যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো সংক্রান্ত সাম্প্রতিক একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রবাসী বাংলাদেশি এবং তাদের স্বজনদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ৫ হাজার বাংলাদেশিকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে প্রতিবেদনটির ভেতরে থাকা তথ্যের গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিরোনামের এই বড় সংখ্যার সাথে মূল তথ্যের যথেষ্ট অসংগতি রয়েছে। প্রতিবেদনে জনৈক কূটনীতিকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে যে ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার হলো অনথিভুক্ত অভিবাসীদের দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু ৫ হাজার সংখ্যাটি ঠিক কোথা থেকে এলো বা এর সুনির্দিষ্ট ভিত্তি কী, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা সেখানে অনুপস্থিত।
প্রতিবেদনটির ভেতরে উল্লেখ করা হয়েছে যে গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩০০ জন অনথিভুক্ত বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং বর্তমানে আরও ৩০০ জন প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় আছেন। এর পাশাপাশি মার্কিন সরকারের পরিসংখ্যান টেনে বলা হয়েছে যে প্রায় ৪ হাজার বাংলাদেশি বর্তমানে অনিয়মিত অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং তাদের অভিবাসন সংক্রান্ত মামলাগুলো আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যানকে একত্র করে সম্ভবত ৫ হাজার সংখ্যাটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, যাদের মামলা আদালতে বিচারাধীন, তাদের এখনই বহিষ্কৃত বা ফেরত পাঠানো হবে এমন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা ভিত্তিহীন। তারা এখনো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের অবস্থান বৈধ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
সংবাদটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা হলো তথ্যের সূত্রের অস্পষ্টতা। ওয়াশিংটন ভিত্তিক যে কূটনীতিকের কথা এখানে বলা হয়েছে, তার পরিচয় বা জাতীয়তা স্পষ্ট নয়। যদি তিনি বাংলাদেশি কূটনীতিক হয়ে থাকেন, তবে এই বিশাল সংখ্যক নাগরিককে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান কী, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকা জরুরি ছিল। একটি দায়িত্বশীল সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে সংবাদ পরিবেশনের সময় আরও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কারণ অভিবাসন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ থাকে। কেউ আবেদন করে প্রাথমিক পর্যায়ে আছেন, কেউ আপিল করেছেন, আবার কেউ উচ্চ আদালতে প্রতিকার চাইছেন। এই প্রতিটি পর্যায়কে ঢালাওভাবে অবৈধ অভিবাসন হিসেবে চিহ্নিত করা অভিবাসীদের জন্য মানসিকভাবে চরম পীড়াদায়ক।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসীদের মধ্যে বর্তমানে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক কাজ করছে। অভিবাসীদের মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলো এখন আগের মতো সরগরম নেই। এমন একটি অস্থিতিশীল সময়ে তথ্যের যথাযথ যাচাই ছাড়া বড় কোনো সংখ্যা শিরোনামে ব্যবহার করা কেবল জনমনে ভীতিই বাড়ায় না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মানদণ্ডকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত অভিবাসন পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পরিবর্তে কেবল একটি সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এমন প্রতিবেদন জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য দায়ী হতে পারে। তাই ৫ হাজার বাংলাদেশিকে বহিষ্কারের এই খবরটি বর্তমান তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী অতিরঞ্জিত এবং অনেকাংশেই বিভ্রান্তিকর বলে প্রতীয়মান হয়।