উত্তর আমেরিকার রাজনীতির মঞ্চে এক নতুন এবং অভূতপূর্ব সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সংযোগকারী অন্যতম বৃহত্তম এবং ব্যয়বহুল অবকাঠামো 'গর্ডিয়ে হাউ ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ' এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হুমকির মুখে। মঙ্গলবার কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে ফোনালাপের পর এই সংকট এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে। একদিকে ট্রাম্প এই কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটি আটকে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে কানাডা এবং মিশিগান কর্তৃপক্ষ এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত সোমবার রাতে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এক বিস্ফোরক পোস্টের মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে, তিনি এই সেতুটি চালু করতে দেবেন না যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্রকে তার পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ট্রাম্পের দাবি, কানাডাকে এতদিন যুক্তরাষ্ট্র যা দিয়েছে তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ এবং উপযুক্ত সম্মান না পাওয়া পর্যন্ত এই সেতুর ফিতা কাটা সম্ভব নয়। যদিও তিনি সরাসরি গর্ডিয়ে হাউ ব্রিজের নাম নেননি, কিন্তু ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের এই ছয় লেনের প্রকল্পটি, যা অন্টারিওর উইন্ডসর এবং মিশিগানের ডেট্রয়েটকে যুক্ত করবে, তা নিয়েই যে এই বিতর্ক—তা বুঝতে কারও বাকি নেই।
ট্রাম্পের মূল আপত্তির জায়গা হলো সেতুর মালিকানা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা। তিনি দাবি করেছেন, যেহেতু এই সেতুর আয়ের একটি বড় অংশ আসবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ব্যবহারের মাধ্যমে, তাই এই সম্পদের অন্তত অর্ধেক মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রের থাকা উচিত। তার ভাষায়, "যুক্তরাষ্ট্র যা দিয়েছে, তাতে আমরা অন্তত এই সম্পদের অর্ধেক মালিকানা দাবি করতে পারি। এখান থেকে যে রাজস্ব আসবে তা হবে আকাশচুম্বী।" ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে এই বিষয়ে নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসার ঘোষণা দিয়েছেন, যা মূলত তার পরিচিত ‘ট্রেড ওয়ার’ বা বাণিজ্য যুদ্ধেরই এক নতুন রূপ।
২০১৮ সাল থেকে নির্মাণাধীন এই সেতুটি মূলত কানাডা সরকারের অর্থায়নে তৈরি হচ্ছে। ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের পথে এবং চলতি বছরের শুরুর দিকেই এটি উদ্বোধনের কথা ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আকস্মিক অবস্থানে পুরো প্রক্রিয়াটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মঙ্গলবার ট্রাম্পের সাথে কথা বলার পর সংবাদমাধ্যমকে জানান, তিনি প্রেসিডেন্টকে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। কার্নি বলেন, "আমি ব্যাখ্যা করেছি যে সেতুটির ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি নির্মাণ ব্যয় পুরোপুরি কানাডা বহন করেছে। বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী এর মালিকানা মিশিগান স্টেট এবং কানাডা সরকারের মধ্যে ভাগ করা।"
এই আলোচনার রেশ ধরে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য সামনে এনেছেন। তিনি জানান, বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী কানাডা যখন টোলের মাধ্যমে এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় উসুল করে ফেলবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মিশিগান স্টেট এর অর্ধেক মালিকানা লাভ করবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রকে আলাদা করে কিছু দিতে হবে না, বরং সময়ের ব্যবধানে তারা এমনিতেই এর অংশীদার হবে। ফোর্ড আরও যোগ করেন যে, এই সেতুটি চালু না হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমেরিকার নিজস্ব অর্থনীতি। বাণিজ্য ও পর্যটনের যে বিশাল প্রবাহ এই সেতুর ওপর নির্ভর করছে, তা আটকে রাখা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
তবে ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট মঙ্গলবার ব্রিফিংয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট মনে করছেন এই সেতু নির্মাণে পর্যাপ্ত আমেরিকান কাঁচামাল বা স্টিল ব্যবহার করা হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্র এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির অংশ হিসেবেই এই কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকের অভিমত:
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে নিছক একটি সেতুর উদ্বোধন বন্ধ করার চেষ্টা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির কৌশল। ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত এই সেতুটিকে একটি 'লিভারেজ' বা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে কানাডার কাছ থেকে বাণিজ্যের অন্যান্য ক্ষেত্রে বড় কোনো ছাড় আদায় করতে চাইছে। ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প যা প্রায় সমাপ্ত, তা হুট করে বন্ধ করা অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব এবং লজিস্টিক্যালি অত্যন্ত জটিল। কিন্তু ট্রাম্পের এই হুঙ্কার কানাডার নতুন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির জন্য প্রথম বড় অগ্নিপরীক্ষা।
কানাডার পক্ষ থেকে বারবার যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, এই প্রকল্পে মার্কিন ইস্পাত এবং শ্রমশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দুই দেশই সমানভাবে উপকৃত হয়েছে। তবে ট্রাম্প এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার তথ্য মানতে নারাজ; তিনি আরও বড় কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা বা মালিকানার দাবিতে অনড়। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, ট্রাম্পের এই আচরণ মিশিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ 'সুইং স্টেট'-এর স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে, কারণ সেখানকার অর্থনীতি এই সেতুর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে ট্রাম্পের এই ‘মালিকানা দাবি’ আন্তর্জাতিক চুক্তির আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। একটি দেশ যখন অন্য দেশের ভূখণ্ডে বা সীমান্তে একক বিনিয়োগে কিছু তৈরি করে, তখন সেই চুক্তির শর্তাবলী চাইলেই একতরফাভাবে বদলে ফেলা যায় না।
সবশেষে বলা যায়, এই সংকট কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সাবেক মিশিগান কংগ্রেস সদস্য পিট হোয়েকস্ট্রার অন্তর্ভুক্তি একটি ইতিবাচক দিক হতে পারে। তবে এই ‘সেতু যুদ্ধ’ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে উত্তর আমেরিকার সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাছে রাজনৈতিক ইগো হার মানে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।