ইতিহাসের চাকা যেন ঘুরে ফিরে আবার সেই ২০১৪-১৫ সালের তিক্ত স্মৃতিকেই ফিরিয়ে আনল। সেবার আইসিসি সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামালকে সভাপতির চেয়ারে থাকা সত্ত্বেও ট্রফি তুলে দিতে না দিয়ে যে চরম অপমান করেছিল তৎকালীন বিসিসিআই প্রধান এন শ্রীনিবাসন, তার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার মোস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে নতুন এক নজিরবিহীন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১২ কোটি টাকার বিশাল অংকে শাহরুখ খানের কলকাতা নাইট রাইডার্স মোস্তাফিজকে দলে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক উন্মাদনা সৃষ্টি করলেও, ভারতের অভ্যন্তরীণ অসহিষ্ণুতা এবং বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের প্রতি বৈরী মনোভাবের দোহাই দিয়ে তাকে কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এবারের বাংলাদেশ আর আগের মতো শুধু আড়ালে চোখের জল ফেলেনি; বরং ২০২৪ পরবর্তী নতুন এক মেরুদণ্ড সোজা করা বাংলাদেশ ভারতের এই ‘অনৈতিক’ আচরণের দাঁতভাঙা জবাব দিতে শুরু করেছে। বিসিবি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, যে দেশে একজন বিশ্বসেরা ক্রিকেটারকে ন্যূনতম নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা বা সদিচ্ছা নেই, সেই দেশে পুরো ক্রিকেট দলকে পাঠানো হবে চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ফলে আসন্ন বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে পা না রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ এবং সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানে আয়োজন করতে হবে।
বাংলাদেশের এই অনড় অবস্থানে ভারতের ক্রিকেট, পর্যটন ও সম্প্রচার খাতে এক বিশাল অর্থনৈতিক ধস নামার উপক্রম হয়েছে। আইপিএল ও বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপন বাজার থেকে শুরু করে ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন রেভিনিউ—সবক্ষেত্রেই বাংলাদেশের দর্শকদের এক বিশাল ভূমিকা রয়েছে। ইতিমধ্যে হাজার হাজার বাংলাদেশি দর্শক স্টার স্পোর্টস ও ডিজনি প্লাস হটস্টারের সাবস্ক্রিপশন বাতিল করতে শুরু করেছেন, যা ভারতীয় সম্প্রচারকদের জন্য কোটি কোটি ডলারের লোকসান বয়ে আনছে। শুধু তাই নয়, প্রতি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ থেকে যে হাজার হাজার দর্শক ও সাংবাদিক ভারতে গিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করতেন, বাংলাদেশের বর্জনের কারণে সেই টিকেটগুলো এখন গ্যালারিতে অবিকৃত পড়ে থাকবে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ দলকে রাষ্ট্রীয় ভিআইপি সুরক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও বিসিবি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিসিবির স্পষ্ট কথা—যেখানে ক্রিকেটারদের ‘হাউস অ্যারেস্ট’ হয়ে খেলতে হবে এবং সামান্য একজন ক্রিকেটারকে নিয়ে অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়, সেখানে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে আর যাই হোক ক্রিকেট খেলা সম্ভব নয়।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ভারতের দাদাগিরির জবাবে পাকিস্তান যেন মোস্তাফিজের জন্য রেড কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে। আইপিএল থেকে বাদ পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান সুপার লিগের করাচি কিংস এবং খোদ পিসিবি প্রধান মহসিন নাগভী মোস্তাফিজকে ‘বাংলার গর্ব’ বলে অভিহিত করে রাজকীয় বরণ করে নিয়েছেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি করেছে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারাও এখন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে ভারতকে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের ওপর কোনো অন্যায় চাপ সৃষ্টি হলে পাকিস্তান চুপ থাকবে না। এমনকি ভারতের কংগ্রেস নেতা শশী থারুরও স্বীকার করেছেন যে, এই লজ্জা ভারত নিজেই ডেকে এনেছে এবং বিসিবির এই কঠোর সিদ্ধান্তের পাশে আজ পুরো বাংলাদেশ একতাবদ্ধ। মোস্তাফিজ কেবল একটি উছিলা মাত্র; আসলে এটি সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলি থেকে শুরু করে ফেলানীর কাটাতারে ঝুলে থাকা লাশের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। মোস্তাফিজের হাতে থাকা বল দিয়ে যেমন স্ট্যাম্প উড়িয়ে দেওয়া যায়, বিসিবির এই এক সিদ্ধান্তে ভারতের অহংকারও তেমনি মাঝমাঠে বোল্ড আউট হয়ে গেছে। ১২ কোটি তো দূরের কথা, ১২০০ কোটি টাকাও যে বাংলাদেশের এই প্রজন্মের কাছে নগণ্য এবং তারা যে আর কারো দয়ার দান চায় না, তা ভারত যত দ্রুত বুঝতে পারবে ততই তাদের জন্য মঙ্গল।