বাঙালি জাতির অহংকার ও আত্মত্যাগের অমর স্মারক ‘মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ আজ। ১৯৫২ সালের এই দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর ও জব্বারসহ নাম না জানা অনেক বীর সন্তান। তাদের সেই মহান আত্মত্যাগের স্মৃতিতে বিনম্র শ্রদ্ধায় সিক্ত হচ্ছে গোটা দেশ।
প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের শ্রদ্ধা
রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর পরপরই রাত ১২টা ৬ মিনিটে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। রাত ১২টা ১২ মিনিটে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টামণ্ডলী উপস্থিত ছিলেন।
শহীদ মিনারে বিরোধীদলীয় নেতার নতুন ইতিহাস
একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এটিই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার প্রথম শ্রদ্ধা নিবেদন। শুক্রবার রাত ১২টা ২২ মিনিটে তিনি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন এবং ১১ দলীয় জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি ভাষা শহীদদের মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আজিমপুর অভিমুখে রওয়ানা হন।
জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত শহীদ মিনার
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাত ১২টা ৪০ মিনিট থেকে শহীদ মিনার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানে কণ্ঠ মিলিয়ে হাতে ফুল নিয়ে হাজারো মানুষের ঢল নামে শহীদ মিনার অভিমুখে।
নিরাপত্তায় নিশ্ছিদ্র চাদর
শহীদ দিবস ঘিরে রাজধানীসহ সারা দেশে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। এছাড়াও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) টহল দিচ্ছে।
ইতিহাসের ফিরে দেখা
১৯৪৭ সালে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ পায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল বের করলে তৎকালীন পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। রক্তঝরা সেই আন্দোলনের পর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো এবং ২০১০ সালে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পালনের স্বীকৃতি দেয়।
এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো জামায়াত নেতার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘নতুন বাংলাদেশের’ অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।