এগারো শতকের মাঝপর্বে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে বাংলায় এসেছিল ব্রাহ্মণ সেন বংশীয় যোদ্ধারা। তারা বাঙালি পাল রাজাদের সেনাবাহিনীতে চাকরি নেয়। গোপনে শক্তি সঞ্চয় করে তারা। পাল রাজবংশের অন্তিম সময় তখন।
পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বাংলার সিংহাসন কেড়ে নেয়। ক্ষমতায় বসেই মনস্তাত্ত্বিক সংকটে ভুগছিলেন সেন রাজারা। তাঁরা জানতে পেরেছেন বাঙালি অন্যায় শাসন মানেনি কখনো। সহস্র বছর আগেও বহিরাগত আর্য আক্রমণ ঠেকিয়ে দিয়েছিল।
আরো অনেক পরে উত্তর বাংলায় দিব্যকের নেতৃত্বে কৈবর্তরা বিদ্রোহ করে। তাই সেনদের অন্যায় শাসনকেও হয়তো মেনে নেবে না। বিদ্রোহ-বিপ্লবে খুব কমই অংশ নেয় উচ্চবিত্তের মানুষ। সাধারণ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে বিপ্লবে।
তাই সাধারণ বাঙালির কণ্ঠ রোধ করার জন্য সমাজে বর্ণ বিভাজন করলেন সেন রাজারা। সাধারণ বাঙালিকে কোণঠাসা করার জন্য শূদ্র নাম দিয়ে ব্রাত্যজন বানিয়ে ফেললেন। দূরদর্শী চিন্তা থেকে সেন রাজারা চেয়েছিলেন আগামীর বাঙালি প্রজন্ম যাতে পূর্বপুরুষের সংগ্রামী ঐতিহ্য জেনে শক্তি সঞ্চয় করতে না পারে। তাই তাঁরা সব ধরনের অধিকার বঞ্চিত করেন শূদ্রের। বিশেষ করে শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেন।
বাংলা ভাষায় ধর্মগ্রন্থ অনুবাদও নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এভাবে সংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন করে নিজেদের অন্যায় শাসনকে নিরাপদ রাখতে চেয়েছেন।
সেনদের মতো অভিন্ন মানসিকতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের। তাঁরাও চেয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করতে। তাই তাঁরা প্রতিবাদী বাঙালির ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন। সেনদের মতো তাঁরা নতুন প্রজন্মের বাঙালিকে ঐতিহ্য ভোলাতে চেয়েছেন। একইভাবে আঘাত হেনেছেন শিক্ষার অঙ্গনে। শিক্ষার বাহন ভাষা। এ কারণে বাংলা ভুলিয়ে উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন। প্রাচীন বিশ্বসভ্যতার দিকে তাকালেও অভিন্ন চিত্র দেখতে পাব। প্রাচীন চীনে দার্শনিক কনফুসিয়াস আর গ্রিসে সক্রেটিস তরুণ প্রজন্মকে মুক্তচিন্তায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শেখানোর অপরাধে কি শাসকদের ক্রোধের শিকার হননি!
শিক্ষকদের শেষ পর্যন্ত মাঠে নামতেই হলোইতিহাসের এসব সাক্ষ্য দেখে নিজেদের এখন ঘরপোড়া গরু মনে হয়। সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পেতে হচ্ছে। যেভাবে আধুনিকায়নের নামে শিশু শিক্ষার্থীদের কারিকুলাম নিয়ে বারবার নিরীক্ষা হচ্ছে—ভাবা হচ্ছে না দেশের সব অঞ্চলের শিক্ষার্থী আর তাদের অভিভাবকদের সামর্থ্যের দিকে। সবার গ্রহণ ক্ষমতার দিকে। একেক পরীক্ষায় গিনিপিগ মারা গেলে নতুন নিরীক্ষায় চলে যাচ্ছে, অর্থকড়ির মচ্ছব হচ্ছে। এতে শঙ্কা হচ্ছে কোনো পক্ষ কি ঐতিহ্য সচেতন প্রতিবাদী বাঙালির পথ রুদ্ধ করতে চাইছে! শিক্ষাকে হেলাফেলা করা হয় বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আজও আমরা কোনো শিক্ষাবিদকে পেলাম না। সবই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে চলছে। উচ্চ শিক্ষাঙ্গনও স্বাভাবিক ছন্দে এগোতে পারছে না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে দলীয় রাজনীতির দূষিত রক্ত। তাই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে। রাজনৈতিকীকরণের নোংরা খেলা চলছে নানা নীতি নির্ধারণে। শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় ও অবৈধ তদবির শক্ত অবস্থান নিয়েছে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবু সরকারগুলো যেন স্বস্তি পাচ্ছিল না। মুক্তচিন্তায় শিক্ষকরা রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে সরব হন। নিজেদের পক্ষে না গেলে তাতে ক্ষুব্ধ হন রাজনৈতিক নেতারা। নিজেদের পক্ষে কথা না বললে অথবা সমালোচনা করলে বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে তির্যক মন্তব্য করতে থাকেন। কখনো কখনো তা সভ্যতা-ভব্যতার মাত্রা ছাড়ায়।
এ দেশের আমলাতন্ত্র সরকারগুলোকে চাহিদামতো রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেওয়ার বিনিময়ে সরকারকে নিজেদের প্রতি নির্ভরশীল করে তুলেছে। তাই আমলারা নিজেদের জন্য সব সুখ-সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অসম্মানিত করা, চাপে ফেলার সব রকম চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, এমনকি পাকিস্তানের মতো শিক্ষকরা সমাজে সম্মানিত হতে পারেন তেমন বেতনকাঠামো নেই এ দেশে। এ দেশের আমলাদের কাছাকাছি সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত শিক্ষকসমাজ। এসব তো ধীরে ধীরে অসন্তোষ বৃদ্ধিই করবে।
দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষকদের জন্য সুপার স্কেল ও স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর দাবি ছিল। আমাদের মনে হয়, এসব দাবি থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্য ‘প্রত্যয়’ নামের সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় শিক্ষকদের যুক্ত করতে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। শিক্ষকরা নাকি জাতি গড়ার কারিগর। এ দেশের বাস্তবতায় আজ যারা সরকার রক্ষার কারিগর, তারা সব চর্ব্য চোষ্য লেহ্যে উদর পূর্তি করছে, আর দেশ গড়ার কারিগররা অসম্মানিত হচ্ছেন। শিক্ষকদের অবসরের পর আর কী আছে ওই পেনশনটুকু ছাড়া! সেখানেও এমন গড়াপেটা করতে হচ্ছে কেন? সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অংশীজনদের সঙ্গে একবার আলোচনারও প্রয়োজন মনে করল না? শিক্ষকরা এতটাই ব্রাত্যজন?
আমরা তো মনে করি আজ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে ক্লাস-গবেষণা, পরীক্ষা বর্জন করে মাঠে নেমেছেন, এর ক্রীড়নক সরকারই। কারণ এ আন্দোলন চলছিল নিয়মতান্ত্রিকভাবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বারবার বহু সময় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের সরকারগুলোর পলিসি হচ্ছে শুরুতে সমাধান করতে চায় না। সব তালগোল পাকিয়ে গেলে পরে সমাধানের পথ খোঁজে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কথা শুনেও তা মনে হলো। শিক্ষকদের কর্মবিরতি প্রসঙ্গে ৬ জুলাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্টই জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা নিয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলবেন না। শিক্ষকদের কর্মসূচি শুরু হলে পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নেবেন। অর্থাৎ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরে সিদ্ধান্ত নেবেন। এই ধীরে চলা নীতিতে যে শিক্ষা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে এতে বিধায়কদের মাথাব্যথা নেই।
শিক্ষকরা ব্যক্তিস্বার্থে আন্দোলনে নামেননি। যাঁরা দেশজুড়ে আন্দোলন করছেন, তাঁরা এই স্কিমের আওতাভুক্ত নন। ১ জুলাই থেকে যাঁরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তাই আজকের শিক্ষকরা পরবর্তী সময়ে যাঁরা পেশায় আসবেন, তাঁদের নিয়ে ভাবছেন। আন্দোলনকারী শিক্ষকরা স্পষ্ট করেছেন তাঁদের উদ্বেগের জায়গাগুলো। তাঁরা মনে করেন, এই পেনশন স্কিম স্পষ্টতই শিক্ষকদের মধ্যে একটি বৈষম্যের সীমারেখা টেনে দিচ্ছে। নানা রকম সামাজিক-প্রশাসনিক ও আর্থিক বৈষম্যের কারণেই মেধাবীরা এ দেশে শিক্ষকতায় খুব বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে না। তাদের অনেকেই দুর্নীতিতে আকীর্ণ নিমজ্জিত আমলাতন্ত্রে নিজেদের যুক্ত করতে বা দেশান্তরি হতে বেশি পছন্দ করছে। এর মধ্যে প্রত্যয় নামের পেনশন স্কিম তাদের আরো বিকর্ষণ করবে। এখন সরকারের বিধায়করা যদি চোখের সামনে সেন রাজা বা মুক্তিযুদ্ধপূর্ব পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের মতো প্রতিবাদী ছাত্র-শিক্ষকদের সাইড লাইনে ফেলে রাখতে চান, কণ্ঠ রোধ করতে চান, তাহলে দেশের শিক্ষার ভবিষ্যৎ তো ঘোরতর অন্ধকারেই নিপতিত হবে।
মনে রাখতে হবে, মেধাবী মানুষ না থাকলে দুর্নীতিবাজদের পাশে রেখে স্মার্ট বাংলাদেশ বা সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হবে না। এ সত্য পাকিস্তানি হানাদাররা বুঝতে পেরেছিল বলেই বুদ্ধিজীবী হত্যায় মত্ত হয়েছিল।
শিক্ষকরা তো সরকারকে ভাবার অনেক সময় দিয়েছেন। তাঁরা নরম কর্মসূচি হিসেবে মানববন্ধন করেছেন, অর্ধদিবস ধর্মঘটের কর্মসূচি পালন করেছেন। দাবি না মানলে দিন-তারিখ দিয়ে দিয়েছিলেন সর্বাত্মক কর্মসূচি পালনের। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বুঝিয়ে দিল এ দেশে এখন কার্যত গণতন্ত্রচর্চা চলছে না এবং সরকার শিক্ষকদের থোড়াই কেয়ার করে। বাস শ্রমিক ইউনিয়ন এমন কর্মসূচির ঘোষণা দিলে সরকারপক্ষ কয়েকবার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করে ফেলত। কিন্তু সরকারপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলারই প্রয়োজন মনে করেনি। বরং আন্দোলন কর্মসূচি চলমান থাকতেই কোনো রকম আলোচনা না করে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে প্রত্যয় স্কিম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো। বোধ হয়, তারা বিশ্বাস করে শিক্ষক নেতাদের নানা পদ-পদবির লোভ দেখিয়ে আন্দোলন দুর্বল করে দিতে পারবে!
আমার মনে হচ্ছে, সরকারপক্ষ অঙ্কে কিছুটা ভুল করছে। ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে কর্মবিরতি চলছে। এই আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অভিন্ন কর্মসূচিতে মাঠে নেমেছেন। আমাদের তো মনে হয়, সর্বজনীন পেনশন স্কিম থেকে শিক্ষকদের মুক্ত করা ও স্বতন্ত্র পে স্কেলের দাবি বাস্তবায়ন ছাড়া তাঁরা হয়তো আন্দোলন থামাবেন না। আর সরকার দীর্ঘদিন অনড় থেকে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সচল করতে না পারলে দেশ-বিদেশে খুব সুনাম কুড়াতে পারবে না। শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের ক্ষতির দায় সরকারকেই নিতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com