এখন সময় রিপোর্ট : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যেন এক অনবরত উত্থান পতনের ধারাবাহিকতা। স্বাধীনতার পর থেকে ক্ষমতার পালাবদল যতবার ঘটেছে, ততবারই পুনর্বাসনের নামে নতুন করে ফিরে এসেছে কিছু দল বা গোষ্ঠী। আর তার খেসারত দিতে হয়েছে অন্যদের। এই নির্মম অভিজ্ঞতাগুলোর প্রতিফলন টেনে জাতিকে সতর্ক করেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট: ১৯৭৫ সালের অস্থিরতার পর রাষ্ট্রপতি হন শহীদ জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধাদের ত্যাগের বিনিময়ে জন্ম নেওয়া নেতৃত্বই বিএনপির ভিত্তি তৈরি করে। অথচ কর্নেল অলি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যাদের আত্মত্যাগের ফলে রাষ্ট্রপতির আসনে বসা, সেই যোদ্ধাদের সুরক্ষা ও মর্যাদা রক্ষায় দল ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি স্মরণ করান, বিএনপি একসময় জামায়াতের সহায়তায় ক্ষমতায় এসেছে। আজ সেই জামায়াতকেই প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ভারতের চাপে বেগম খালেদা জিয়াকে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ থাকতে হলেও বর্তমান বিএনপির নীতি যেন ভারতের প্রতি অস্বাভাবিক নরম। আবার যারা বছরের পর বছর জিয়া পরিবারকে অপমান করেছে, যেমন প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার তাদের প্রতিই এখন দলের মহাসচিব আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছেন। তরুণ প্রজন্ম, যারা নেত্রীর মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছিল, তাদের আজ অবহেলা ও নিন্দার শিকার হতে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন ও পরিণতি: অলি আহমদ তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে দেখান, বারবার আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ভয়াবহ খেসারত দিতে হয়েছে অন্য কারো।
প্রথমবার, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগকে মঞ্চে ফেরান, সতেরো দিনের মধ্যে তিনি শহীদ হন।
দ্বিতীয়বার, জাতীয় পার্টি হাত বাড়ায়, আজ তারা প্রায় বিলুপ্ত।
তৃতীয়বার, জামায়াতে ইসলামী সুযোগ দেয়, তাদের শীর্ষ নেতারা ফরমায়েশি বিচারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।
চতুর্থবার, ওয়ান ইলেভেনের সময় সেনাবাহিনী সহায়তা করে। এর প্রতিদান হিসেবে প্রাণ দিতে হয় ৫৭ জন চৌকস সেনা অফিসারকে।
এখন তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা, পঞ্চমবার আর কেউ যেন আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের দুঃসাহস না করে।
এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি ব্যক্তির ক্ষোভ নয়, এটি জাতির ইতিহাস থেকে ওঠা সতর্কবার্তা। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে—অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যৎ বিপর্যয় এড়ানো যাবে না। সংকীর্ণ স্বার্থ, বিদেশি প্রভাব কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবেগে পরিচালিত রাজনীতি জাতিকে শুধু নতুন বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে।
অলি আহমদের মতে, আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো সততা ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। জনগণকে বিভ্রান্ত না করে সত্য বলা, ইতিহাসের শিক্ষা তুলে ধরা এবং জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশ দেওয়া—এটাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধান দায়িত্ব।
ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধা, সেনা কর্মকর্তা ও অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনেতা। তাঁর কণ্ঠে ওঠা সতর্কবার্তা হয়তো কারও কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের আয়নায় তাকালে তার সত্যতা উপেক্ষা করা যায় না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আজকের শিক্ষা স্পষ্ট। অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে, প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, সত্য ও বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে জাতিকে এগিয়ে নিতে হবে। অন্যথায়, পুনর্বাসন ও প্রতিশোধের এই দুষ্টচক্র আবারও গোটা জাতিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।