সংবাদ বা “খবর” মানে বাস্তবতার এক ন্যূনতম প্রমাণিত চিত্র। প্রমাণ বা এভিডেন্স ছাড়া সংবাদ আসলে গুজবের কাছাকাছি চলে যায়। এ কারণেই সংবাদ প্রচার ও প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রমাণের গুরুত্ব শুধু পেশাগত দক্ষতার বিষয় নয়, এটি নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা, অনেক ক্ষেত্রে ঈমানি আমানতও বটে।
প্রথমত, সংবাদকে 'সংবাদ' বানায় প্রমাণের ভিত্তি। একজন সাংবাদিক যখন কোনো ঘটনার বর্ণনা দেন, তখন তাঁর সামনে থাকে নানান ধরনের এভিডেন্স, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, নথি, অফিসিয়াল ডকুমেন্ট, ভিডিও ফুটেজ, ছবি, পরিসংখ্যান, কিংবা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা বাস্তবতা। এগুলোর সমন্বয়, যাচাই ও তুলনা করে তিনি একটি তথ্যভিত্তিক বয়ান দাঁড় করান। এই প্রক্রিয়াই সংবাদকে “গল্প” থেকে পৃথক করে। যদি কোনো দাবি, অভিযোগ বা পরিসংখ্যানের পেছনে যাচাইযোগ্য প্রমাণ না থাকে, তবে তা পাঠকের সামনে “তথ্য” হিসেবে তুলে ধরা ন্যায়বিচার বিরোধী।
দ্বিতীয়ত, প্রমাণ সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার মেরুদণ্ড। পাঠক বা দর্শক যখন বুঝতে পারেন যে একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি খবরই এক বা একাধিক স্বাধীন উৎস, নথি, তদন্ত বা ডেটা দ্বারা সমর্থিত, তখন সে প্রতিষ্ঠানের ওপর জনবিশ্বাস তৈরি হয়। বিপরীতে, একবার যদি প্রমাণহীন বা মিথ্যা সংবাদ প্রকাশিত হয়ে যায়, তার প্রভাব শুধু সাময়িক লজ্জা নয়, দীর্ঘমেয়াদি আস্থাহানি, ব্র্যান্ড ও পেশাগত মর্যাদার পতন। এ বিশ্বাস হারালে সংবাদমাধ্যম কণ্ঠস্বর রাখলেও সেই কণ্ঠের ওজন হারিয়ে ফেলে।
তৃতীয়ত, এভিডেন্সের বাধ্যবাধকতা মূলত মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগমূলক সংবাদ করার আগে শক্ত প্রমাণ, একাধিক উৎস, এবং অভিযুক্ত পক্ষকে বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। প্রমাণহীন অভিযোগ প্রকাশ মানে কারও মানসম্মান, পেশা, ব্যবসা, কখনো কখনো নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া। কলম ও ক্যামেরার এই শক্তি যত বড়, দায়িত্বও তত ভারী।
আইনের দৃষ্টিতেও এভিডেন্স ভিত্তিক কাজ বাধ্যতামূলক। মানহানি আইন, আদালত অবমাননা, ঘৃণাত্মক বক্তব্য, বিদ্বেষ ছড়ানো, এগুলোর প্রত্যেকটিতে প্রমাণহীন সংবাদ প্রকাশের কারণে মামলা, জরিমানা, এমনকি কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। অনেক দেশে প্রেস কাউন্সিল, কোড অব এথিক্স, সাংবাদিক ইউনিয়নের নৈতিক নীতিমালা সবই বলে, “যাচাই না করে প্রকাশ নয়”, “অভিযোগ প্রচারের আগে ডকুমেন্টেশন ও ক্রস চেক।” অর্থাৎ প্রমাণ রাখা শুধু পেশাগত সৌন্দর্য নয়, আত্মরক্ষার জন্যও আবশ্যক।
নৈতিকতা ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও সংবাদে প্রমাণের বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট। কুরআনে বলা হয়েছে, কোনো ফাসেক ব্যক্তি সংবাদ আনলে তা যাচাই করতে, যাতে অজ্ঞতাবশত কোনো জাতির ক্ষতি না করে বসি, পরে নিজেই আফসোস করতে না হয়। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তার পেছনে চল না, নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর, এ সবই জিজ্ঞাসিত হবে।” সংবাদকর্মীর কাজই তথ্য প্রচার করা, তাই তাঁর প্রত্যেকটি শব্দ একেকটি شهادت বা সাক্ষ্যের মতো। সাক্ষ্যের মিথ্যাচার যেমন ভয়াবহ পাপ, তেমনি সংবাদে মিথ্যাচারও এক ধরনের সামাজিক জুলুম।
ডিজিটাল যুগে এভিডেন্সের গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কমেনি। এখন এক ক্লিকে লাখো মানুষের নিউজফিডে পৌঁছে যায় কোনো তথ্য বা গুজব। “আগে থাকা”র প্রতিযোগিতায় অনেকেই “সত্য হওয়া”র বাধ্যবাধকতা ভুলে যায়। অথচ সেকেন্ডের লোভে যদি যাচাই বাদ পড়ে, পরে সেই ভুল শুধরাতে গিয়ে যে ক্ষতি হয় তা আর পূরণ করা যায় না। তাই আধুনিক সংবাদকর্মীর পেশাগত ধর্ম হওয়া উচিত, আগে যাচাই তারপর ভাইরাল। স্ক্রিনশট, লিংক, নথি সংরক্ষণ, রেকর্ডেড কল, মেইল চেইন, সবগুলোই আজকের এভিডেন্স ব্যাংক, যা তাঁকে ভবিষ্যতে আইনি ও নৈতিক জবাবদিহি থেকে সুরক্ষা দেয়।
অবশেষে, সংবাদে প্রমাণের সংস্কৃতি আসলে সমাজে ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। যখন মানুষ দেখে যে কোনো খবরই শুধু আবেগ নয়, দৃঢ় যুক্তি, তথ্য ও নথির ওপর দাঁড়িয়ে, তখন সমাজে যুক্তিনির্ভর আলাপ বাড়ে, গুজব কমে, হিংসা ও বিভাজনের পথ সংকুচিত হয়। সংবাদকর্মী তাই কেবল গল্পকার নন, সত্যের আমানতদার, প্রমাণের রক্ষক। তাঁর হাতে থাকা কলম বা মাইক্রোফোনের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত এই অঙ্গীকার, “কোনো সংবাদ নয়, যদি না থাকে প্রমাণ, কোনো প্রচার নয়, যদি না থাকে ন্যায়।”