মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রগতিশীল কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমরকে আক্রমণ করার এবং মিনেসোটার সোমালি সম্প্রদায়কে নিয়ে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য পুনর্ব্যক্ত করার পর তার কড়া জবাব দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্প ইলহান ওমর এবং অন্যান্য সোমালি অভিবাসীকে ‘আবর্জনা’ বলে আখ্যায়িত করে বর্ণবাদী মন্তব্য করেন এবং তাদের যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানান।
এর জবাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওমর লেখেন, “আমাকে নিয়ে তার এই আচ্ছন্নতা ভীতিকর। আমি আশা করি তিনি যে সাহায্যের জন্য মরিয়া, তা পাবেন।”
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প তার অভিবাসনবিরোধী বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বাড়িয়েছেন, বিশেষ করে গত মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে দুইজন ন্যাশনাল গার্ড সেনাকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পর। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন আফগান নাগরিক, যিনি ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং মিত্র বাহিনীর প্রত্যাহারের পর দেশ থেকে সরিয়ে আনা হয়েছিল। এই গুলির ঘটনাকে ব্যবহার করে ট্রাম্প সোমালিয়াসহ যাকে তিনি “তৃতীয় বিশ্বের দেশ” বলে অভিহিত করেছেন, সেখান থেকে অভিবাসন কঠোর করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “যদি আমরা আমাদের দেশে আবর্জনা নিতে থাকি, তবে আমরা ভুল পথে যাব। ইলহান ওমর আবর্জনা। সে আবর্জনা। তার বন্ধুরাও আবর্জনা।” তিনি আরও বলেন, “এরা এমন লোক নয় যারা কাজ করে। এরা এমন লোক নয় যারা বলে, ‘চলো, এসো। আমরা এই জায়গাটিকে মহান করি।’ এরা এমন লোক যারা অভিযোগ ছাড়া আর কিছু করে না। তারা অভিযোগ করে, আর যেখান থেকে তারা এসেছে, সেখানে তাদের কিছুই ছিল না।”
ট্রাম্প দাবি করেন যে তিনি ওমরকে “মোটেই” চেনেন না, কিন্তু তাকে বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে অভিযোগ করতে দেখেছেন। তিনি বলেন, “আমি মনে করি সে একজন অযোগ্য ব্যক্তি। সে সত্যিই ভয়ংকর একজন মানুষ।”
সোমালিয়ার দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা এক সময়ের শিশু শরণার্থী ইলহান ওমরকে প্রথম সোমালি আমেরিকান হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা যায়। তিনি মিনেসোটার একটি জেলার প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে দেশের অন্যতম বৃহত্তম সোমালি ডায়াসপোরা সম্প্রদায় রয়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রে সোমালিরা অন্যান্য শরণার্থী গোষ্ঠীর মতোই উচ্চ বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের শিকার, তবে মিনেসোটা চেম্বার অফ কমার্সের ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে এই সম্প্রদায়ের অবদান এবং উন্নতির দিকে প্রবণতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “যদিও অনেক সোমালি শরণার্থী সীমিত শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে কম অংশগ্রহণ এবং উচ্চ দারিদ্র্যের মাত্রা নিয়ে এসেছিল, দুই দশক পরে তাদের পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। দারিদ্র্যের মাত্রা কমেছে, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বেড়েছে, গড় পারিবারিক আয় সামান্য বেড়েছে এবং শিক্ষাগত অর্জনও সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে।”
ন্যাশনাল গার্ডের গুলির ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে “তৃতীয় বিশ্ব” থেকে সব ধরনের অভিবাসন স্থগিত করা এবং ১৯টি দেশ থেকে আসা স্থায়ী বাসিন্দাদের অবস্থা পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট—যার প্রথম এবং বর্তমান স্ত্রী পূর্ব ইউরোপের অভিবাসী—সাধারণভাবে অভিবাসনকে মার্কিন সম্পদের উপর বোঝা হিসেবে নিন্দা করে আসছেন।
মিনেসোটার উল্লেখযোগ্য সোমালি সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। উদাহরণস্বরূপ, তার প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প পাঁচটি প্রধানত মুসলিম দেশ, উত্তর কোরিয়া এবং ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিবাসন বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন। তথাকথিত “মুসলিম নিষেধাজ্ঞা”র আওতায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে সোমালিয়া ছিল অন্যতম।
সম্প্রতি, ট্রাম্প একটি কোভিড-যুগের কল্যাণমূলক তহবিল তছরুপ কেলেঙ্কারির জন্য সোমালি সম্প্রদায়ের সমালোচনা করেছেন, যেখানে কিছু সোমালি অভিবাসীসহ ডজনখানেক লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
ইলহান ওমর নিজেও ট্রাম্পের সমালোচনার দীর্ঘদিনের লক্ষ্যবস্তু। তিনি বারবার তাকে এবং অন্যান্য অভিবাসী রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করেছেন এই বলে যে তারা “পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে শক্তিশালী জাতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে বলছেন আমাদের সরকার কীভাবে পরিচালিত হবে।” ট্রাম্প ২০১৯ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছিলেন, “কেন তারা ফিরে গিয়ে যেখান থেকে এসেছে সেই পুরোপুরি ভাঙা ও অপরাধ-আক্রান্ত স্থানগুলো ঠিক করতে সাহায্য করছে না?”
গত সপ্তাহে থ্যাঙ্কসগিভিং ছুটির সময় ট্রাম্প যখন মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজকে “গুরুতরভাবে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী” বলে মন্তব্য করেন এবং কথিত সোমালি গ্যাংদের “পথে ঘুরে বেড়ানো”র বিরুদ্ধে কিছু না করার অভিযোগ করেন, তখন তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওমরের ইসলামিক হেডস্কার্ফ নিয়েও উপহাস করে বলেন যে তিনি “সবসময় তার জড়ানো হিজাবে মোড়ানো থাকেন।”
মঙ্গলবার প্রগতিশীল দল জাস্টিস ডেমোক্র্যাটস ট্রাম্পের ইলহান ওমর এবং সোমালি সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণকে “ঘৃণ্য বর্ণবাদী” বলে নিন্দা করেছে। জাস্টিস ডেমোক্র্যাটস একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে বলেছে, “নিজের প্রশাসনের ব্যর্থতা থেকে মনোযোগ সরাতে ট্রাম্প শুধু এইটুকুই করতে জানেন। ঘৃণা উসকে দাও, আমাদের সম্প্রদায়কে বিভক্ত করো, এবং আমাদের প্রতিবেশীদের ভয় দেখাতে ICE (অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা) পাঠাও। করুণ।”