এখন সময় রিপোর্ট • প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:১২ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

সার্ক এবং জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী কূটনীতি: একটি ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

সার্ক এবং জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী কূটনীতি: একটি ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের শুরুতে দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয়। দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাস, সীমান্ত বিরোধ এবং দ্বিপাক্ষিক তিক্ততা কাটিয়ে এই অঞ্চলের সাতটি দেশ—বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ—একই টেবিলে বসতে সম্মত হয়। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার পেছনে যার দূরদর্শী চিন্তা ও নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কাজ করেছিল, তিনি বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা 'সার্ক' (SAARC) গঠনের প্রস্তাবটি ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক জোট নয়, বরং এটি ছিল এই অঞ্চলের দরিদ্র পীড়িত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির এক মহৎ স্বপ্ন।

ঐতিহাসিক পটভূমি ও প্রেক্ষাপট

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছিল। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, কাশ্মীর ইস্যু এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ছোট দেশগুলোর মধ্যে ভারতের বিশালত্ব নিয়ে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ছিল, অন্যদিকে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সীমান্ত ও পানিবণ্টন নিয়ে বিরোধ ছিল তুঙ্গে।

এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেন যে, কোনো একক দেশের পক্ষে দারিদ্র্য ও অনগ্রসরতা দূর করা সম্ভব নয়। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) বা আসিয়ানের (ASEAN) মতো একটি আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দ্বিপাক্ষিক বিরোধগুলো পাশে রেখে যদি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো যায়, তবে এই অঞ্চলের চিত্র বদলে যাবে।

সার্কের প্রাথমিক ধারণা ও জিয়াউর রহমানের প্রস্তাব

জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো সফর করেন এবং এই দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেন। ১৯৮০ সালের মে মাসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সার্ক গঠনের লিখিত প্রস্তাব পাঠান। তার এই প্রস্তাবনায় কিছু মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল:

১. আঞ্চলিক সংহতি এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা।

২. অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা।

৩. অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়ন।

৪. দ্বিপাক্ষিক ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যুগুলো বাদ দিয়ে কেবল সাধারণ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা।

জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে, যদি রাজনৈতিক বিরোধগুলোকে প্রাথমিক আলোচনায় রাখা হয়, তবে ভারত ও পাকিস্তান কখনোই একই জোটে আসবে না। তাই তিনি 'কার্যকরী সহযোগিতা'র (Functional Cooperation) ওপর জোর দিয়েছিলেন।

কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও জিয়াউর রহমানের দূরদর্শিতা

সার্ক গঠনের পথটি সহজ ছিল না। জিয়াউর রহমানকে প্রধানত দুটি বড় বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল:

ভারতের সংশয়: তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মনে করেছিলেন, এই সংস্থাটি আসলে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর একটি জোট হতে পারে, যার মাধ্যমে তারা সম্মিলিতভাবে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

পাকিস্তানের সন্দেহ: অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক মনে করেছিলেন, এটি ভারতের একটি নতুন চাল হতে পারে যার মাধ্যমে ভারত এই অঞ্চলে তার আধিপত্য বিস্তার করবে।

জিয়াউর রহমান অত্যন্ত কৌশলী কূটনীতির মাধ্যমে উভয় দেশকেই আশ্বস্ত করতে সক্ষম হন। তিনি ব্যক্তিগত দূত পাঠিয়ে বোঝাতে সক্ষম হন যে, এই সংস্থাটি কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক জোট নয়, বরং এটি একটি উন্নয়নমূলক জোট। তার এই নিরপেক্ষ ও মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা তাকে বিশ্বমঞ্চে একজন বিচক্ষণ নেতার মর্যাদা দেয়।

সার্কের মূল কাঠামো ও ভিত্তিপ্রস্তর

জিয়াউর রহমানের প্রস্তাবের পর ১৯৮১ সালে কলম্বোতে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৮৩ সালে দিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে 'সাত জাতির ঘোষণা' গৃহীত হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সার্কের যাত্রা শুরু হয়। যদিও এর আগেই ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করেন, কিন্তু সার্কের প্রতিটি ইটে তার চিন্তার প্রতিফলন ছিল স্পষ্ট।

ঢাকার ঐতিহাসিক সেই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী নেতারাসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়া একবাক্যে স্বীকার করেছিল যে, জিয়াউর রহমানই ছিলেন এই উদ্যোগের আসল স্থপতি।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সার্কের প্রভাব

জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তার একটি বড় অংশ ছিল দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যস্থ বাণিজ্য বাড়ানো। সার্ক গঠনের ফলে 'সাফটা' (SAFTA) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পথ সুগম হয়। এছাড়া কৃষি, টেলিযোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান শুরু হয়। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভিসামুক্ত চলাচল এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের যে ধারণা আজ আমরা দেখি, তার বীজ বপন করেছিলেন জিয়াই।

ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় জিয়ার কৌশল

জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন দক্ষিণ এশিয়াকে পরাশক্তিদের (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র) প্রভাবমুক্ত রাখতে। তিনি মনে করতেন, এই অঞ্চলের দেশগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তবে বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ কমে আসবে। তার এই নীতি 'ব্যালেন্সিং ডিপ্লোম্যাসি' হিসেবে পরিচিত। তিনি নেপাল ও ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলোকে সাগরের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব করেছিলেন, যা একটি বিশাল আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমান বিশ্ব ও সার্কের প্রাসঙ্গিকতা

আজকের বিশ্ব যখন চরম মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সার্কের গুরুত্ব আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। যদিও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান বৈরিতার কারণে সার্ক বর্তমানে কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে, কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সার্কের মতো একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মের কোনো বিকল্প নেই। জিয়াউর রহমান যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়া আজ বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারত।

মূল্যায়ন

জিয়াউর রহমানের সার্ক গঠনের উদ্যোগ কেবল একটি সাময়িক রাজনৈতিক চাল ছিল না; এটি ছিল কয়েক দশকের গভীর গবেষণা ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের ফসল। একজন সফল সমরনায়ক হয়েও তিনি যেভাবে শান্তির জন্য কূটনীতি ব্যবহার করেছেন, তা বিরল।

পরিশেষে বলা যায়, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বের যে সেতু তিনি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, তা আজও এই অঞ্চলের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। সার্ক জিয়াউর রহমানের এমন এক অমর কীর্তি যা তাকে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের পাতায় একজন দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল এক বিশাল গৌরবের বিষয় যে, একটি ছোট ও সদ্য স্বাধীন দেশ হয়েও বাংলাদেশ পুরো অঞ্চলের নেতৃত্ব দিয়েছিল তার সুযোগ্য নেতার হাত ধরে।

গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, সার্কের ধারণাটি জিয়াউর রহমানের একক মস্তিষ্কপ্রসূত হলেও তিনি এটি সফল করতে আসিয়ান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মডেল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল একটি ‘সাউথ এশিয়ান কনফেডারেশন’ বা ‘কমন মার্কেট’ তৈরি করা। বর্তমান সময়ে সার্কের স্থবিরতার প্রধান কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, যা জিয়াউর রহমানের সময়ে তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, সার্ক যদি পূর্ণ শক্তিতে কার্যকর থাকতো, তবে দক্ষিণ এশিয়া আজ ইউরোপের মতোই সমৃদ্ধ অঞ্চল হতে পারতো।