প্রণালী খুলে যাবে না; এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের শর্ত পূরণের ওপর।
ইরানের শনিবারের শর্তাবলি ও ট্রাম্পের অবস্থান
শনিবার ইরানের দেওয়া শর্তগুলোর অধিকাংশই ১৭ জুনের ১৪-দফা সমঝোতা স্মারকে ইতিমধ্যেই অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দুই পক্ষের নানা পদক্ষেপে বাতিল হয়ে যায়।
ইরানের প্রধান দাবিগুলো:
১. ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
২. ইরানের সীমান্ত অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অপসারণ।
৩. ট্রাম্প কর্তৃক জব্দ করা ইরানি আর্থিক সম্পদ ও রিজার্ভ মুক্ত করা।
৪. লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর মার্কিন হামলা ও সামরিক হুমকি বন্ধ করা।
৫. যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য 'যুদ্ধ ক্ষতিপূরণ' (War Reparations) প্রদান।
বিশ্লেষক আলী ওয়ায়েজ উল্লেখ করেন, ক্ষয়ক্ষতির দাবিটি মূল চুক্তিতে না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের দরকষাকষির কার্ড হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান।
অন্যদিকে, রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'অ্যাক্সিওস' (Axios)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন সামরিক অভিযানের হুমকি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, "আমরা বিষয়টি শান্তভাবে পর্যবেক্ষণ করছি (We are low-keying it)।" ট্রাম্প মনে করেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতিই তাদের টেবিল আলোচনায় ফেরাতে বাধ্য করবে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও ওয়াশিংটনের নীতিগত দোটানা
লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক 'থ্যাটাম হাউস'-এর মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের পরিচালক সানাম ভাকিল মনে করেন, বর্তমানে তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষের অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে এই সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
তেহরানের অভ্যন্তরীণ চিত্র:
ইরানী প্রশাসনের এক অংশ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ত্বরান্বিত করতে চায়। অন্যদিকে, কট্টরপন্থী অংশটি ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস না করে অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে হলেও সামরিক ও কৌশলগত চাপ বজায় রাখার পক্ষে মত দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনের নীতিগত দোটানা:
হোয়াইট হাউসের একপক্ষ কূটনীতির পক্ষে থাকলেও অন্যপক্ষ সামরিক হামলার মাধ্যমে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয় করার পক্ষে সওয়াল করছে। ইরানি কর্মকর্তারাও ট্রাম্পের নীতিগত অস্থিতিশীলতা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না।
কূটনৈতিক ভবিষ্যৎ: আস্থার সংকট ও স্থায়ী সমাধানের পথ
বিশ্লেষকদের মতে, ১৭ জুনের বাতিল হওয়া সমঝোতা স্মারকটিই হতে পারে দুই দেশের নতুন আলোচনার মূল ভিত্তি। তবে মূল সমস্যা অর্থ বা শর্তের পরিমাণে নয়, বরং চুক্তি বাস্তবায়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের শূন্য আস্থার জায়গায়।
তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী কোনো ফি বা শুল্ক আদায়ের বিষয় নয়, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে গ্যারান্টি আদায়ের প্রধান হাতিয়ার। ফলে ওমানের মধ্যস্থতায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হলেও স্থায়ী চুক্তি ও প্রণালী উন্মুক্তকরণের বিষয়টি এখনও বহু দূরবর্তী বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে।