২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন চারদিকে আমূল পরিবর্তনের ঢেউ বইছিল, তখন বড় এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল—আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অবস্থান। স্পিকার থেকে শুরু করে প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদধারীরা সরে দাঁড়ালেও কেন এবং কীভাবে পদে বহাল থাকলেন তিনি?
সম্প্রতি দৈনিক কালের কণ্ঠ-কে দেওয়া এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি নিজেই সেই ‘দুঃসময়ে’র নেপথ্য কারিগরদের নাম সামনে এনেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে তাকে অপসারণের তীব্র চেষ্টা চললেও মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং সশস্ত্র বাহিনীর অনড় অবস্থানের কারণেই তিনি টিকে যান।
বিএনপির সহযোগিতায় ‘শতভাগ’ মুগ্ধ রাষ্ট্রপতি
সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্বীকার করেন, সেই সংকটকালে বিএনপির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি বলেন, “আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।” বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে তার আগের ধারণা বদলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল!”
রাষ্ট্রপতির ভাষ্যমতে, বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে তারা তার পাশে থাকবে।
কেন অনড় ছিল বিএনপি? (বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণ ও দলীয় অবস্থান)
বিবিসি বাংলা-র তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান ছিল অত্যন্ত কৌশলী। দলটির সিনিয়র নেতারা তখন প্রকাশ্যে ও নেপথ্যে রাষ্ট্রপতির অপসারণের বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের প্রধান যুক্তিগুলো ছিল:
১. সাংবিধানিক সংকট এড়ানো: হঠাৎ রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হলে দেশে বড় ধরনের সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
২. নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা: বিএনপি শুরু থেকেই দ্রুত জাতীয় নির্বাচন দাবি করে আসছিল। তারা মনে করেছিল, রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হলে নির্বাচন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত বা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
৩. স্থিতিশীলতা রক্ষা: রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বিএনপি জানত যত দ্রুত নির্বাচন হবে, তাদের ফলাফল তত ভালো হবে। তাই অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রপতিকে সরানোর ঝুঁকি তারা নিতে চায়নি।
২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের স্পষ্ট বলেছিলেন, “দেশে যাতে নতুন করে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আমরা সরকারকে খেয়াল রাখতে বলেছি।”
সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থন ও ‘পরাজয়’ তত্ত্ব
রাষ্ট্রপতি তার সাক্ষাৎকারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করেছেন। তিনি জানান, তিন বাহিনীর প্রধানরা তাকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছিলেন। তারা সরাসরি রাষ্ট্রপতিকে বলেছিলেন, “মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।” এই সামরিক সমর্থন তাকে বঙ্গভবনে টিকে থাকতে মানসিক ও কৌশলগত সাহস জুগিয়েছিল।
অভ্যুত্থানের নেতাদের চাপ ও সরকারের পিছুটান
রাষ্ট্রপতি জানান, তাকে অপসারণের উদ্যোগটি মূলত এসেছিল গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে। এক পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও দলগুলো একটি অবস্থানে পৌঁছায় যে—রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে তবেই তাকে সরানো হবে। কিন্তু বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’র পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
প্রেক্ষাপট: ১৯ অক্টোবরের সেই বিতর্ক
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর একটি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্রের দালিলিক প্রমাণ না থাকার কথা বললে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। ২২ অক্টোবর বঙ্গভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও সেনাবাহিনীর সমর্থনে তিনি স্বপদে বহাল থাকতে সক্ষম হন এবং পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে শপথ পাঠ করান।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা