ঐতিহাসিক পথপরিক্রমা আর দীর্ঘ কয়েক দশকের নীরবতা ভেঙে ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন এক নতুন উচ্চতায়। বুধবার তেল আবিবের বেন গুরিয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিমান অবতরণ করে, তখন রানওয়েতে বিছানো লাল গালিচা কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধানের অভ্যর্থনা ছিল না, বরং তা ছিল দুই দেশের ‘কৌশলগত ভ্রাতৃত্বের’ এক নতুন ঘোষণার মহড়া।
২০১৭ সালে প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদীর সেই ঐতিহাসিক সফরের পর ৯ বছর পেরিয়ে ২০২৬-এর এই সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েল যখন কোণঠাসা, ঠিক তখনই বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নেতার এই সফর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক অক্সিজেন হিসেবে কাজ করছে।
সফরের পূর্ণাঙ্গ সূচি ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
বুধবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২:৪৫ মিনিটে মোদীকে বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান নেতানিয়াহু। এরপর দুই নেতা জেরুজালেমের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সফরের প্রথম দিনেই বিকেল ৪:৩০ মিনিটে মোদী ইসরায়েলি পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ ভাষণ দেন।
আজ বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে মোদী নাৎসি বাহিনীর হাতে নিহত ইহুদিদের স্মৃতিবিজড়িত ‘ইয়াদ ভাশেম’ মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন। এরপর তিনি ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো আজ বিকেলে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বেশ কিছু গোপনীয় প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি চুক্তি স্বাক্ষর। এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন।
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে ‘বিপ্লব’: আয়রন বিম থেকে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং
এবারের সফরের মূল আকর্ষণ হলো প্রতিরক্ষা খাতের অভাবনীয় সব চুক্তি। ইসরায়েলে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত জেপি সিং জানিয়েছেন, দুই দেশ এখন আর শুধু ক্রেতা-বিক্রেতা নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক।
আয়রন বিম প্রযুক্তি: আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসরায়েলের তৈরি ১০০ কিলোওয়াট ক্লাসের উচ্চ-শক্তির লেজার অস্ত্র 'আয়রন বিম'। ২০২৫ সালের শেষে এটি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়। ভারত এই প্রযুক্তি সরাসরি হস্তান্তরের (Technology Transfer) দাবি জানিয়েছে।
আয়রন ডোম: ভারতের নিজস্ব আকাশসীমা সুরক্ষায় ‘আয়রন ডোম’ প্রযুক্তির স্থানীয় উৎপাদনের লক্ষ্যে যৌথ বিনিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা চলছে।
AI এবং সাইবার নিরাপত্তা: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সাইবার সিকিউরিটি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে দুই দেশ একে অপরকে কারিগরি সহায়তা দেবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: গান্ধীর আদর্শ থেকে মোদীর বাস্তবতা
ভারতের সাথে ইসরায়েলের সম্পর্কের পরিবর্তন এক বিস্ময়কর বিবর্তন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ভারত এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল। ১৯৩৮ সালে মহাত্মা গান্ধী লিখেছিলেন, "ইংল্যান্ড যেমন ইংরেজদের জন্য, তেমনি ফিলিস্তিন আরবদের জন্য।" দশকের পর দশক ভারত ফিলিস্তিনিদের অধিকারের সবচেয়ে বড় প্রবক্তা ছিল।
১৯৯২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও তা ছিল পর্দার আড়ালে। কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘ডি-হাইফেনেশন’ (ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে আলাদা করে দেখা) নীতি গুরুত্ব পায়। বর্তমানে এশিয়ায় চীনের পর ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলো ভারত। ১৯৯২ সালের মাত্র ২০০ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ২০২৪ সালে এসে ৬.৫ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে।
নেতানিয়াহুর ‘হেক্সাগন’ পরিকল্পনা এবং নতুন অক্ষশক্তি
সফরের প্রাক্কালে নেতানিয়াহু এক মন্ত্রিসভায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং কিছু নাম প্রকাশ না করা আরব ও আফ্রিকান রাষ্ট্রকে নিয়ে একটি ‘হেক্সাগন’ বা ষড়ভুজ জোট গঠনের প্রস্তাব করেছেন। তার মতে, এই জোট ‘উগ্র শিয়া অক্ষ’ (ইরান) এবং ‘উদীয়মান উগ্র সুন্নি অক্ষ’-এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু এখানে তুরস্ক এবং পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পাদিত ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ইসরায়েল ও ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ
মোদীর এই সফর ইসলামাবাদে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক মাসুদ খান মনে করেন, ভারত ও ইসরায়েলের এই জোট সরাসরি পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থানের ওপর আঘাত।
গত মে ২০২৫-এ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনব্যাপী যে আকাশযুদ্ধ হয়েছিল, সেখানে ভারত ব্যাপকভাবে ইসরায়েলি ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করেছিল। পাকিস্তানের বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) এবং ইসরায়েলি ‘মোসাদ’ (Mossad)-এর মধ্যে দীর্ঘদিনের গোপনীয় তথ্য আদান-প্রদান এখন প্রকাশ্যে আসছে, যা পাকিস্তানের পারমাণবিক নিরাপত্তার জন্য একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি।
আন্তর্জাতিক বিতর্ক: গণহত্যা ও কূটনীতি
এই সফর যখন চলছে, তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) কর্তৃক নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে এবং গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে বিশ্বজুড়ে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ভারতের বিরোধী দলগুলো এবং মানবাধিকার কর্মীরা অভিযোগ করছেন যে, যেখানে সারা বিশ্ব ইসরায়েলকে বয়কট করছে, সেখানে মোদী তাদের সাথে কৌশলগত জোট করছেন।
২০২৪ সালের গাজা যুদ্ধের সময় ভারত ইসরায়েলকে রকেট ও বিস্ফোরক সরবরাহ করেছে বলে যে তথ্য আল জাজিরার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, তা ভারতের ঐতিহ্যগত নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা: ইরান ও মার্কিন চাপ
ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। ভারত ইরানের চাবাহার বন্দরে বিপুল বিনিয়োগ করলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে সেখান থেকে সরে আসছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে পরমাণু চুক্তিতে বাধ্য করতে যে সামরিক হামলার হুমকি দিচ্ছে, তাতে ইসরায়েল সরাসরি অংশ নিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত কার পাশে দাঁড়াবে, তা নিয়ে দিল্লির কূটনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক চলছে।
রাজনীতির ধর্ম ও নতুন মেরুকরণ
ভারত ও ইসরায়েলের এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা কেবল বাণিজ্য বা অস্ত্রের লেনদেন নয়, এর মূলে রয়েছে একটি গভীর মতাদর্শিক ঐক্য। মোদীর বিজেপি সরকার ভারতকে যেমন একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হিসেবে কল্পনা করে, নেতানিয়াহুর সরকারও ইসরায়েলকে একটি ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে উপস্থাপন করে। দুই রাষ্ট্রই ‘ইসলামি চরমপন্থা’কে তাদের নিরাপত্তার প্রধান হুমকি হিসেবে তুলে ধরে। এই সফরের গূঢ় অর্থগুলো পর্যালোচনা করলে কয়েকটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
প্রথমত, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক আজাদ এসা’র মতে, ভারত এখন ইসরায়েলি মডেলে একটি শক্তিশালী ও কর্তৃত্ববাদী নিরাপত্তা রাষ্ট্র গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছে। যেখানে গণতন্ত্রের আবরণে কঠোর সামরিক নীতি ও উগ্র জাতীয়তাবাদকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে। এটি বিশ্বজুড়ে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য এখন নাটকীয়ভাবে ভারতের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। ইসরায়েলি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বলীয়ান ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যেকোনো সময় সুনির্দিষ্ট ড্রোন হামলা বা ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ করার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে। এর ফলে পাকিস্তানও নিরাপত্তার প্রয়োজনে তুরস্ক বা চীনের মতো মিত্রদের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
তৃতীয়ত, এই সফরের একটি বড় অংশ ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে রুদ্ধদ্বার বৈঠক। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের ওপর নজরদারি এবং স্পর্শকাতর তথ্য আদান-প্রদানের জন্য দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির বিষয়ে চূড়ান্ত কথা হয়েছে।
পরিশেষে, ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে এক ধরণের ‘সুবিধাবাদী কূটনীতি’ স্পষ্ট। দিল্লি একদিকে ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনে ইসরায়েলি আগ্রাসনের নিন্দা জানাচ্ছে, আবার অন্যদিকে পর্দার আড়ালে তাদের কাছ থেকেই মারণাস্ত্র ও প্রযুক্তি কিনছে। এই দ্বিমুখী অবস্থান বিশ্বমঞ্চে ভারতের দীর্ঘদিনের নৈতিক ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। মোদীর এই সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং এটি বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন ‘পাওয়ার ব্লক’ বা শক্তি বলয়ের উত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।