মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ এবং হরমুজ প্রণালিতে তাদের ঘোষিত নিরাপত্তা নীতিই এ সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজকে জানান, গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে ইরান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, "হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌম অধিকার যে কোনো মূল্যে রক্ষা করা হবে। এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে কোনো আলোচনার উদ্যোগ নেবে না ইরান।"
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর টানা ৪০ দিনের সংঘাত শেষে ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৭ জুন ইসলামাবাদে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
চুক্তি অনুযায়ী, ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ রাখবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এবং বন্দর অবরোধ আংশিক শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
তবে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায় জুলাই মাসের শুরুতে। ৫ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলার জন্য ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) দায়ী করে ওয়াশিংটন। এর দুদিন পর, ৭ জুলাই থেকে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নতুন করে হামলা শুরু করে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায় ১৩ জুলাই, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোতে পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করবে এবং এই জলপথ ব্যবহারকারী সব বাণিজ্যিক জাহাজকে ২০ শতাংশ হারে টোল পরিশোধ করতে হবে।
ট্রাম্পের এ ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানায় তেহরান। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
এদিকে সেন্টকমের মুখপাত্র অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেছেন, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ পুনর্বহালের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইসলামাবাদ চুক্তি থেকে ইরানের সরে দাঁড়ানো মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।