এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৭ ডিসেম্বার ২০২৫, ০৭:০০ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

শতবর্ষে আরএসএস: ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একচ্ছত্র আধিপত্য

শতবর্ষে আরএসএস: ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একচ্ছত্র আধিপত্য

ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের নাম রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর চলতি বছর শততম বর্ষে পদার্পণ করেছে এই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনটি। এক সময় ভারতের মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে থাকা বা একাধিকবার নিষিদ্ধ হওয়া এই সংগঠনটি এখন দেশটির শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। গত আগস্টে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কণ্ঠে আরএসএস-এর প্রতি যে অকুণ্ঠ প্রশংসা শোনা গেছে, তা সংগঠনটির বর্তমান আধিপত্যেরই এক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

প্রতিষ্ঠাকালে আরএসএস-এর মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম শাসন ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবে ম্লান হওয়া হিন্দু জাগরণ পুনরুদ্ধার করা। বর্তমানে ভারতজুড়ে সংগঠনটির প্রায় ৮৩ হাজার শাখা সক্রিয় রয়েছে। প্রতিদিন ভোরে এসব শাখায় শরীরচর্চা, দেশপ্রেমের সঙ্গীত এবং আদর্শিক পাঠের মাধ্যমে কয়েক লাখ স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা হচ্ছে। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেও ছোটবেলা থেকে এই শাখার মাধ্যমেই গড়ে উঠেছেন। সমালোচকদের মতে, আরএসএস এখন কেবল একটি সামাজিক সংগঠন নয়, বরং ভারতের বিচার বিভাগ, পুলিশ, গণমাধ্যম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা এক শক্তিশালী শক্তি।

সংগঠনটির বর্তমান প্রধান মোহন ভাগবত আরএসএস-এর এই প্রসারকে ভারতের সাংস্কৃতিক একীকরণ হিসেবে দাবি করলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের ২০ কোটি মুসলিম এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী দর্শন নিয়ে গভীর উদ্বেগ কাজ করছে। আরএসএস-এর বিভিন্ন শাখা সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে প্রায়ই সংখ্যালঘুদের ওপর চড়াও হওয়া, গির্জায় হামলা বা ধর্মীয় বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। এমনকি আদালতের মতো ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষক হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এখন হিন্দুত্ববাদী মনোভাবের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।

ভারতের বৃহত্তম রাজ্য উত্তরপ্রদেশে আরএসএস-এর এই দর্শনের প্রয়োগ সবচেয়ে কঠোরভাবে লক্ষ্য করা যায়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসনে ধর্মীয় মেরুকরণ এখন তুঙ্গে। একদিকে যেমন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু উৎসবগুলো জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এই বুলডোজার নীতি আরএসএস-এর সেই আগ্রাসী হিন্দুত্বেরই প্রতিফলন বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।

শতবর্ষের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আরএসএস এখন আর গোপন কোনো চক্র নয়, বরং প্রকাশ্য এক বিশাল মহীরুহ। দিল্লিতে তাদের আকাশচুম্বী প্রধান কার্যালয় এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ অনুসারী প্রমাণ করে যে, তারা ভারতের প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে একটি হিন্দু প্রধান রাষ্ট্রে রূপান্তরের লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং আরএসএস-এর সাংগঠনিক শক্তি মিলে ভারতকে এক নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে হিন্দু ধর্মই হবে রাষ্ট্রের প্রধান পরিচয়।