ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:১৮ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ময়মনসিংহে তারেকের গর্জন: দুর্নীতির পাল্টা জবাব ও ভোটের রণকৌশল

ময়মনসিংহে তারেকের গর্জন: দুর্নীতির পাল্টা জবাব ও ভোটের রণকৌশল

২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণার ডামাডোলে ময়মনসিংহের সার্কিট হাউস মাঠ আজ এক ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই বিশাল নির্বাচনী জনসভায় দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন। বিশেষ করে যারা বিএনপিকে ‘দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন’ বলে আখ্যা দিচ্ছে, তাদের অতীত মনে করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান এক হাত নেন। তিনি অত্যন্ত যৌক্তিক ভঙ্গিতে প্রশ্ন তোলেন যে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে যে দলটির দুইজন সদস্য মন্ত্রী হিসেবে বহাল ছিলেন, বিএনপি যদি সত্যিই ততটা খারাপ হতো তবে তারা কেন তখন পদত্যাগ করেননি? এই প্রশ্নটি ময়মনসিংহের রাজনৈতিক মহলে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিকেল ৪টা ৩ মিনিটে স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানসহ মঞ্চে আরোহণ করেন তারেক রহমান। তার উপস্থিতিতে পুরো ময়দান ‘তারেক রহমানের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি ময়মনসিংহের তারাকান্দাকে পৌরসভায় রূপান্তরের স্থানীয় দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। এরপর ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি সংসদীয় আসনের ধানের শীষের প্রার্থীদের মঞ্চে ডেকে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি বলেন, পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারের মুখের ভাষা যারা এখন ব্যবহার করছে, তারা মূলত সত্য গোপন করতে চায়। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া যখন দায়িত্ব নেন, তখন থেকেই দেশ দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হতে শুরু করেছিল এবং তৎকালীন সেই দুই মন্ত্রী জানতেন যে দেশনেত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে কত কঠোর ছিলেন।

তারেক রহমান তার বক্তব্যে ভোটারদের জন্য এক বিশেষ কৌশলগত নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, ভোটের দিন কেবল ভোট দিলেই হবে না, বরং কেন্দ্র পাহারা দিয়ে ফলাফল কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিতে হবে। তিনি এক অভিনব আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভোটের দিন তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে সবাইকে নিয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ফজর আদায় করতে হবে এবং ভোরেই লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের আধিপত্য নিশ্চিত করতে হবে। এটি মূলত জামায়াত বা অন্যান্য দলগুলোর ‘ভোরবেলা কেন্দ্র দখল’ বা ‘আধিপত্য’ কৌশলের বিরুদ্ধে বিএনপির একটি শক্তিশালী পাল্টা পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১২ তারিখ ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, নির্বাচনের পর তিনি নিজেই কোদাল হাতে নিয়ে খাল খনন কর্মসূচিতে যোগ দেবেন, যা শহীদ জিয়ার সেই ঐতিহাসিক খাল খনন বিপ্লবের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেক মধ্যবয়সী সমর্থক স্মৃতিচারণ করে বলেন যে, এই মাঠেই তারা এক সময় সদ্যপ্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণ শুনেছিলেন। আজ তারেক রহমানকে মঞ্চে দেখে তারা আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রীর ছায়া খুঁজে পাচ্ছেন। জনসভায় লুৎফুজ্জামান বাবরসহ অন্যান্য প্রার্থীরাও বক্তব্য রাখেন। বাবর তার বক্তব্যে ময়মনসিংহের ২৪টি আসনই তারেক রহমানকে উপহার দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। প্রার্থীরা নিজেদের মধ্যকার যাবতীয় বিভেদ ভুলে ‘নৌকা গেছে ভারতে, ধানের শীষ গদিতে’ স্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলেন। বিকেল ৪টা ৫২ মিনিটে বক্তব্য শেষ করে তারেক রহমানের গাড়িবহর গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ময়মনসিংহের এই জনসভা প্রমাণ করে যে, বিএনপি তার তৃণমূলের শক্তি পুনরুদ্ধারে সফল হয়েছে। তারেক রহমানের বক্তব্যে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের দোহাই দিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ খণ্ডন করার প্রচেষ্টা ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী বা অন্যান্য মিত্রদের অতীত মন্ত্রীত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি মূলত রাজনৈতিক নৈতিকতার একটি অমীমাংসিত বিতর্কের অবতারণা করেছেন। ভোটের দিন ভোরে কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার যে ডাক তিনি দিয়েছেন, তা থেকে স্পষ্ট যে ২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল প্রচারণার লড়াই নয়, বরং কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের এক বিশাল স্নায়ুযুদ্ধে পরিণত হতে যাচ্ছে। খাল খনন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে তিনি মূলত গ্রামীণ অর্থনীতি এবং উন্নয়নমুখী রাজনীতির দিকে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা সাধারণ ভোটারদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে মাঠের এই জনসমুদ্রকে ভোটের বাক্সে রূপান্তর করাই হবে বিএনপির জন্য আগামী কয়েক সপ্তাহের প্রধান চ্যালেঞ্জ।