রাজধানীর রাজপথ আজ বিকেলে এক ভয়াবহ সংঘর্ষের সাক্ষী হয়ে রইল। শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল সংলগ্ন এলাকা। পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান, কাঁদানে গ্যাসের শেল এবং সাউন্ড গ্রেনেডের প্রচণ্ড শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে শাহবাগ ও মিন্টো রোড এলাকা। এই ঘটনায় ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ ইনকিলাব মঞ্চের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন।
সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় আজ শুক্রবার বিকেল পৌনে চারটার দিকে। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকেই ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা জাতিসংঘের অধীনে ও হাদি হত্যার তদন্তের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’ এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে অবস্থান করছিলেন। একদিকে যমুনার সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন নিহত ওসমান হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পা, অন্যদিকে হোটেলের সামনে ব্যারিকেডের মুখে অবস্থান করছিলেন রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরের নেতৃত্বে কয়েকশ বিক্ষোভকারী। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমার নেতৃত্বে একটি ছোট দল যমুনার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এই প্রাথমিক ধস্তাধস্তিই মুহূর্তের মধ্যে এক বিশাল সংঘাতের রূপ নেয়।
এই সংঘর্ষের নেপথ্যে থাকা দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা তাদের দাবির সপক্ষে সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছিলেন। যখন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে থাকা ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন, তখন পুলিশ নিরাপত্তার স্বার্থে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথমে জলকামান ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়। তবে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ মারমুখী হয়ে জলকামানের ওপর উঠে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর ভাষ্যমতে, জনস্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জের মতো অ্যাকশনে যেতে বাধ্য হয়েছে।
অন্যদিকে, এই ঘটনার রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যে আবেগ ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা এই আন্দোলনের মূল জ্বালানি। বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে পুলিশের দিকে বোতল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাটি তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সংঘর্ষে ফাতিমা তাসনিম জুমা আহত হওয়ার বিষয়টি ছাত্র রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ঘটনার পরপরই ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে শুরু হওয়া প্রতিবাদ মিছিলটি ইঙ্গিত দেয় যে, এই আন্দোলন কেবল একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা শাহবাগ ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করা যেত। কিন্তু রাজপথে শক্তি প্রয়োগের ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার অধীনে তদন্তের দাবিটি ভূ-রাজনৈতিক ও মানবাধিকারের দিক থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। পুলিশের এই কঠোর অ্যাকশন আন্দোলনকারীদের মধ্যে আরও বেশি একাত্মতা এবং জেদ তৈরি করতে পারে, যা অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের আন্দোলনের রূপ নিতে পারে।
সংঘর্ষের পর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শাহবাগ মোড়ের দিকে যাওয়া প্রতিবাদ মিছিলটি শহরজুড়ে টানটান উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত শহীদ ওসমান হাদি হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ তারা রাজপথ ছাড়বেন না। সরকারের পক্ষ থেকে এই সংবেদনশীল বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করা হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। রাজপথের এই উত্তাপ কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার মৌলিক আকাঙ্ক্ষারও একটি বড় পরীক্ষা।